kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ভ্রাম্যমাণ আদালতের শাস্তি প্রশ্নবিদ্ধ

মাদকসংক্রান্ত আইন সংশোধনের তাগিদ

আশরাফ-উল-আলম   

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মাদকসংক্রান্ত আইন সংশোধনের তাগিদ

ভয়ংকর মাদকদ্রব্য ইয়াবা উদ্ধার করে ভ্রাম্যমাণ আদালত যে শাস্তি দেন তা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক। হাতেনাতে ধরা পড়া ইয়াবা কারবারিদের শাস্তির বিধান আছে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনে। কিন্তু মূল আইন রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া ইয়াবা ট্যাবলেট বহনকারীকে শাস্তি দেওয়া সমর্থন করে না। এ কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন এবং এসংক্রান্ত বিধি সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা।

ইয়াবা উদ্ধার এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া শাস্তিসংক্রান্ত এক মামলার আপিলের রায়ে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমানও। গত বছরের ১২ জুন ওই রায় ঘোষণা করা হয়।

ওই রায়ে বলা হয়, ইয়াবা নেশাজাতীয় মাদকদ্রব্য। কিন্তু এটি আসলেই কোনো মাদকদ্রব্য কি না সে বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তফসিলে উল্লেখ নেই। তফসিলে মিথাইল এমফিটামিন নামের পদার্থকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত ইয়াবায় মিথাইল এমফিটামিন থাকে। ইয়াবায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে উল্লিখিত মাদকের শ্রেণিভুক্ত মিথাইল এমফিটামিনের অস্তিত্ব রয়েছে কি না তা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া নির্ণয় করার সুযোগ নেই। ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ৯(ক) ধারায় ২০১৮ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালত এক আসামিকে শাস্তি দেওয়ার পর ওই মামলা থেকে উদ্ভূত আপিলের রায়ে এসব কথা বলা হয়। তবে সব আসামির ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা একই রকম বলে মনে করেন ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী বিশিষ্ট আইনজীবীরা।

১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এখন আর কার্যকর নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ প্রণীত হওয়ার পর নতুন আইনেই বিচার চলছে। নতুন আইনের তফসিলেও ইয়াবা ট্যাবলেটকে সরাসরি কোনো মাদকদ্রব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নতুন আইনেও এমফিটামিনকে মাদকের শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। তাই নতুন আইনেও রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের শাস্তি দেওয়া বেআইনি হবে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

বিশিষ্ট ফৌজদারি আইনজীবী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. বোরহান উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রচলিত আইনে ইয়াবা কোনো মাদক নয়। ইয়াবায় এমফিটামিনজাতীয় মাদক থাকে। এমফিটামিনকে মাদক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে আইনে। কিন্তু সেটা পরীক্ষা না করে কাউকে সাজা দেওয়া বেআইনি হবে। আপিলের রায়েও সে কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘রায়ে একজন সিনিয়র বিচারক অত্যন্ত সঠিক অভিমত দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক ইয়াবার মামলায় যে শাস্তি দেওয়া হয় তা প্রশ্নবিদ্ধ।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ওমর ফারুক (আসিফ) বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় যে শাস্তি দেন তা আইনসিদ্ধ নয়। তার পরও অসংখ্য খুচরা ইয়াবা কারবারিকে সাজা দেওয়া হচ্ছে। এটা প্রশ্নবিদ্ধ। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাত্ক্ষণিক কিছু সাজা দেওয়ায় খুচরা কারবারিরা নিরুৎসাহী হচ্ছে। এটা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য ভালো। কিন্তু আইনের বাইরে কিছু করা ঠিক নয়। এ কারণে প্রয়োজনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন সংশোধন করা উচিত।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৬২ ধারায় রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন এবং এর প্রতিবেদনের গুরুত্ব উল্লেখ আছে। এই ধারার (২) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো বস্তুর রাসায়নিক পরীক্ষার প্রয়োজন হলে পরীক্ষাগারে পাঠাতে হবে। (৩) উপধারায় বলা হয়েছে, রাসায়নিক পরীক্ষকের স্বাক্ষরযুক্ত পরীক্ষার প্রতিবেদন মামলা দায়ের, মাদকদ্রব্য অপরাধের তদন্ত, অনুসন্ধান, বিচার বা অন্য কোনো কার্যধারায় সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বাতিল হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও এমন ব্যবস্থা ছিল।

জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর থানার জেনেভা ক্যাম্পে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে নাজমা বেগম ওরফে নাগিন নামের একজনকে ৪৩টি ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক করেছিল র‌্যাব-২। আটক নাগিনকে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। আসামি ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল করেছিলেন ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নাহিদ রসুল শুনানি শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আপিলের রায় ঘোষণা করেন এবং সাজা বহাল রাখেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামি মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবার আপিল করেন। আপিলটি স্থানান্তর করা হয় ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে। বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান শুনানি শেষে রায় দেন গত ১২ জুন। রায়ে এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

বিশেষ জজ রায়ে বলেন, মূল মামলায় আসামির কাছ থেকে ৪৩টি ‘ইয়াবা’ বা ‘বাবা’ পাওয়া যায়। ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ৯(ক) ধারায় শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য অর্থ আইনের প্রথম তফসিলে বর্ণিত কোনো মাদকদ্রব্য। কিন্তু প্রথম তফসিলে বর্ণিত মাদকদ্রব্যের মধ্যে সরাসরি ইয়াবা বা বাবার নাম নেই। রাসায়নিক পরীক্ষায় যদি ইয়াবায় মিথাইল এমফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায় তাহলেই সেটা মাদকদ্রব্য হিসেবে গণ্য হবে, অন্যথায় নয়। রাসায়নিক পরীক্ষা না করেই সাজা দেওয়া হয়েছে। ইয়াবায় কোনো লেবেল থাকে না। কাজেই কী কী উপাদান ওই ট্যাবলেটে রয়েছে তা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া নির্ণয় করার সুযোগ নেই। কাজেই আসামিকে সাজা দেওয়া আইনসম্মত হয়নি।

বিশেষ জজ আদালতের ওই রায় পর্যালোচনা করে আইনজীবীরাও মনে করেন, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও সরাসরি ইয়াবাকে মাদকের তফসিলভুক্ত করা হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রেও ইয়াবার রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া শাস্তি দেওয়া বেআইনি।

বিশিষ্ট ফৌজদারি আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, মাদক আইনে কাউকে সাজা দিতে হলে মাদক উদ্ধারের ঘটনা থাকতে হবে। আর সেটা মাদক কি না তা পরীক্ষার জন্য যে বিশেষ বিধান রয়েছে যা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, ‘এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের যুগ। হাতনাতে ধৃত আসামিকেই ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা দিয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে পুলিশ ফোর্স, ম্যাজিস্ট্রেটকেও উপস্থিত থাকতে হয়। আইন অনুসরণ করে সাজা দেওয়ার জন্য সঙ্গে মাদকদ্রব্য বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞকেও রাখা যায়। তিনি মাদক পরীক্ষার সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে পারেন। তিনি মতামত দেওয়ার পর মাদক দখলকারী বা সেবনকারীকে সাজা দিলে তা আইনসম্মত হবে।’

এ প্রসেঙ্গে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের অতিরিক্ত পিপি তাপস কুমার পাল বলেন, বিশেষজ্ঞ দ্বারা তাত্ক্ষণিক পরীক্ষা করার পর যে কোনো শাস্তি আইনসম্মত হবে। আর সে ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত আইন, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন ও বিধিমালাও সংশোধন করা প্রয়োজন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা