kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

বড় ব্যয়ের চাপে ধারকর্জের বাজেট

ফারুক মেহেদী   

৪ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বড় ব্যয়ের চাপে ধারকর্জের বাজেট

করোনার আঘাতে অর্থনীতি এখন বেসামাল। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রায় সব সূচকই টালমাটাল অবস্থায়। আয় নেই, অথচ মাথার ওপর খরচের বিশাল চাপ। আর এই চাপ কোটি কোটি মানুষকে খাওয়ানো, অনেককে নগদ অর্থ দেওয়া, লাখো ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসাকে সহায়তা, কৃষি-পোল্ট্রি শিল্পের পাশে দাঁড়ানো, ব্যবসা, উদ্যোগ, রপ্তানিকে টিকিয়ে রাখা। বলা যায়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে বাধ্য হয়েই ধারকর্জের বড় বাজেটের দিকেই হাঁটছে সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতিতে চাহিদা আছে। তবে শুধু শুধু বড় বাজেট নিয়ে কী লাভ যদি অর্থের সংস্থান না করা যায়? রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। সামনের দিনে এ অবস্থা আরো প্রকট হবে। তখন ঠিকই বড় বাজেট কেটেছেঁটে ছোট করা হবে। বরং সক্ষমতা অনুযায়ী বাজেট তৈরি করা উচিত। দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে না নিয়ে সম্ভব হলে বিদেশি উৎস থেকে বেশি ঋণ নেওয়া উচিত, যাতে সহজ শর্তে পাওয়া যায়। না হলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুব জটিল একটি সময়ে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অর্থমন্ত্রীকে এবারের বাজেটটি দিতে হচ্ছে। এ বাজেটের সবচেয়ে বড় যে সমস্যা দেখা দেবে সেটা হচ্ছে অর্থায়ন। এবার অর্থায়নই বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। সাধারণত ঘাটতিটা ৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। তবে এবার সেটা থাকবে না। কারণ রাজস্ব আয় কমে যাবে এবং রেমিট্যান্সেও নিম্নমুখী ধারা রয়েছে। সেই হিসাবে আমি মনে করি, এখন অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়ন জোগাতে গেলে বহুমাত্রিক সমস্যা তৈরি হবে। এ জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভর করতে হবে। এরই মধ্যে আইএমএফ, এডিবি তাদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সহজ শর্তে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ না নিয়ে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিদ্যমান পাঁচ কোটির সঙ্গে আরো প্রায় তিন কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে। তাদের সহায়তা দিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা সামনের দিনগুলোতে বড় সমস্যা হতে পারে। তাই কৃষিকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতেও বড় বিনিয়োগ করতে হবে। অথচ এবারও গতানুগতিক বাজেট দেওয়া হচ্ছে। বাজেট বড় দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হবে না। এতে আশান্বিত হওয়ার কিছু নেই। অর্থায়নই এ বাজেটের বড় সমস্যা। এ জন্য বিদেশি উৎসকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হবে। ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে হবে। এরই মধ্যে সরকারি প্রণোদনার ৮০ শতাংশই ব্যাংক অর্থায়ন করছে। ব্যাংক যেন ঝুঁকিতে না পড়ে।

জানা যায়, প্রায় পাঁচ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রাক্কলন করেছে সরকার। এমনিতেই উদীয়মান অর্থনীতিতে বাড়তি চাহিদার কারণে বড় বাজেটের চাহিদা আছে। তার ওপর করোনার কারণে তৈরি হয়েছে অপ্রত্যাশিত বাড়তি চাহিদা। এসব বিষয় মাথায় নিয়েই সরকার বড় বাজেট নিয়েছে। তবে বাজেট বড় প্রাক্কলন করা হলেও এত বড় বাজেটের টাকার সংস্থান করাই হয়ে পড়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।

করোনার কারণে বর্তমানে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নেতিবাচক। রপ্তানি আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে, স্থগিত হয়েছে। কিছু কিছু ফিরতে শুরু করলেও তা অঙ্কের হিসাবে কম। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে সরকারি সহায়তায় কর্মীদের বেতন দিতে পারলেও অনেক কারখানায় সংকট চলছে। সামনের দিনগুলোতে অনেকের জন্য সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। গেল অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলে রপ্তানি কমেছে ১৩ শতাংশের বেশি। আর শুধু গেল ২০১৯ সালের এপ্রিলের তুলনায় ২০২০ সালের এপ্রিলেই কমেছে ৮২.৮৫ শতাংশ। আর তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশেরও বেশি।

আমদানিও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এপ্রিলে ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১৬০ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৫২৬ কোটি ডলার। ঋণপত্র নিষ্পত্তিও কমেছে ব্যাপক হারে। এপ্রিলে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ১৯৫ কোটি ডলারের। গেল বছরের এ সময়ে তা ছিল ৫০৮ কোটি ডলার। আমদানি না হওয়া মানে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি কমা, ব্যবসা-বাণিজ্যে চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন কম হওয়া।

রেমিট্যান্সেও খারাপ অবস্থা। দেশে দেশে প্রবাসীরা লকডাউনে বেকার জীবন পার করছেন। কোনো কাজ নেই। অনেকে খাবার পাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে আট লাখের মতো প্রবাসী ফিরে এসেছেন। আরো অন্তত ১২ লাখ প্রবাসী চাকরি খুইয়ে ফেরার অপেক্ষায় আছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। মে মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ১৫০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গেল বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এ হিসাবে আয় কমেছে ১৪ শতাংশ। আর পুরো বছরে আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৮.৭২ শতাংশ। ঈদের কারণে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা ভালো থাকলেও ঈদের পরবর্তী মাসগুলোতে অনেক কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাজস্ব আয় বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আয়ের দিক থেকে সরকার বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের মূল লক্ষ্য ছিল তিন লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে তিন লাখ ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তারও বাস্তবায়ন থেকে বহু দূরে এনবিআর। এপ্রিল পর্যন্ত আদায় হয়েছে এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। ওই সময়ের মধ্যে যা ৬২ হাজার কোটি টাকা কম। বাস্তবায়ন দুর্বলতার কথা জানিয়ে সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান অর্থসচিবকে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে তিনি রাজস্ব আয়ে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বড় রাজস্ব লক্ষ্য কোনোভাবেই পূরণ সম্ভব নয় বলে জানান। একই সঙ্গে তিনি আসছে অর্থবছরেও তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বড় লক্ষ্যমাত্রা না দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। জানা যায়, বিদ্যমান সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা তো পূরণ হবেই না বরং প্রায় এক লাখ কোটি টাকার মতো ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাজস্ব আয়ের নাজুক অবস্থার মধ্যেও আসছে অর্থবছরের জন্য তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার ১.৩৫ শতাংশ।

সরকারের আয় না থাকলেও ব্যয়ের খাতা বেশ লম্বা। করোনার ক্ষতি মোকাবেলায় ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। এ টাকার বেশির ভাগই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নীতি সহায়তার মাধ্যমে নিয়েছে। এমনিতেই রাজস্ব আয় না হওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার প্রায় ৮১ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। যদিও মূল লক্ষ্য ছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকা। পরে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৭২ হাজার কোটি টাকা করা হলে সেই লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। বলা যায়, সরকার ব্যাংকের টাকা নিয়ে ব্যয় মেটাচ্ছে। আর আসছে অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে। প্রাক্কলিত বাজেটেই তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় ধরেই ঘাটতি ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব আয়ের বাস্তবতা অনেক দূরে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা