kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

মৃত্যু, দাফন আর কোয়ারেন্টিনের এক পরিবার

ইফতেখার রাজীব, ইতালি থেকে

২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মৃত্যু, দাফন আর কোয়ারেন্টিনের এক পরিবার

বাবার হাত ধরেই বেড়ে ওঠা নুফরাত নুরুল হাসনাতের। বাবার হাত ধরেই পৃথিবীর আলো গায়ে মাখা। বাবা গোলাম মাওলা যেখানে নুফরাতের ছুটে চলাও সেখানে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিলেও নুফরাতের সঙ্গে বাবার সম্পর্কটা বরাবরই ছিল বন্ধুত্বের। কিন্তু একটি ঝড় বাবা-ছেলের মাঝে গড়ে দিয়েছে চিরদিনের বিচ্ছেদ। নভেল করোনাভাইরাস কেড়ে নিয়েছে গোলাম মাওলাকে। আর শোকের পাহাড় বুকে চেপে নুফরাত আজ বন্দি চার দেয়ালে, কোয়ারেন্টিনে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিদেশের মাটিতে মারা যাওয়া প্রথম বাংলাদেশি গোলাম মাওলা। এক ছেলে, এক মেয়ে, স্ত্রী ও দুই নাতি-নাতনি নিয়ে মিলানে বসবাস করতেন গোলাম মাওলা। ছুটির সময়ে ব্যবসার মালামাল কিনতে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন তিনি। গত ২০ মার্চ ইতালির মিলানে মারা যান তিনি। এর আগে টানা ১০ দিন লড়াই করে গেছেন মৃত্যুর সঙ্গে।

বাবাকে হারিয়ে শোককাতর নুফরাত বলেন, ‘সব সময় বাবার পাশে থাকতাম। বাবার দোকানের পাশেই ছিল আমার দোকান। বাবা কিছুদিনের জন্য ছুটিতে ছিলেন। ওই সময় তিনি দোকানের জন্য মাল কিনতে বিভিন্ন শহরে গেছেন। তখনই কারো না কারো কাছ থেকে তিনি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। প্রথম দিকে জ্বর, কাশি আর একটু সর্দি ছিল। বেশ কিছুদিন পার হয়ে গেলেও তা ভালো হচ্ছিল না। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার আমাদের নিশ্চিত করেন যে বাবা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এর পর থেকে বাবা হাসতাপালে আর আমরা কোয়ারেন্টিনে।’

হাসপাতাল থেকেই সরাসরি গোলাম মাওলার জায়গা হয়েছে চার কোনা মাটির ঘরে, মিলানের বোলজানো মুসলিম কবরস্থানে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নুফরাত বলেন, ‘বাবাকে শেষবারের মতো একটু দেখতেও পেলাম না। শেষবারের মতো গায়ে একটু হাত বুলাতে পারলাম না। লাশটা একটু কাঁধেও নিতে পারলাম না। বাবার কবরে এক মুঠো মাটি দেওয়ার সুযোগটুকুও হলো না। মাটি দেওয়ার সময় আমাকে লাইভে দেখানো হয়েছে, কিন্তু কফিনের ঢাকনা খোলা হয়নি। এ যে কত বড় কষ্ট, কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। পৃথিবীতে কোনো বাবার যেন এমন মৃত্যু না হয়।’

গোলাম মাওলা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তাঁর পরিবার হোম কোয়ারেন্টিনে বন্দি। বাকিটা শোনা যাক নুফরাতের মুখেই, ‘বাবা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই মাকে আলাদা ঘরে রাখা হয়েছে। বোনের দুই ছেলে-মেয়ে, বোন আর আমি এখন পর্যন্ত ভালো আছি। ডাক্তার নিয়মিত ফোন করে আমাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। আশপাশের ইতালিয়ানরা খাবার কিনে দিয়ে যাচ্ছে।’

তবে আশঙ্কা ছিল গোলাম মাওলার দাফন নিয়ে। অনেক চেষ্টায় অবশেষে সফল হয়েছে মিলানের বাংলাদেশি কমিউনিটি। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে গোসল করানো না গেলেও মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করানো হয়েছে। পাঁচজনের উপস্থিতিতে জানাজাও দেওয়া হয়েছে।

মিলান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম জুনায়েদ সোবাহান বলেন, ‘গোলাম মাওলা ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমাদের কাছে খবর ছিল যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতদের লাশ আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে না। লাশ সেনাবাহিনী নিয়ে যাচ্ছে। সেই লাশের কোনো হদিসও পাওয়া যাচ্ছে না। ২০ মার্চ রাত ৮টায় শেষকৃত্য অনুষ্ঠান আয়োজন করে এমন একটি এজেন্সির সঙ্গে কথা বলি। তাদের মাধ্যমে লাশ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি। তখন ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া, মুসলিম কবরস্থানে দাফন করার জন্য ছাড়পত্র জোগাড় করাও কষ্টকর ছিল। এদিকে পরদিন শনি ও রবিবার হওয়ায় কোমুনেও বন্ধ ছিল। এরই মধ্যে মিলান কোমুনে বোলজানো থেকে ফোন আসে। মুসলিম কবরস্থানে দাফনের অনুমতি মেলে। কিন্তু শর্ত ছিল, ইমামসহ মাত্র চারজন প্রবেশ করা যাবে। পরে আমরা কয়েকজন গোলাম মাওলা ভাইয়ের জানাজা ও দাফন করতে সক্ষম হই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা