kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

বাংলামোটরে দুজনকে পিষে মারল বাস

►আবারও অভিযুক্ত সেই লক্কড়ঝক্কড় বাস
► গ্রেপ্তার চালকের দাবি ‘ব্রেক ফেল’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলামোটরে দুজনকে পিষে মারল বাস

বাংলামোটরে প্রথমে মোটরসাইকেল, পরে দুজনকেই পিষ্ট করে একটি বাস। মুমূর্ষু আরোহীকে হাসপাতালে এবং ভ্যানে করে মোটরসাইকেলটি থানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে লোকজন। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘শাহবাগের দিক থেকে দ্রুতগতিতে এসে বাসটি প্রথমে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে। এরপর পেছন থেকে ধাক্কা দেয় একটি মোটরসাইকেলকে। এতে মোটরসাইকেলের চালক ও পেছনে থাকা আরোহী দুই দিকে ছিটকে পড়েন। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের আরোহীর শরীরের ওপর সামনের চাকা উঠিয়ে দেয় বাসটি। এরপর একজন পথচারীকে পিষে দিয়ে ফুটপাত লাগোয়া দেয়ালের সঙ্গে লাগিয়ে থেমে গেল। চোখের পলকে অনেকটা সিনেম্যাটিক কায়দায় ঘটনাটি ঘটতে দেখলাম আমি। তখন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা আমরা চার সহকর্মী তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না।’ ভয়ার্ত কণ্ঠে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দিলেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সংগ্রাম দেবনাথ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি যখন কালের কণ্ঠকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন তখন বাংলামোটর এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। তবে এর ঘণ্টাখানেক আগে, অর্থাৎ সকাল সোয়া ১১টার দিকে দুর্ঘটনার সময় সেখানে বৃষ্টি ছিল না। ফলে বিহঙ্গ পরিবহনের বাসের চাকায় পিষ্ট দুই হতভাগ্যের রক্তের দাগ ততক্ষণে ধুয়ে গেছে।

নিহত দুজন হলেন ঢাকার একটি কুরিয়ার সার্ভিসের (এমজিএম) কর্মী মোকছেদুর রহমান (৪৫) এবং পথচারী কাজী বেলায়েত হোসেন (৫০)।

মোকছেদুরের বাবার নাম আবু আসাদ মিয়া। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। থাকতেন শান্তিবাগে। তাঁর স্ত্রী এবং তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বাকিরাও পড়ালেখা করছে।

বেলায়েতের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী। থাকতেন বাংলামোটর এলাকায়। কাজ করতেন একটি সরিষা ভাঙানোর কারখানায়। স্ত্রী ও দুই ছেলে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। বড় ছেলে রাজন ও ছোট ছেলে তানহা মুলাদী কলেজে অনার্সে পড়েন। গতকাল বিকেলে সরেজমিনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে গিয়ে নিহত মোকছেদুরের ভাগ্নে হাবিব এবং বেলায়েতের ভায়রা জসিম উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, এই ‘হত্যাকাণ্ডে’রও হয়তো বিচার হবে না। মোকছেদুর ও বেলায়েত দুজনই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন বলে জানান তাঁরা। এ ঘটনায় মোটরসাইকেলের চালক জাকির হোসেনের (৪০) তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তিনি ঢামেক হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে গেছেন বলে জানান শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান। শাহবাগ থানায় তিনি যখন কালের কণ্ঠকে এ কথা বলছিলেন, তখন সেখানকার থানাহাজতে ছিলেন দুর্ঘটনার জন্য অভিযুক্ত বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটির চালক মো. জাফর। তাঁর বরাত দিয়ে ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘বাসচালক জাফর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, ব্রেক ফেল করায় ট্রাফিক সিগন্যাল দেওয়ার পরও তিনি গাড়ি থামাতে পারছিলেন না। তবে দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত তিনি চেষ্টা করেছেন থামানোর। শেষ পর্যন্ত একটি দেয়ালের সঙ্গে ঠেকানোর চেষ্টা ছিল। ঘটনার জন্য তিনি পুলিশের কাছে অনুশোচনা করেছেন।’ তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ গাড়ির কাগজপত্র ঠিক ছিল বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। চালক জাফরের গ্রামের বাড়িও মাদারীপুরের পিয়ারপুরে।

প্রত্যক্ষদর্শী ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর সংগ্রাম দেবনাথ বলেন, মোটরসাইকেলটি দক্ষিণ দিকের লিংক রোডের দিক থেকে আসছিল। ঠিক তখনই বাংলামোটর ট্রাফিক সিগন্যালের দক্ষিণ দিকের সিগন্যাল বন্ধ করলে মোটরসাইকেলটিসহ গুটিকয়েক লোক রাস্তা পার হওয়ার মুহূর্তেই বাসটি সিগন্যাল অমান্য করে ওই পথে ঢুকে পড়ে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো এক পথচারী। তবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটিতে যাত্রী কম ছিল বলে জানান তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে অন্যান্য দিনের মতো গতকালও রাস্তায় খুব একটা যানবাহন ছিল না। এর মধ্যেই দ্রুতগতিতে ছুটে চলা বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটি মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে আরোহী বাসের সামনে ছিটকে পড়ে যান। পরে বাসটি তাঁর ও পথচারীর ওপর দিয়েই চলে যায়। এতে দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। দুটি মরদেহ সড়কে পড়ে ছিল অনেকক্ষণ। যান চলাচলও কিছুক্ষণ বন্ধ ছিল।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের রমনা জোনের সহকারী কমিশনার রেফাতুল ইসলাম বলেন, শাহবাগ থেকে বাংলামোটর সিগন্যাল অমান্য করে পার হয়েই বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-১৯৯০) পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাত ঘেঁষে চলা একটি মোটরসাইকেল ও একজন পথচারীকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী।

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই বাংলামোটর ট্রাফিক বক্স থেকে পুলিশ সদস্যরা গিয়ে বাসটি জব্দ করেন এবং চালককে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। লাশ উদ্ধার করে ঢামেক মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাংলামোটর ট্রাফিক সিগন্যালে এমনিতেই প্রচুর গাড়ির চাপ থাকে। ফুট ওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহারে পথচারীদের আগ্রহ কম। এ কারণে প্রায়ই সেখানে দুর্ঘটনা ঘটে। করোনার সময়ে এ পর্যন্ত ২৩০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। রোড সেফটির সাইদুর রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা