kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৩ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

পুলিশ ব্যস্ত মিন্নির পেছনে, বেড়েছে নানা অপরাধ

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুলিশ ব্যস্ত মিন্নির পেছনে, বেড়েছে নানা অপরাধ

খুন, সন্ত্রাস, মাদকের বিস্তার, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই—একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে জেলাজুড়ে। হত্যাকাণ্ডগুলোর কিনারা হচ্ছে না। থেমে নেই মাদকের বিস্তার। বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের পরও অপরাধপ্রবণতা কমেনি। ওই হত্যাকাণ্ড ঘিরে পুলিশ তৎপর হয়ে উঠায় কিছুদিন আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু নিহতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেপ্তার ও তাঁকে মামলার আসামি করে ‘অভিযোগপত্র’ দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অতি-উৎসাহ আলোচনায় আসে। আর মিন্নিকে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘অতিব্যস্ততার’ ফাঁকে জেলাজুড়ে নানামুখী অপরাধ বেড়ে গেছে।

গত বছরের ৮ জানুয়ারি সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের কামড়াবাদ এলাকায় বাদশা নামের এক যুবলীগকর্মীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে বরগুনার চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া রাকিব সরদার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। স্বীকারোক্তিতে রাকিব বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ভায়রা সিদ্দিকুর রহমানের নির্দেশে তাঁরা বাদশাকে হত্যা করেন। সিদ্দিক বরগুনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বুড়িরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। পরে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়। এর পর থেকে আর কোনো অগ্রগতি নেই।

জেলায় বিগত বছরের শেষের দিকে আরো বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা ঘটে। ৬ নভেম্বর বরগুনার সদর উপজেলার হেউলীবুনিয়া এলাকায় রাশিদা নামের এক গৃহবধূকে কুপিয়ে জখম করেন তাঁর সাবেক স্বামী সানু মিয়া। রাশিদার করা এসিড নিক্ষেপ মামলায় জেলহাজতে থাকা সানু মুক্ত হয়েই এই কাণ্ড ঘটান।

এ ছাড়া গত ৭ নভেম্বর সকালে বেতাগী উপজেলার মাছুয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী তামিমা আক্তারকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে পুকুরে ফেলে রাখে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। ২৭ অক্টোবর ভোরে বরগুনার ক্রোক এলাকায় ইমরান নামে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। সে ঘটনার রহস্যও জানা যায়নি। এর আগে ১০ আগস্ট বরগুনার বিষখালী নদী থেকে হাত-পা বাঁধা মস্তকবিহীন একটি মরদেহ উদ্ধার করে পাথরঘাটা থানার পুলিশ। এ ঘটনায় ১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছে নিহতের পরিবার।

৬ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ছোনবুনিয়া গ্রামে আমেনা নামের অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর স্বামীর বাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। ১০ আগস্ট বামনা উপজেলার গোলাঘাটার কড়ইতলা গ্রামে হাবিব নামের একজনকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালায় প্রতিপক্ষ। একই দিন বরগুনার নলটোনা এলাকায় বিষখালী নদীতে জেলেদের জালে উঠে আসে ফারুক আকন নামে এক যুবকের গলা কাটা মরদেহ। ২৩ সেপ্টেম্বর বামনায় রিপন হাওলাদার নামে ওয়ার্ড যুবলীগের এক নেতার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

মিন্নির পেছনে পুলিশ, বেড়েছে অপরাধ : গত বছরের ২৬ জুন রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে হত্যাকারীদের সঙ্গে স্ত্রী মিন্নির ধস্তাধস্তি ও খুনের ভিডিওটি ফেসবুকে দেশজুড়ে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এই হত্যাকাণ্ডের পর দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পরবর্তী সময়ে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। নয়ন ও তাঁর সহযোগীরা সবাই ছিল মাদকাসক্ত ও চিহ্নিত মাদক কারবারি। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হলেও পুলিশ বিষয়টি আমলে নেয়নি।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়ে তার স্বামীকে রক্ষায় জীবন বাজি রেখেছে, যা সবাই দেখলেও কেবল বরগুনা জেলা পুলিশের চোখ এড়িয়ে গেছে। পুলিশ আমার মেয়ের দায় খুঁজেছে শুরু থেকেই। ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে তারা ন্যক্কারজনকভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করছে।’

ওদিকে রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশি তৎপরতা বাড়লে জেলা শহরে মাদকের বিস্তার ও সন্ত্রাস বেশ খানিকটা কমে আসে। তবে একচোখা দৃষ্টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসন মিন্নির পেছনে লেগে থাকায় আইন-শৃঙ্খলার অন্যান্য সেক্টরে নজরদারি ঢিলেঢালা হয়ে পড়ে। এই ফাঁকে পুনরায় মাদকে সয়লাব হয়েছে গোটা এলাকা। বিশেষ করে, বরগুনা সদরের নলটোনা, এম বালিয়াতলী, সদরসহ ১০টি ইউনিয়নেই চলছে মাদকের রমরমা কারবার। রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ভাই-দাদার পরিচয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মাসিক নিয়মিত বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে জেলায় একটি খুনের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ধর্ষণ পাঁচ, নারী ও শিশু নির্যাতন সাত, ডাকাতি এক, সিঁধেল চুরি তিন, চুরি চার, মাদকদ্রব্য আইনে ৩০ ও অস্ত্র আইনে এক এবং অন্যান্য ঘটনায় ৪৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর আগের মাসে নভেম্বরে খুনের ঘটনা না ঘটলেও নারী ও শিশু নির্যাতন ১৪, ধর্ষণ তিন, চুরি তিন, মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত ৩৯ এবং অন্যান্য ঘটনায় ৫৪টি মামলা হয়েছে।

বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন গতকাল সোমবার রাতে মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর হলো আমি দায়িত্ব নিয়েছি। জেলার ছয়টি থানায় বিভিন্ন অভিযোগে গড়ে প্রতি মাসে ১০০ মামলা দায়ের হচ্ছে। অথচ বিগত সময়ে সংখ্যাটা দুই শর বেশি ছিল।’

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলাটির তদন্তে পুলিশের একটি টিম মাঠে কাজ করেছে। একই সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পৃথক টিম জেলাজুড়ে নিরলস কাজ করেছে। সেগুলো মিডিয়ায় তেমন আসেনি। তাই অনেকের ধারণা হতে পারে, পুলিশ শুধু রিফাত হত্যা মামলা নিয়ে পড়ে আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা