kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

অঘোষিত লকডাউনে উধাও চেনা ঢাকা

জনশূন্য নগরের রাস্তা, দুশ্চিন্তায় নিম্নবিত্তরা ঘরের বাইরে এলেই পুলিশি জেরার মুখে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অঘোষিত লকডাউনে উধাও চেনা ঢাকা

ঐতিহ্যের নগরী ঢাকায় কোটি কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের পদচারণে নগরের সর্বত্র থাকে কোলাহল, যানজট। কিন্তু করোনার ছোবলে স্তব্ধ হয়ে গেছে সব। টানা সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে গতকাল।

একান্ত প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বের হওয়া নিষিদ্ধ। সময়ের প্রয়োজনে, গুরুত্বপূর্ণ কাজে মাস্ক পরে সাবধানতার সঙ্গে কিছু লোকের চলাচল ছিল। তবে সে ক্ষেত্রেও পুলিশি জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।

রাস্তায় নেই যন্ত্রচালিত গাড়ি। রিকশাও না থাকার মতোই। সাধারণত রাজনৈতিক কর্মসূচি যেমন হরতাল-অবরোধেও ঢাকার চিত্র কখনো এমন হয়নি। ওই সব কর্মসূচি চলাকালেও সীমিত আকারে রাস্তায় গাড়ি চলাচল করেছে। কিন্তু এখন একেবারেই নেই। এমন রাজধানী দেখে অভ্যস্ত নই আমরা কেউই।

গতকাল মিরপুরের বেগম রোকেয়া সরণিতে দেখা হয় শওকত হোসেনের সঙ্গে। ঘরের বাইরে বেরিয়েছেন ওষুধ কিনতে। বেসরকারি কম্পানির এই চাকুরে বললেন, ‘এমন ঢাকা জীবনে দেখা হয়নি। কোলাহল নেই। ধুলাবালি উড়ছে না। পরিবেশ অত্যন্ত ভালো। তবু ভালো লাগছে না। এমন ঢাকা আমরা দেখতে চাই না।’

পাড়া-মহল্লায়ও কোলাহল নেই। সাধারণত ফাঁকা ঢাকায় শিশু-কিশোররা ব্যাট-বল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তেমন চিত্রও অনুপস্থিত। করোনা বিস্তারের আতঙ্কে সন্তানকে ঘরের বাইরে বের হতে দেননি অভিভাবকরা।

দু-চারজন বয়সী মানুষ কোনো ফার্মেসি বা পথের ধারে একসঙ্গে হলেও কথা বেশিদূর এগোয়নি। আর আলোচনাও একটি বিষয় নিয়ে—করোনাভাইরাসের বিস্তার। আল্লাহ কবে এই অবস্থা থেকে রেহাই দেবেন। কখন মানুষ আবার মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারবে—সেই আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেন সবাই।

দুশ্চিন্তায় নিম্নবিত্তরা : অলিগলিতে গুটিকয়েক ওষুধ ও মুদি দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই। কেউ জরুরি জিনিস কিনতে বাইরে এলেও তা কিনেই বাসায় ঢুকে গেছেন। বিভিন্ন এলাকায় কিছু রিকশা থাকলেও যাত্রী সংকটে দুশ্চিন্তার ভাঁজ চালকদের কপালে। মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেলচালকরা যাত্রীর খোঁজ করলেও সাড়া খুব কম। দুশ্চিন্তার ভাঁজ দেখা গেছে ভিক্ষুকদের কপালেও।

গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বাস চলছে না কোনো সড়কে। ওষুধ ও জরুরি কিছু পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়িও নামেনি রাস্তায়। তবে অ্যাম্বুল্যান্স ও গণমাধ্যমকর্মীদের গাড়ি দেখা গেছে বিভিন্ন সড়কে। ফাঁকা রাস্তায় দুই-একজন পথচারী দেখা গেলেও সব ধরনের বাহন এড়িয়ে চলার ঝোঁক বেশি।

নতুনবাজার মোড়ে রিকশাচালক কবির মিয়া বললেন, ‘এই ঝামেলার মইধ্যে বাড়ি যাই নাই। বাড়ি গেলে পোলাপানগোরে কি খাওয়াইমু। যে আশায় ঢাহায় থাইকলাম তাও পূরণ অইবো না। পুলিশ বাধা দিলেও ভয়ে ভয়ে রিকশা অনেকেই চালাইতাসে। কিন্তু যাত্রীরা রিকশায় ওডে না।’

কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচে কথা হলো মোটরসাইকেলচালক রুবেল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার ঢাকার বাইরে থাকে। অন্তত কিছুটা আয়ের উদ্দেশ্যে ঝুঁকি নিয়েই বের হয়েছি গাড়ি নিয়ে। কিন্তু যাত্রী নেই।’

যানবাহন না থাকলেও ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করে চলেছে। মাঝেমধ্যে আসা দু-একটি গাড়ি চেকপোস্টে থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা করছে।

দুশ্চিন্তার কথা জানালেন বেশ কয়েকজন ভিক্ষুকও। কোকাকোলা এলাকায় রাস্তার পাশে বসে থাকা জহুরা নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী বলেন, ‘সকাল থাইকা আছি বাবা। কিন্তু ট্যাকা-পয়সা পাওয়া যাচ্ছে না।’

অন্যরকম পুরান ঢাকা : অঘোষিত লকডাউনের প্রথম দিন গতকাল পুরান ঢাকার চিত্র ছিল সুনসান। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ রাস্তায় নামছে না। কোনো কোনো এলাকায় রাস্তার পাশে ভ্যানগাড়িতে করে শাকসবজি নিয়ে বিক্রেতাদের বসে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু ক্রেতা নেই। গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত পোস্তগোলা, দয়াগঞ্জ, গুলিস্তান ও পল্টন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

গতকাল বিকেল ৩টার দিকে গুলিস্তানে গিয়ে দেখা যায় নবাবপুর রোড, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, স্টেডিয়াম মার্কেটসহ আশপাশের পুরো এলাকা ফাঁকা। গুলিস্তান আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটের প্রবেশ মুখে দুজন সিকিউরিটি গার্ডকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। পাশেই দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। কোনো গাড়ি এলেই সেটিকে আটকে চলাচলের কারণ জানতে চাইতে দেখা যায়।

শামসুল ইসলাম নামে নবাবপুর রোডের এক বাসিন্দা হেঁটে গুলিস্তান এলাকা পার হচ্ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জরুরি কাজে পল্টনে গিয়েছিলাম। যানবাহন না থাকায় হেঁটে বাড়ি ফিরছি। ভাই, এমন ফাঁকা ঢাকা জীবনে প্রথম দেখলাম।’

গুলিস্তান থেকে কিছুটা দূরে পল্টন মোড়েও একই চিত্র। অনেক সময় পর পর দু-একটি রিকশা যেতে দেখা যায়। পোস্তগোলাও আরেকটি ব্যস্ত এলাকা। গতকাল দুপুরে এই এলাকাটি ঘুরে দেখা গেছে একেবারে ফাঁকা।

দয়াগঞ্জ মোড়ে রিকশা নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জসিম উদ্দিন। বললেন, ‘পেটের তাগিদে দুপুরে রিকশা লইয়া বের হইছি। বউ-বাচ্চা আমার মুখের দিকে তাকায় আছে। কিন্তু এহন পর্যন্ত কোনো যাত্রী পাই নাই। যদি কিছু কামাই করবার না পারি তাইলে না খায়া থাকতে অইবো।’

ব্যতিক্রম : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারপত্র বিলি করেছে। গণমাধ্যমগুলোও সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও একই পরামর্শ দিচ্ছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেই নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার প্রবণতাও রয়েছে। তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম বলা যায় মিরপুর এলাকাকে। একই চিত্র দেখা গেছে কারওয়ান বাজার এলাকায়।

গতকাল সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান প্রধান সড়কগুলো ফাঁকা থাকলেও অলিগলিতে দলবেঁধে ধুমসে আড্ডা চলছে। মুখে মাস্কও নেই। পিছিয়ে নেই শিশুরাও। একে অপরে জড়াজড়ি করে চলছে খেলাধুলা।

কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে দেখা গেল কয়েকটি শিশু জড়াজড়ি করে খেলা করছে। তোমরা কি শুনেছ যে সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?—প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল নামে এক শিশুর উত্তর, ‘হ, শুনছি; আমরা বস্তিতে থাকি। কিন্তু ঘরে গরম, থাকন যায় না।’ পাশ থেকে নিঝুম নামে আরেক শিশু বলে ওঠে, ‘স্যার আপনার মাস্কটা আমারে দিবেন?’ তনু নামের আরেক শিশু বলে, ‘আরে আমাগোর মাস্ক লাগবো না। হুনস নাই, করোনা পোলাপানরে ধরে না, বুড়া মানুষরে ধরে। আমাগো কিছু হইবো না।’

গতকাল সকাল থেকেই দেখা যায়, মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার মসজিদ গলি (গিরিঙ্গি মোড়) এলাকার চায়ের দোকানগুলোতে পুরোদমে আড্ডা চলছে। দুয়ারীপাড়া মোড় ও কালশীতে সড়ক দখল করে বসানো বাজারেও দেখা গেছে একই দৃশ্য।

পাড়া-মহল্লায় লোকজনের আড্ডা চলার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯-এর অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মাদ তবারকউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাড়া-মহল্লায় অহেতুক আড্ডার বিষয়ে আমরা অনেক ফোনকল পাচ্ছি। আর ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানাকে অ্যাকশনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।’

রাস্তায় বের হলেই পুলিশি জেরা : দুই দিনে বদলে গেছে ঢাকা মহানগরীর চিত্র। যে শহরের ফুটপাতেও স্রোতের মতো মানুষের চলাচল থাকে, সেই ফুটপাত জনশূন্য। যানবাহনের জট তো দূরের কথা, রাস্তায় বলতে গেলে যানই নেই। কেবল হাতে গোনা অটোরিকশা, অ্যাম্বুল্যান্স, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার চলতে দেখা গেছে গতকাল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে সিটি কলেজ, জিগাতলা, শিয়া মসজিদ, শ্যামলী, কল্যাণপুরের সড়ক সুনসান। নগরের বিভিন্ন সড়ক মোড়ে অবশ্য পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়। বের হওয়া অল্পসংখ্যক পথচারীকে থামিয়ে তারা ঘরের বাইরে আসার কারণ জানতে চাইছে। করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করেও মানুষজনকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে।

লালবাগ থানার ওসি কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বের না হতে নির্দেশনা দিয়েছি। এর পরও যারা বের হচ্ছে, তাদের বের হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে।’

আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য সুব্রত বললেন, ‘রাজধানীতে গত কয়েক দিন ধরেই ক্রমশ গাড়ির সংখ্যা কমছিল। এখন গাড়ি নেই বললেই চলে। তাই নিয়ন্ত্রণও করতে হচ্ছে না।’

 

[গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি আশরাফ-উল-আলম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ওমর ফারুক ও লায়েকুজ্জামান এবং নিজস্ব প্রতিবেদক শাখাওয়াত হোসাইন ও জহিরুল ইসলাম]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা