kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

এমপি মইন উদ্দীন খান বাদলের জীবনাবসান শোকের ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম    

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এমপি মইন উদ্দীন খান বাদলের জীবনাবসান শোকের ছায়া

চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বেঙ্গালুরুতে নারায়ণা ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস হাসপাতালে গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর ছোট ভাই মনির উদ্দীন খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।

দুই বছর আগে মইন উদ্দীন খান বাদল স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পাশাপাশি ৬৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিক হৃদ্যন্ত্রের জটিলতায়ও ভুগছিলেন। গত ১৮ অক্টোবর নিয়মিত চেকআপের জন্য তাঁকে নারায়ণা ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মইন উদ্দীন খান বাদলের মরদেহ দেশে আনার জন্য বেঙ্গালুরু গেছে। এ ছাড়া তাঁর পরিবারের সদস্যরা গেছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-নগর আংশিক) আসনের টানা তিনবারের সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল জাতীয় সংসদের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকও শোক জানিয়েছেন। শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে জাতীয় সংসদে।

সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এক শোকবার্তায় বলেছেন, ‘মইন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে দেশ একজন নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রগতিশীল অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারাল।’

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ তাঁর শোকবার্তায় বলেন, ‘তাঁর মৃত্যুতে জাতি আজ বিনয়ী অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ, শিক্ষিত ও ত্যাগী রাজনীতিবিদকে হারাল। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হবার নয়।’

মইন উদ্দীন খান বাদলের একান্ত সহকারী এস এম হাবিব বাবু গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, শুক্রবার সকালে মরদেহ ঢাকায় আনার কথা রয়েছে। মরদেহ আনার পর প্রথমে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাঁর বাসায় নেওয়া হবে। এরপর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুমার নামাজের পর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর চট্টগ্রামে আনার পর নগরের জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজার পর গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালী নেওয়ার কথা রয়েছে।

সংসদ সদস্য বাদল স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের হঠাৎ মৃত্যুতে বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতু নির্মাণ নিয়ে। এরই মধ্যে বাদল ঘোষণা দিয়েছিলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মিত না হলে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন। বর্তমান কালুরঘাট রেলওয়ে সেতুটি প্রায় ৮৮ বছর আগের। কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাটে একটি নতুন সেতু করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামবাসী দাবি জানিয়ে আসছে। প্রবীণ এই রাজনীতিকের মৃত্যুর পর দল-মত-নির্বিশেষে সবার মুখে মুখে ফিরছে তিনি সেতু দেখে যেতে পারলেন না।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মইন উদ্দীন খান বাদল। তাঁর বাবা আহমদ উল্লাহ খান ও মা যতুমা খাতুন। ষাটের দশকে ছাত্রলীগের ‘নিউক্লিয়াসে’ যুক্ত বাদল একাত্তরে ভারতে প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্রবোঝাই জাহাজ সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস প্রতিরোধের অন্যতম নেতৃত্বদাতা ছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন বাদল। জাসদ হয়ে বাসদ এবং পরে আবারও জাসদে ফেরেন। এরশাদের সামরিক শাসনের সময় তিনি কারাবরণ করেন। ২০১৬ সালের ১২ মার্চ জাসদের জাতীয় কাউন্সিলে আবার দুই ভাগ হয় দলটি। হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতারের নেতৃত্বাধীন অংশটি ইসির স্বীকৃতি পাওয়ার পর শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানের নেতৃত্বাধীন অংশটি বাংলাদেশ জাসদ নামে আলাদা দলের স্বীকৃতি চায়। তবে ইসি তাদের নিবন্ধন দেয়নি। এই অংশের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন মইন উদ্দীন খান বাদল।

চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়ন পান শরিক দল জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা বাদল। নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন তিনি। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনেও জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় ও স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে সাহসী বক্তব্য দেওয়া বাদল সমাদৃত ছিলেন একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল গঠনেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা