kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

নিউ ইয়র্কে নারীর চেয়ে পুরুষ আক্রান্ত দ্বিগুণ

► যুক্তরাষ্ট্রে এক দিনে দুই হাজার মৃত্যু
► আইসিইউতে জনসনের তৃতীয় দিন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নিউ ইয়র্কে নারীর চেয়ে পুরুষ আক্রান্ত দ্বিগুণ

নভেল করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে হপকিন্স ইউনিভার্সিটির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। বুধবার রাতে বিশ্বজুড়ে সংক্রমিতের সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে চার লাখই যুক্তরাষ্ট্রের। ফ্রান্সে মঙ্গলবার করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। আর করোনা আক্রান্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন গতকাল তৃতীয় দিনের মতো হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিউ) কাটিয়েছেন। তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল আছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী এডওয়ার্ড আর্গার।

এদিকে করোনার উৎসস্থল চীনের উহান থেকে মঙ্গলবার মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। খুলে দেওয়া হয় উছাং রেলস্টেশন, উহান স্টেশন ও হানখৌ স্টেশন। এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষার গ্রিনকোড দেখিয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ সাপেক্ষে যাত্রীরা ট্রেনে চড়ে দেশের অন্যান্য স্থানে যেতে শুরু করেছে।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি জানায়, বাংলাদেশ সময় গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে এক হাজার ৯৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাতে দেশটিতে মৃতের মোট সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সেখানে প্রতিদিন যে হারে প্রাণহানি হচ্ছে, তাতে দেশটি ক্রমেই করোনাভাইরাসে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ইতালিতে করোনাভাইরাসে ১৭ হাজার ৬৬৯ জনের এবং স্পেনে ১৪ হাজার ৬৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংকট মোকাবেলায় তাঁর দায়িত্ব যথাসাধ্য পালন করে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে মঙ্গলবার এ ক্ষেত্রে ধীর গতিতে চলার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দায়ী করেন। এই ভাইরাসটি প্রথম দিকে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া বন্ধে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ হ্রাস করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল ডাব্লিউএইচও। জাতিসংঘ সংস্থাটি কেন এ ধরনের ভুল পরামর্শ দিয়েছিল সে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প।

তবে শুরুতে করোনাভাইরাসকে তেমন গুরুত্ব না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। ভাইরাসটিকে অন্যান্য সাধারণ ভাইরাসের মতো উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এটি নিয়ন্ত্রণে আছে। এর পরপরই ভাইরাসটি যুক্তরাষ্ট্রকে এমনভাবে গ্রাস করে যে দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়।

নিউ ইয়র্কে পুরুষরা দ্বিগুণ আক্রান্ত

নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন হাসপাতাল, নার্সিং হোমের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত শহরের প্রতি এক লাখ পুরুষের মধ্যে অন্তত ৪৩ জন করোনা আক্রান্ত। আর প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ২৩ জনের কাছাকাছি। চীন ও ইতালির ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা গিয়েছিল। ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সে দেশে করোনা আক্রান্ত ও মৃতের মধ্যে ৭০ শতাংশই পুরুষ।

নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হেলথের সিনিয়র সার্জন হানি বিটানি বলেছেন, জরুরি বিভাগে ভর্তি করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৮০ জনই পুরুষ। বেশির ভাগেরই শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে। মধ্যবয়স্ক পুরুষদের শ্বাসের সমস্যা সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য দপ্তরের মুখপাত্র মাইকেল লাঞ্জা বলেছেন, নিউ ইয়র্কে কভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শহরের সব হাসপাতাল ও নার্সিং হোমগুলোতে ঠাসাঠাসি ভিড়।

ছেলেদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার সঠিক কারণ অজানা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরুষদের থেকে অনেক বেশি। নানা পরীক্ষায় দেখা গেছে, নারীদের জীবাণুরোধী অ্যান্টিবডি তৈরির পরিমাণও ছেলেদের থেকে কিছুটা বেশি। কাজেই সেদিক থেকে দেখতে গেলে নারীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছেলেদের থেকে কিছুটা হলেও কম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, পুরুষদের কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার একটা মূল কারণ হতে পারে অতিরিক্ত নেশা। সিগারেট, অ্যালকোহলের কারণে ফুসফুস, পাকস্থলীর প্রতিরোধক্ষমতা এমনিতেই তলানিতে এসে ঠেকে। তার ওপর ভাইরাসের সংক্রমণ হলে সেটা রোখার আর ক্ষমতা থাকে না।

আইসিইউয়ে জনসনের তৃতীয় দিন

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিউ) গতকাল তৃতীয় দিনের মতো কাটিয়েছেন বলে জানিয়েছে ডাউনিং স্ট্রিট। তিনি লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এডওয়ার্ড আর্গার গতকাল জানিয়েছেন, আইসিউতে থাকা জনসনের অবস্থা স্থিতিশীল এবং তাঁর মনোবল চাঙ্গা আছে।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে দেশটিতে এরই মধ্যে ছয় হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫৫ হাজার। পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাজ্য শিগগিরই লকডাউন তুলছে না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন আর্গার। তিনি বলেন, ‘লকডাউন সংক্রান্ত নির্দেশনা পরিবর্তন করার আগে আমাদের আক্রান্তের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে হবে। কবে সেখানে পৌঁছব তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’

এর আগে মঙ্গলবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব জনসনকে ‘যোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে তাঁর দ্রুত সুস্থতার ব্যাপারে আশাবাদ জানিয়েছিলেন। জনসনের অনুপস্থিতিতে রাবই এখন সরকারের জরুরি কাজগুলো চালিয়ে নিচ্ছেন।

ভারতে মৃত্যু বেড়ে ১৪৯

ভারতে করোনাভাইরাসে গতকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৯ জন এবং দেশব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ২৭৩। এর মধ্যে ৪১০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ায় চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা চার হাজার ৭১৪। আক্রান্তদের মধ্যে ৭০ জন বিদেশি আছে।

গতকাল বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৯টায় ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়, মঙ্গলবারের হিসাবের পর থেকে নতুন করে ২৫ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ১৬ জন মহারাষ্ট্রে; দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, হরিয়ানা ও তামিলনাড়ুতে দুজন করে এবং মধ্য প্রদেশে একজন মারা গেছে। এখন পর্যন্ত করোনায় সবচেয়ে বেশি মৃতের সংখ্যা মহারাষ্ট্রে, সেখানে ৬৪ জন মারা গেছে। এর পরে গুজরাট ও মধ্য প্রদেশে ১৩ জন করে এবং দিল্লিতে ৯ জন মারা গেছে। তেলেঙ্গানা, পাঞ্জাব ও তামিলনাড়ুতে সাতজন করে মারা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে পাঁচজন, কর্ণাটক ও অন্ধ্র প্রদেশে চারজন করে মারা গেছে। উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা ও রাজস্থানে তিনজন করে মারা গেছে। জম্মু-কাশ্মীর ও কেরালায় দুজন করে; বিহার, হিমাচল প্রদেশ ও ওড়িশায় একজন করে মারা গেছে।

ফ্রান্সে মৃত্যু ১০ হাজার ছাড়াল

ফ্রান্সে মঙ্গলবার করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালে সাত হাজার ৯১ জন এবং বৃদ্ধনিবাসে তিন হাজার ২৩৭ জন মারা যায়। মার্চের ১ তারিখ থেকে মৃতের এ সংখ্যা রেকর্ড করা হয়।

ফ্রান্সের শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জারোম সালোমোন  বলেন, দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এ মহামারির ক্রমবর্ধমান থাবার মধ্যে থাকলেও এর গতি কিছুটা কমতে দেখা যাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের চরম থাবা দেখতে পাইনি।’

সরকারের হালনাগাদ করা তথ্যে জানা যায়, ফ্রান্সে করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৩২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে মারা যায় ৫৯৭ জন।

উহান থেকে উঠল লকডাউন

৭৩ দিন পর লকডাউন তুলে নেওয়ার পর গতকাল চীনের উহানের সড়কে দেখা গেল স্থানীয়দের। দেশটির রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লকডাউন তুলে নেওয়ার পর ২৭৬টি ট্রেন উহান থেকে চীনের সাংহাই, শেনচেন, ছেংতু ও ফুচৌসহ বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। টিকিট বিক্রির পরিমাণ থেকে জানা গেছে, ৮ এপ্রিল প্রায় ৫৫ হাজার যাত্রীর উহান থেকে ট্রেন করে বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার কথা। এদের মধ্যে ৪০ শতাংশ পার্ল নদীর বদ্বীপ এলাকার শহরে যাবে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা পর্যন্ত বিশ্বের ২০৯টি দেশ ও অঞ্চলে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মোট শনাক্তের সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে। এ সময়ের মধ্যে মারা গেছে সাড়ে ৮৬ হাজার ৪০০ জন। সুস্থ হয়েছে তিন লাখ ১৭ হাজার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা