kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

শত বাধা পেরিয়ে

আঁধার ডিঙিয়ে রাজু ছড়াল আলো

ভুবন রায় নিখিল, নীলফামারী   

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আঁধার ডিঙিয়ে রাজু ছড়াল আলো

ঘরে ছিল না বিজলি বাতি। রাত জেগে কুপির টিমটিমে আলোতেই চলে লেখাপড়া। কেরসিনের অভাবে বেশির ভাগ সময়ই নিভে যেত আলো। কিন্তু নেভেনি অদম্য রাজু ইসলাম। সব বাধা ছাপিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় নীলফামারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। তার বাবা আলম মিয়া কৃষি শ্রমিক। অন্যের কৃষিজমিতে শ্রম খাটানোর আয়ে জোটে না পরিবারের পাঁচ সদস্যের দুই বেলার খাবার। এর ওপর ছেলে রাজুসহ মেয়ে আসমা আক্তার ও খুশি আক্তারের লেখাড়ার খরচ বহন করা কিভাবে সম্ভব! সে লেখাপড়া শিখে চিকিৎসক হতে চায়। কিন্তু অন্তরায় এখন পরিবারের দরিদ্রতা।

রাজু জানায়, পেট পুরে খাওয়া জোটে না তাদের পরিবারে। ছুটিতে বাবার সঙ্গে করেছে কৃষি শ্রমিকের কাজ। স্কুলে যেতে হতো একমুঠো পান্তা খেয়ে। তা-ও জোটেনি প্রতিদিন। শুধু স্কুলের টিফিনের ওপর ভর করে ক্ষুধার যন্ত্রণায়ও পড়াশোনার হাল ছাড়েনি সে।

পঞ্চম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ পেয়ে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছিল রাজু। ওই ফলাফলে লেখাপড়ার দিকে আরো বেশি করে ঝোঁকে সে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পায় বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের নীলফামারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। জেএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ অর্জন করে সাধারণ বৃত্তি পায়। তার এমন মেধায় শিক্ষকদের প্রিয় হয়ে ওঠে রাজু।

রাজু বলে, ‘বাড়িতে বিজলি বাতির আলো নেই। রাত জেগে কুপির আলোতেই পড়তে হয়েছে। তা-ও পড়ার আগেই ফুরিয়ে যেত কুপির কেরোসিন। ফলে দিনের আলোতেই পড়া শেষ করতে হয়েছে বেশির ভাগ সময়। একটি মাত্র স্কুলড্রেস দিয়ে আমাকে পার করতে হয়েছে এসএসসির গণ্ডি। ভালো ফলের জন্য বন্ধুরা বিভিন্ন বিষয়ের নতুন বই কিনলেও আমি সংগ্রহ করেছি পুরনো বইয়ের দোকান থেকে। বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেছি পুরনো বাইসাইকেলে। স্যারেরা স্কুলে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন বিনা বেতনে। পারিশ্রমিক ছাড়াই পড়িয়েছেন প্রাইভেট। সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’

রাজু ইসলামের বাড়ি নীলফামারী জেলা সদরের কুন্দপুকুর ইউনিয়নের দেবীর ডাঙ্গা মুন্সীপাড়া গ্রামে। এক ভাই দুই বোনের মধ্যে মেজো সে। বড় বোন আসমা আক্তার এবার মানবিক বিভাগে পাস করেছে এসএসসি। ছোট বোন খুশি আক্তার পড়ছে সপ্তম শ্রেণিতে।

রাজুর মা আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘বাড়ির ভিটার চার শতক জমি ছাড়া আর কিছু নেই আমাদের। তার বাবার কৃষি শ্রমিকের আয়ে ছেলের লেখাপড়ার সাধ পূরণ করব কিভাবে?’

নীলফামারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিপ্লব কুমার দাস বলেন, ‘রাজু অত্যন্ত মেধাবী। একই শার্ট-প্যান্ট পরে তাকে প্রতিদিন স্কুলে আসতে দেখেছি। মাঝেমধ্যে তার পরনে ভেজা কাপড়ও দেখা গেছে, তার পরও দমেনি সে। সহযোগিতা পেলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে অবশ্যই পৌঁছতে পারবে সে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘আমরা সহযোগিতা করে তাকে পার করেছি বিদ্যালয়ের গণ্ডি। আগামীতে আরো সহযোগিতা পেলে সে পৌঁছতে পারবে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা