kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

লেখকের মেলা

গ্রন্থসমুদ্রে নিজেকে বালুসম লেখক-ক্রেতা মনে হয়

তুহিন ওয়াদুদ

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



গ্রন্থসমুদ্রে নিজেকে বালুসম লেখক-ক্রেতা মনে হয়

অমর একুশে গ্রন্থমেলার স্বাদ স্বতন্ত্র। এ মেলা যেমন বইয়ের মেলা, তেমনি পাঠক ও লেখকের সম্মিলন। দেশজুড়ে বছরব্যাপী অগণিত পাঠক এ বইমেলার অপেক্ষায় থাকেন। অনেকেই আছেন বছরে একবার ঢাকায় আসেন; তা-ও বইমেলায়। প্রবাসী অসংখ্য পাঠক বইমেলার সঙ্গে সময় মিলেয়ে দেশে ফেরেন। অনেক লেখক এ বইমেলার অপেক্ষায় থাকেন বই প্রকাশের জন্য। প্রকাশনাশিল্পও কয়েক মাস আগে থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও অনেকটাই এখন বইমেলানির্ভর।

মেলার সব বই মান বিচারে টিকে থাকবে না। অসংখ্য মানহীন বইয়ে মেলা ভরা থাকে। শিল্পবোধহীন অনেক লেখক আছেন, যাঁরা নিজের লেখা মলাটবন্দি দেখতে চান। নিজের অর্থ দিয়ে অনেকেই বই প্রকাশ করেন। গোটা মেলায় এক কপি বিক্রি না হওয়া বইও কম নয়। লেখক বিষণ্ন মনে ফিরলেও পৃথিবীর কোনো কোনো লেখকের প্রথম বই ভালো ছিল না, সেসবের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে নতুন বই লেখার দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরের বছর আবার নতুন বই নিয়ে হাজির হন। এ রকম অসংখ্য বইয়ের ভেতর থেকে প্রকৃত পাঠককে খুঁজে বের করতে হয় উপযুক্ত বই।

স্বল্পসংখ্যক লেখকের বই বিক্রি আশাজাগানিয়া। অনেক বইঘরে লেখক উপস্থিত থাকেন। পাঠকের সৌভাগ্য হয় লেখককে প্রত্যক্ষ করার। লেখকের অটোগ্রাফসংবলিত বইও কেনেন অনেকে।

বইমেলা আমার কাছে বিভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে। সুদূর কুড়িগ্রাম থেকে বইমেলার জন্য ছোটবেলায় ঢাকা এসেছিলাম। তখন হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদকে কাছে থেকে দেখার আনন্দ ছিল সীমাহীন। এলাকায় ফিরে কতজনের সঙ্গে সেই গল্প করেছি তার শেষ নেই।

বিজ্ঞানচেতনা পরিষদ করার সময় বিজ্ঞানচেতনা পরিষদে একবার প্রায় মাসব্যাপী বই বিক্রি করলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘চিহ্ন’ নামের ছোট কাগজ বের করতাম। সেই চিহ্নর স্টলে অনেক সময় কাটিয়েছি। কখনো শুধুই পাঠক-ক্রেতা, কখনো পাঠক-বিক্রেতা-ক্রেতা, কখনো পাঠক-ক্রেতা-ছোট কাগজ বিক্রেতা হিসেবে আমার কাছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা অনন্য। মেলায় আমার বই থাকলেও এখনো বইমেলায় আমি পাঠক হিসেবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

বইমেলায় গেলে অনেক লেখক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। যান্ত্রিক ব্যস্ততা আর স্বল্প সময় নিয়ে বইমেলায় আসা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে দীর্ঘ সময় কাটানোর মতো সময় হয়তো মেলে না। তবে সামান্য দেখা হওয়ার আনন্দটুকু অমলিন থাকে।

বইমেলা বাংলা একাডেমি চত্বর অতিক্রম করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল এলাকাজুড়ে স্থান করে নিয়েছে। আনুপাতিক হারে ভালো বইয়ের সংখ্যা অনেক কম। তার পরও আশার কথা হচ্ছে, যাঁরা সারা বছর অপেক্ষা করে মেলায় আসেন, তাঁরা তাঁদের প্রিয় লেখকদের বই পান। কখনো কখনো বিষয়গত দিক বিবেচনা করে পাঠকরা খুঁজে পান সেসব বইও। সব ধরনের পাঠকই পছন্দমতো বই সংগ্রহ করতে পারেন।

কথাশিল্প, কবিতা, নাটক, স্মৃতিকথা, সংগীতবিষয়ক গ্রন্থ, চরিত সাহিত্য, ভ্রমণ সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, মননশীল প্রবন্ধ, মৌলিক কিংবা সমালোচনামূলক প্রবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, শাস্ত্রীয় গ্রন্থসহ বিবিধ ধরনের বইয়ের মধ্যে পাঠকের যে বইয়ের দিকে ঝোঁক আছে তিনি মেলা থেকে খুঁজে নিতে পারেন সেই পছন্দসই বিষয়ের বই।

মেলায় যতসংখ্যক মানুষের ভিড় দেখা যায় ততসংখ্যক পাঠক নন। আবার যতসংখ্যক ক্রেতা, ততসংখ্যকও পাঠক নন। তার পরও আশাজাগানিয়া বিষয় হচ্ছে, বাঙালি পুরোদস্তুর পাঠবিমুখ নয়। নয়তো এত বড় বইমেলা টিকে থাকত না। তার কলেবর ক্রমাগত বৃদ্ধি পেত না। সেখানেই রোপিত আমাদের আশার বীজ। বাঙালি একদিন প্রকৃত অর্থে পাঠক জাতিতে পরিণত হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা