kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

জেলাজুড়ে দুশ্চিন্তা মাদকের বিস্তার

পুলিশি অভিযানেও মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে চুরি ছিনতাই

নিয়ামুল কবীর সজল ময়মনসিংহ   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




জেলাজুড়ে দুশ্চিন্তা মাদকের বিস্তার

জেলা আইনজীবী সমিতিতে প্রবীণ এক আইনজীবীর কক্ষে বসে কথা বলছিলেন কয়েকজন আইনজীবী ও বিশিষ্টজনরা। আলাপচারিতার একপর্যায়ে উঠে আসে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সবাই একবাক্যে বললেন, ময়মনসিংহ জেলাজুড়ে সব অশান্তির মূলে আছে মাদক। এই সমস্যার সমাধান না হলে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। মাদকই এখন সবার বড় শত্রু।

বাস্তব চিত্রও তাই। জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সবার কাছে মাদক এখন এক আতঙ্কের নাম। আর মাদকের ব্যাপক বিস্তারের কারণে দিন দিন বেড়ে চলেছে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা। অবনতি ঘটছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির। আইন-শৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান আছে। বিশেষ করে ডিবি ও ফাঁড়ি পুলিশ ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযানে নেমেছে। আর যারা ধরা পড়ছে তাদের ৯০ শতাংশই মাদকসেবী। নতুন নতুন কিশোর-যুবক মাদকে জড়িয়ে পড়ছে।

ময়মনসিংহ শহরে মাদকের আখড়া আগেও ছিল। প্রায় ২০ বছর আগে মাদক ছিল শহরের কৃষ্টপুর ও পুরোহিতপাড়া এলাকাকেন্দ্রিক। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। বর্তমানে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছে গেছে ইয়াবাসহ নানা মাদক। উপজেলা ছাড়িয়ে ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায়েও মাদক এখন সহজলভ্য। তরুণ-যুবকরা যুক্ত হয়ে পড়েছে মাদকের কারবারে। অনেক এলাকায়ই বখাটে সন্ত্রাসীরা এখন মাদক কারবারি। ফলে স্থানীয় লোকজনও ভয়ে নীরব থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগে একেকটি উপজেলায় তিন-চারটি মাদকের স্পটের কথা শোনা গেলেও এই সংখ্যা  দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মাদক কারবারি ও সেবনকারী। আগে শুধু সদর উপজেলার কোতোয়ালি থানাতেই মাদক মামলার সংখ্যা বেশি থাকত। এখন নিয়মিত মাদক মামলা হচ্ছে সব কটি থানায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার শম্ভুগঞ্জ এলাকায় রয়েছে মাদকের বড় স্পট। এ ছাড়া চুরখাই, খাগডহর এলাকায়ও মাদকের আখড়া রয়েছে। ফুলবাড়িয়া উপজেলার লাহিড়ীপাড়া, চান্দের বাজার, গৌরীপুর, শিবগঞ্জ, পলাশীহাটা ও দেওখলা বাজার এবং হালুয়াঘাট উপজেলায় পৌর শহরে মনিকুড়া, সীমান্তবর্তী মিলন বাজার, ধারা বাজারের মাঝিয়াই রোড, দড়ি নগুয়া ও কড়ইতলীতে মাদকের দেদার কেনাবেচা চলে।

নান্দাইল উপজেলায় সিড স্টোর বাজার, জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের সুরাটি বাজার, শেরপুর ইউনিয়নের পাচরুকি, বাকচান্দা বাজার, মুসুল্লি, কালিগঞ্জ, পৌর সদরের ভাটিকান্দাপাড়া ও রসুলপুর এবং ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলাতে চরনিখলা, চর হোসেনপুর, দত্তপাড়া, সোহাগী ও সরিষায় রয়েছে মাদকের বড় স্পট।

গফরগাঁও উপজেলার সদর, কান্দিপাড়া, দত্তের বাজার, মশাখালী, টাঙ্গাব ও গয়েশপুরে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের তৎপরতা বেশি। ভালুকা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি মাদকের বিস্তার ঘটেছে হবিরবাড়ী ইউনিয়নে। ধোবাউড়া উপজেলারও প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে মাদক রয়েছে। ত্রিশালে পৌর শহরের জিরো পয়েন্ট, নজরুল কলেজের পেছনে, চরপাড়া, ভাটিপাড়া, আমিরাবাড়ী ইউনিয়নের কাশীগঞ্জ, বগার বাজার চৌরাস্তা মোড়, কোনাবাড়ী বাজার বৈল্লর মোড় এলাকায় হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক।

এদিকে মাদকের ব্যাপক বিস্তারের কারণে ময়মনসিংহ শহরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। বাড়ছে চুরি-ছিনতাই। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মাদকের টাকা জোগাড় করতে চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে নেশাসক্তরা। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য মতে, শহরের পাটগুদাম ব্রিজ এলাকা, রেলস্টেশন, গাঙিনার পাড় মোড়, চড়পাড়া মোড় ও মাসকান্দা এলাকায় ছিনতাই বেশি হয়। ইজি বাইকে যাত্রীবেশেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আহত হচ্ছে অনেকে। আর অহরহ চুরির ঘটনা ঘটছে শহরের সব এলাকায়।

পুলিশ ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও তাদের অপকর্ম বন্ধ হচ্ছে না। প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, শহরে এত বেশিসংখ্যক মাদকাসক্ত, ছিনতাইকারী রয়েছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা খুবই কঠিন কাজ। এর ওপর দিন দিন নতুন নতুন কিশোর বা যুবক সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। শহরতলির মাদকাসক্তরাও শহরে এসে অপরাধ করছে।

জেলা শহরের ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়িতে দায়িত্বরত এসআই ফারুক হোসেন বলেন, যারা চুরি বা ছিনতাই করছে তাদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। তবে পুলিশ এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে গত এক বছরে জেলায় ডিবি পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে। তার পরও মাদক কারবারিরা নানা কৌশলে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জেলা ডিবির ওসি শাহ কামাল জানান, মাদক নিয়ে তাঁরা সতর্ক আছেন। যেখানেই তথ্য পাচ্ছেন অভিযান চালাচ্ছেন। পাশাপাশি ছিনতাই রোধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা