kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

করোনা-পরবর্তী সময়

বিদেশি বিনিয়োগ টানতে নানা তোড়জোড়, শুরুতেই ধাক্কা

আরিফুর রহমান   

১ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদেশি বিনিয়োগ টানতে নানা তোড়জোড়, শুরুতেই ধাক্কা

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক বড় কম্পানিগুলোর চীন ছাড়ার উপলক্ষ আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। এরপর করোনাভাইরাসের তথ্য গোপন করে বৈশ্বিকভাবে আরো চাপে পড়ে যাওয়া দেশটি থেকে এখন বেরিয়ে আসার পথ অধিকতর প্রশস্ত বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য। এর সমান্তরালে চীন থেকে বড় বড় কম্পানির কারখানা নিজেদের দেশে টানতে তৎপর হয়ে উঠেছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত। এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। চীন থেকে বিনিয়োগ টানতে তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।

শুধু একটি দেশের ওপর পণ্যনির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে জাপান। তাই জাপান সরকার এরই মধ্যে ২২০ কোটি ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে। জাপানের যেসব কম্পানি চীন থেকে কারখানা সরিয়ে আনবে, তাদের সহযোগিতার জন্য ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিলটি গঠন করা হয়েছে। তাই জাপানের যেসব কম্পানি চীন থেকে সরে আসবে, সেখান থেকে কিছু কম্পানিকেও যাতে বাংলাদেশে আনা যায় সেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বেজা ও বিডা। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশে আনতে একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে যাচ্ছে বিডা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ হবে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিনিয়োগকারীদের জন্য কী কী ছাড় দিচ্ছে, কী কী প্রণোদনা দিচ্ছে তা পর্যালোচনা করা; একই সঙ্গে ওই সব বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সামনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের লোভনীয় সম্ভাবনা তুলে ধরা। সনি, টয়োটার মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড যাতে বাংলাদেশে আসে সেই অনুরোধ জানিয়ে এরই মধ্যে জাপান দূতাবাস, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা) এবং জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কাছে চিঠি দিয়েছে বেজা। একই সঙ্গে জাপানের সুমিতমো করপোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাপানি বিনিয়োগ আনার জন্য।

তবে এত উদ্যোগের মধ্যে শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছে বেজা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করতে এক মাস আগে বেজা থেকে একটি প্রস্তাব তৈরি করে সেটি সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেসব প্রণোদনার বিষয়ে কোনো সাড়া মেলেনি। এ ছাড়া জাপানি বিনিয়োগকারীদের যেসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে আনার চেষ্টা চলছে, সেসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নেওয়া প্রকল্পকে নিম্ন ও মধ্যম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বেজা মনে করছে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন—এ দুটি প্রকল্প বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরেও পানি শোধনাগার প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার মনে করা হয়নি। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ না করে প্রকল্পের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আমাদের কাছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর অর্থনৈতিক অঞ্চল এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি বেজার প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকারের তালিকায় ঢোকানোর জন্য। আশা করছি শিগগিরই প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকারের তালিকায় ঢোকানো হবে।’ তিনি বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে আমরা একটি প্রণোদনার প্যাকেজ তৈরি করেছি। প্রণোদনা প্যাকেজটি ঘোষণা করা হলে আশা করছি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে উৎসাহী হবে।’ অন্যদিকে বসে নেই চীনও। করোনা-পরবর্তী সময়ে চীন থেকে বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যাতে ভারতে না যায়, এরই অংশ হিসেবে ভারতের উত্তর সীমান্ত লাদাখে হঠাৎ করে সেনা মোতায়েন বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে চীন। ভারতের গণমাধ্যম বলছে, চীন থেকে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যাতে ভারতে না যেতে পারে, সেই ইঙ্গিত দিতেই লাদাখে অস্থিরতা তৈরি করেছে চীন।

এদিকে বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০ দেশের মধ্যে ১৬৮তম। যে ১০টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা সহজীকরণ সূচক তৈরি করা হয়, সেই দশটি সূচকের মধ্যে বেশ কয়েকটিতে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। তাই এসব সূচক উন্নীত করার তাগিদও দিয়ে যাচ্ছে বিডা। বিডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা-পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়ার কাজ চলছে। এর মধ্যে আলোচনায় আছে প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস, কেপিএমজি ও ডেলিয়ট বাংলাদেশ। এর মধ্য থেকে একটি পরমর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হবে বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য। জানতে চাইলে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু চীন থেকেই নয়, আমরা ইউরোপ ও আমেরিকা থেকেও বিনিয়োগ টানতে চাই। সে জন্য আমরা একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেব। আমাদের কোন কোন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে, সেটি বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হবে। বেজা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, করোনা-পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প আমদানি শুল্ক কাঠামো, প্রথম বছর থেকে সাত বছরের জন্য শতভাগ কর অবকাশ সুবিধা, বন্ড লাইসেন্স সুবিধা, সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা ও একটি শক্তিশালী নজরদারি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বেজা। তবে এসব প্রণোদনার প্রস্তাবে এখনো সাড়া মেলেনি।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা