kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

করোনার বড় ঝুঁকিতে জেনেভা ক্যাম্প

লায়েকুজ্জামান   

৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনার বড় ঝুঁকিতে জেনেভা ক্যাম্প

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে গায়ে গা ঘেঁষে চলছে মানুষ, যা করোনাভাইরাস ছড়ানোর বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

গায়ে গা ঘেঁষে চলছে মানুষ। বসাও জড়ো হয়ে। ঘরে থাকার জায়গা নেই। ফলে গলিতে দল বেঁধে আড্ডা, গল্পগুজবে সময় পার করছে সারি সারি নারী-পুরুষ। সরু গলির বন্ধ দোকানগুলোর সামনেও প্রচণ্ড ভিড়। দল বেঁধে গলির মধ্যে খেলছে শিশু-কিশোররা। কারো মুখে মাস্ক নেই। হাত ধোয়ার বালাই নেই। হ্যান্ড স্যানিটাইজার কী—জানে না তারা। করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে সামাজিক দূরত্বের কথা শুনলেও জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা, মাংসের দোকানের কর্মচারী আবদুল খালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা জানি। টিভিতে দেখেছি। কিন্তু ক্যাম্পে আমরা এই দূরত্ব বজায় রাখার জায়গা পাব কোথায়? যেখানে একটি ঘরের মধ্যে চার স্তরের খাট পেতে বসবাস করতে হয়, একটি ঘরের সবাই একসঙ্গে খাট থেকে নামলে ঘরে দাঁড়ানোর সামান্য জায়গা থাকে না, সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কী করে সম্ভব!’

এমন পরিস্থিতিতে জেনেভা ক্যাম্পের এই ভয়াবহ পরিবেশই করোনাভাইরাস ছড়ানোর বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।  

মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প একসময় এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন নাসিম খান। তাঁর মৃত্যুর পর এখন দুটি সংগঠন। একটি এমআরডিএম (মহাজির রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্ট)। এ সংগঠনের সভাপতি ওয়াসি আলম বশির। অন্য সংগঠনটি হচ্ছে এসপিজিআরসি (স্ট্যান্ডার্ড পাকিস্তানি জেনারেল রিপার্টিশন কমিটি)। এ সংগঠনের সভাপতি আবদুল জব্বার খান। সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—জেনেভা ক্যাম্পে বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। ক্যাম্পের জায়গা এক লাখ ৪৩ হাজার বর্গফুট। সে হিসাবে প্রতিজন মানুষের জন্য জায়গা বরাদ্দ ২.৮৬ বর্গফুট। আবার এর মধ্যে রয়েছে খাবার, মুদি, টেইলারিংসহ নানা ধরনের দোকান আর ক্যাম্পের ভেতরে যাতায়াতের রাস্তা। এসব বাদ দিলে একজন মানুষের জন্য বরাদ্দ এক মিটার জায়গারও কম।

এমআরডিএমের সভাপতি ওয়াসি আলম বশির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার বা অন্য কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে এখনো জেনেভা ক্যাম্পে কোনো মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হয়নি। স্থানীয় কাউন্সিলর হাত ধোয়ার জন্য ২০টি ড্রাম এবং দুই বস্তা ব্লিচিং পাউডার দিয়েছেন। তবে বেশির ভাগ মানুষ তা ব্যবহার করে না সচেতনতার অভাবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা নিজেদের উদ্যোগে একেবারে অনাহারি পরিবারগুলোর জন্য কিছু খাবার ব্যবস্থা করেছি। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। আর স্থানীয় কাউন্সিলর ৩২০টি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন।’

ক্যাম্পের অন্য লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে জেনেভা ক্যাম্পের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এঁদের কোনো আয় নেই। এঁদের অধিকাংশ ছোট ছোট পানের দোকান, কাপড় সেলাই কিংবা মাংসের দোকানের কর্মচারী, রিকশাচালক, সিএনজিচালক। দিনের রোজগারে দিন চলত এঁদের। এখন সবাই বেকার। ফলে অনাহারে দিন কাটছে তাঁদের।

জেনেভা ক্যাম্পের অন্য সংগঠন এসপিজিআরসির সভাপতি কাদের খান অসুস্থ। ফলে ক্যাম্পের ভেতরে থাকা তাঁর কার্যালয়টিও বন্ধ রয়েছে।

ক্যাম্পে গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতির কথা জেনে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে এগিয়ে আসেন ঝাঁকে ঝাঁকে নারী-পুরুষ। সবাই জানালেন তাঁদের অভাবের কথা, অনাহারে থাকার কথা। পত্রিকায় নামটা লেখাতে চান তাঁরা। যাতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো তাঁদের প্রতি একটু দৃষ্টি দেয়।

কথা হয় মুন্নী নামে মাঝ বয়সী এক নারীর সঙ্গে। দুই ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে ক্যাম্পের এক খুপরিতে তাঁর বসবাস। স্বামী সিএনজি চালতেন। এখন বন্ধ। ঘরে খাবার নেই। সামান্য ত্রাণ সহায়তাও পাচ্ছেন না। একই ধরনের করুণ গল্প শোনালেন সাহিদা, ইয়াসমিন, শাহজাদী, মিমি, আয়শা, কবির মিয়া, ফারিয়াসহ আরো প্রায় ৫০ জন নারী-পুরুষ। জীবন বাঁচাতে তাঁদের এখন জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন খাদ্য। তাঁরা সবাই এখন কর্মহীন।

খালেক নামে এক তরুণ জানান, একটি মাংসের দোকানে কাজ করে দিনে ৩০০ টাকা মজুরি পেত সে। তা দিয়েই সংসার চলত। এখন ওই দোকান বন্ধ। ফলে বাড়িতেও খাবার নেই। করুণ আকুতি জানিয়ে খালেক বলল, খাদ্যের বিনিময়ে যেকোনো কাজ করতে রাজি সে।

ঢাকা শহরের বেশির ভাগ গরু-মহিষের মাংসের জোগানদাতা জেনেভা ক্যাম্পের কয়েকজন ব্যবসায়ী। ওয়াসি আলম বশিরসহ ক্যাম্পের অনেকে জানান, ওই মাংসের জোগান এখন বন্ধ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কজন জানান, এখনো গভীর রাতে সীমিত আকারে গরু জবাই করে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়।

আবার ক্যাম্পের ভেতরে দেখা গেল দুই-তিনটি মাংসের দোকান খোলা। সেখানে মাংস বিক্রি হচ্ছে। চায়ের দোকানগুলোও খোলা। সেখানকার লোকজনের চলাচলে করোনার কোনো প্রভাব নেই। আগের মতোই সবাই চলাফেরা করছে। সচেতনতার সামান্যতম বালাই নেই ক্যাম্পজুড়ে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা