kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

করোনাভাইরাসের কারণে চীনের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

কাঁচামাল সংকটে মারাত্মক ঝুঁকিতে পোশাকশিল্প

বন্ধ হয়ে যেতে পারে অসংখ্য কারখানা

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাঁচামাল সংকটে মারাত্মক ঝুঁকিতে পোশাকশিল্প

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চীনে নববর্ষের ছুটি তৃতীয় মেয়াদে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে—এমন পূর্বাভাস দিয়েছে চীন সরকার। এতে অনেকটাই যেন চোখে ‘সরষে ফুল’ দেখছেন বাংলাদেশের গার্মেন্ট উদ্যোক্তারা। বিশ্বের তৈরি পোশাক রপ্তানির ৬ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করলেও এর কাঁচামালের জন্য আবার প্রায় পুরোটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের পোশাকশিল্প। বিশেষ করে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ওভেনপণ্যের কাঁচামাল প্রায় ৯০ শতাংশই আসে চীন থেকে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে চীনের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় কাঁচামালের সেই জোগানে এখন মারাত্মক সংকটের আশঙ্কা করছেন পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকরা। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে চীনের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি শুরু না হলে বাংলাদেশের অসংখ্য কারখানা কাঁচামালশূন্য হয়ে উত্পাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ব্যবসায়ী নেতারা জানান, ১৭ তারিখের পর চীনের অফিস-আদালত কবে খুলবে সেই নিশ্চয়তাও নেই। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে না এলে নববর্ষের ছুটি আরো কয়েক মেয়াদে বাড়তে পারে। এই আশঙ্কাটিই চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে তাঁদের কপালে।

করোনাভাইরাস আতঙ্কে চীন থেকে আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্বের ছোট-বড় অনেক ফ্যাশন ব্র্যান্ড। এর অর্থ প্রতিযোগী দেশগুলোর জন্য বিরাট ক্ষেত্র সৃষ্টি হওয়া। তবে সেই সুযোগটিও চীনের কাঁচামাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কারণ বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ মূলত চীনের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য চীনে অর্ডার বাতিলের সুযোগ দেখলেও কাঁচামাল সংকটের শঙ্কাও রয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ দীর্ঘায়িত হলে এপ্রিল থেকে কাঁচামালের সংকট প্রকট হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

প্রাইসওয়াটার কুপার্সের (পিডাব্লিউসি) পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৯ সালে চীন থেকে মোট ১৫৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৩৪ শতাংশ। এই বিশাল বাজার ক্ষতিগ্রস্ত

হলে স্বাভাবিকভাবে ক্রেতারা বিকল্প বাজারে নজর দেবে। সে ক্ষেত্রে সক্ষমতার বিচারে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ও প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের পরিচালক সৈয়দ এম তানভীর বলেন, ‘রিটেইলারদের অনেকেই করোনাভাইরাস আতঙ্কে চীন থেকে পোশাক নেওয়া বন্ধ করেছে। এই অর্ডার শিফট হয়ে বাংলাদেশসহ সহযোগী দেশগুলোতে কিছু কিছু আসতে পারে। ইতিমধ্যে কিছু ক্রেতা বাংলাদেশে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে। কিন্তু কাঁচামালের জন্য ঠিকই সেই চীনের মুখাপেক্ষী হতে হবে। সেখান থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি বন্ধ হলে কাঁচামাল সরবরাহও বন্ধ থাকবে। ওভেন খাতের ৬০ শতাংশ কাঁচামাল আসে চীন থেকে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আরএমজি খাত প্রতিষ্ঠার পর চার দশকেরও বেশি পার হয়েছে। তবু আমরা পুরো সরবরাহ চেইনের জন্য চীনের ওপর এখনো এত নির্ভরশীল। করোনাভাইরাস আরো একবার এই সত্যটি উপলব্ধি করিয়েছে।’

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি আবু তৈয়ব বলেন, ‘চীন থেকে ফ্যাব্রিকের একটি শিপমেন্ট মার্চের প্রথম সপ্তাহে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখন সেটা ১০ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক কারণে আমার শিপমেন্টও এখন নতুন করে শিডিউল করতে হবে। এটা যেহেতু বৈশ্বিক সমস্যা, আশা করছি বায়ার সেটা বুঝবেন। তবে সাথে এটাও আশঙ্কা করছি—তাঁরা অর্ডার কমিয়ে দিতে পারেন।’

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সভাপতি ও ইস্টার্ন অ্যাপারেলস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এই আতঙ্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে হয়তো কিছু গার্মেন্ট অর্ডার বাংলাদেশেও আসতে পারে। কিন্তু এসব সুফল তখনই পাওয়া যাবে যখন আমাদের হাতে পর্যাপ্ত কাঁচামাল থাকবে। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহূত কাঁচামালের প্রায় অর্ধেকই আসে চীন থেকে। সেই হিসাবে তৈরি পোশাক উত্পাদনের ক্ষেত্রে আমরা অনেকাংশেই চীনের ওপর নির্ভরশীল। কাঁচামালের বিকল্প বাজার হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু চীনের কাঁচামাল অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী।’

তবে ব্যবসায় টিকে থাকাকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইতিবাচক কিছু ভাবার আগে এই মুহূর্তে আমরা সারভাইভ করার কথা ভাবছি। করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে চীন তাদের নববর্ষের ছুটি কয়েক দফা বাড়িয়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এর পরও যদি তাদের রপ্তানিপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকে, তাহলে এপ্রিল মাস থেকে এ দেশের অনেক কারখানায় কাঁচামালের অভাবে উত্পাদন বন্ধ হয়ে যাবে।’ বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায়ও একই অবস্থা হবে বলে তিনি জানান।

কাঁচামালের বিকল্প উৎস প্রসঙ্গে বিজিএমইএর এই শীর্ষ নেতা জানান, ‘এই মৌসুমে আর বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ নেই। তবে করোনাভাইরাস আতঙ্কের শিক্ষা হচ্ছে, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে এখন থেকে আমাদের বিকল্প উৎসর চিন্তা করতে হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা