kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

এবিটি-জেএমবি জোট বাঁধে দুই বছর আগে!

এস এম আজাদ   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এবিটি-জেএমবি জোট বাঁধে দুই বছর আগে!

নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) ও আনসার আল ইসলামের জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে সংগঠন চাঙ্গা করতে চাইছে। দুই বছর আগে নাশকতা থেকে সরে আল-কায়েদা মতাদর্শী এবিটির (আনসার আল ইসলামসহ) সঙ্গে সমঝোতা করে জেএমবি। এর পর থেকে আইএস মতাদর্শী হিসেবে পরিচিত নব্য জেএমবিতে যোগ দিচ্ছে না পুরনো জেএমবির সদস্যরা। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এবিটির বড় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করতে চান জেএমবির নেতারা। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং জঙ্গি কর্মকাণ্ডের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, এবিটির সামরিক শাখার প্রধান সৈয়দ জিয়াউল হক (চাকরিচ্যুত মেজর) এবং জেএমবির বাংলাদেশ শাখার সাবেক আমির খোরশেদ আলম জিয়া (বগুড়ায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত) দুই সংগঠনের মধ্যে ওই সমঝোতা করেছিলেন। ভিন্ন তরিকার মুসলিম ও নিরপরাধ নারী-শিশুসহ হত্যার

 কর্মকাণ্ড ভুল ছিল বলে স্বীকার করে নেয় জেএমবি। একইভাবে ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করতেও চাপ দেয় এবিটি। আস্থার প্রকাশ ঘটাতে এবিটির পরিকল্পনায় গত বছরের ১১ জুন মুন্সীগঞ্জে প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে ‘দীনের শত্রু’ বিবেচনায় হত্যা করে জেএমবি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে জেএমবি ভারত ও পাকিস্তানে সক্রিয়। শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ফাঁসি ও কারাদণ্ডের পর ২০১৭ সাল পর্যন্ত  ভারতে থাকা সালাউদ্দিন সালেহীন সানি ছিলেন জেএমবির বাংলাদেশ শাখার আমির। এরপর খোরশেদ জিয়াকে দায়িত্ব দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে সংগঠকের কাজ করছেন। সৌদি আরব থেকে আব্দুর রাকিব নামে এক যুবক এবং ইয়েমেন থেকে আব্দুল ওয়াহেদ নামে আরেকজন অনুদানের নামে জেএমবিকে অর্থায়ন করছেন। সালেহীন তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে এই টাকায় কাজ করছেন। খাগড়াগড়ে বোমা হামলাসহ কয়েকটি ঘটনায় ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও খুঁজছে দুর্ধর্ষ জঙ্গি সালেহীনকে।

ওই কর্মকর্তারা জানান, ‘প্রটেক্টর টেক্সট’ ওয়েবসাইট ব্যবহার করে জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন সালেহীন। খোরশেদ আলম জিয়া নিহত হলে শ্যালক আবু রায়হান মাহমুদ ওরফে আবদুল হাদীকে বাংলাদেশ শাখার আমিরের দায়িত্ব দেন সালেহীন। গত ২৪ নভেম্বর রাজধানীর ভাটারা থেকে দুই সহযোগীসহ আবু রায়হানকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি ইউনিট। তাঁকে দুই দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজত) নিয়ে পুরনো জেএমবির বর্তমান কর্মকাণ্ডের অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। নাশকতা না চালালেও সালেহীন ও এবিটির নেটওয়ার্কের কারণে জেএমবির ব্যাপারে নজরদারি বাড়িয়েছেন গোয়েন্দারা।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, “জেএমবিকে বলা হয়ে থাকে ‘জওয়াল’ সংগঠন। বিভিন্ন দেশে তাদের আমির হয়ে থাকে। বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আমির হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্বে ছিলেন সালাউদ্দিন সালেহীন। এরপর আমিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন খোরশেদ আলম জিয়া। বন্দুকযুদ্ধে খোরশেদ জিয়া মারা যাওয়ার পর আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আবু রায়হান ওরফে মাহমুদ ওরফে আবদুল হাদী। সালেহীনের আর্থিক সাপোর্ট ও নির্দেশনায় কাজ চলছিল।”

সিটিটিসি ইউনিটের আরেক কর্মকর্তা জানান, পুরনো জেএমবিতে রায়হান ছাড়া দুজন শুরা সদস্য সক্রিয় আছে। আরো ৩০ থেকে ৪০ জন সদস্য আছে। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে নব্য জেএমবির হামলার আগে ও পরে নাশকতা নিয়ে জেএমবির সদস্যরা দ্বিধায় পড়ে। মাজারের খাদেম, হিন্দু ধর্মাবলম্বী, ভিন্ন তরিকার বক্তা, তাজিয়া মিছিল, পীর-দরবেশদের টার্গেট করার মাধ্যমে অনেক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলেও ধারণা করেন তাঁরা। খোরশেদ জিয়া দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি এবিটি ও আনসার আল ইসলামের কর্মকাণ্ড সঠিক বলে মনে করেন। পাশাপাশি দেখেন, এবিটি অনলাইনের মাধ্যমে অনেক সদস্য সংগ্রহ করে ফেলেছে। সক্রিয়ও আছে। পুরনো জেএমবির সদস্যরা প্রযুক্তিতে পিছিয়ে। একপর্যায়ে তিনি এবিটির নেতা মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়ার কাছে একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। জিয়া তখন খোরশেদ জিয়াকে ভিন্ন তরিকার লোক হত্যা ও ডাকাতি বন্ধ করার পরামর্শ দেন। এতে রাজি হন জেএমবি নেতা। এর পরও এবিটির সদস্যরা জেএমবিকে বিশ্বাস করছিল না। তখন এবিটির টার্গেটে থাকা প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে মুন্সীগঞ্জে হত্যার মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন করে জেএমবি। ঢাকা বিভাগের সামরিক কমান্ডার আব্দুর রহমান (মুন্সীগঞ্জে গত বছরের ২৮ জুন বন্দুকযুদ্ধে নিহত) ছিলেন ওই হামলার অপারেশনাল কমান্ডার।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এবিটির সঙ্গে সমঝোতার আগে মামুনুর রশীদ রিপন, শরিফুল ইলাম খালিদ, সোহেল মাহফুজ, জাহাঙ্গীর আলম রাজীব গান্ধীসহ অনেক জঙ্গি পুরনো জেএমবি থেকে নব্য জেএমিতে যোগ দেয়। তবে সমঝোতার পর আর কেউ নব্য জেএমবিতে যায়নি। খোরশেদ জিয়া নিহত হওয়ার পর এই জোট কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে পারেনি। তবে অনলাইনে এবিটির জঙ্গিদের সহায়তা নিয়ে জেএমবিও সদস্য সংগ্রহ করে চলেছে। পাশাপাশি সালেহীনের নির্দেশনায় ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের আড়ালে মতাদর্শী বাড়ানোর কাজও চলছে।

অর্থায়ন নিয়ে মতবিরোধ : তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভারতে বসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনুদানের নামে টাকা সংগ্রহ করছেন সালেহীন। সেই টাকা আবু রায়হানসহ কয়েকজনের মাধ্যমে দেশে ব্যয় করা হয়। মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জেএমবির নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য আব্দুর রাকিব সৌদি আরব থেকে টাকা পাঠান। তিনি মদিনা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন। তিনি কিছুদিন আগেও দেশে এসেছিলেন। তিনি সৌদি আরবে আছেন। আব্দুল ওয়াহেদ নামের আরেকজন টাকা পাঠান, যিনি থাকেন ইয়েমেনে। ওয়াহেদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আগে তিনি সৌদি আরবে ছিলেন। সালেহীন পুরো টাকা খরচ না করে ছবি তুলে দাতাদের দেখান। তবে আবু রায়হান অনৈতিকভাবে টাকা নিজের কাছে রাখার বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না। এ নিয়ে সম্প্রতি তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা