kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশিষ্টজনদের অভিমত

‘ধর্মকে ব্যবহার করে এখনো রাজনীতি’

শরীফুল আলম সুমন   

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘ধর্মকে ব্যবহার করে এখনো রাজনীতি’

ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও এখনো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ধর্মকে ব্যবহার করে এখনো চলছে রাজনীতি। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দলসহ অনেকেই ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করছে। দুষ্কৃতকারী ও অভিসন্ধিকারীরাও ধর্মকে ব্যবহার করছে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমনকি প্রাণও দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। যার তরতাজা উদাহরণ ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনা। গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে দেশের কয়েকজন বিশিষ্টজনের সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে এসব কথা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আল্লাহ ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক তরুণের বিচারের দাবিতে গত রবিবার ভোলার বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে তৌহিদী জনতা। সমাবেশের জন্য পুলিশ অনুমতি না দিলেও সকাল ৯টা থেকে লোকজন ওই মাঠে জড়ো হতে থাকে। মিছিল করতে না পেরে সেখানেই অবস্থান নেয় তারা। উত্তেজনার একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আত্মরক্ষায় পুলিশ গুলি ছুড়লে মারা যায় চারজন। তাদের মধ্যে দুজন মাদরাসার শিক্ষার্থী রয়েছে।

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোলায় যে ঘটনাটি ঘটেছে তা খুবই দুঃখজনক। আমার মনে হয় কিছু লোক সাম্প্রদায়িক বিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে।’

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভোলার ঘটনাটিই তার প্রমাণ। ধর্মকে ব্যবহার করে এখনো চলছে রাজনীতি। সেটা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে অন্যান্য দলগুলোও করছে। দুষ্কৃতকারী ও অভিসন্ধিকারীরাও ধর্মকে ব্যবহার করছে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

এই শিক্ষাবিদ আরো বলেন, ‘আমাদের একটা অভিন্ন শিক্ষা দরকার ছিল। কারণ বড়লোক বা যারা বুর্জোয়া বলে পরিচিত তাদের ছেলে-মেয়েরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। মধ্যবিত্তরা তাদের সন্তানদের পড়াচ্ছে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আর গরিবের সন্তানরা পড়ছে মাদরাসায়। বুর্জোয়ারা এই মাদরাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করছে। তবে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশের শিক্ষা পাচ্ছে না। সব কিছু মিলিয়ে আমরা ভয়ংকর জায়গায় চলে যাচ্ছি। যেকোনো সময় আরো বড় বিস্ফোরণ হতে পারে।’

লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘ভোলার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত। যদিও এটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে বলা হচ্ছে, তার পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরো সংযত হওয়া উচিত ছিল। এ ধরনের ঘটনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এ ঘটনায় উচ্চ আদালতের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত করে এর পেছনে থাকা দোষীদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তবে যারাই ঘটনা ঘটাক, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।’

মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, ‘সাধারণ মানুষ নিজে থেকে সাম্প্রদায়িক হয় না, যখন কেউ না তাকে উসকে দেয়। আবার অনেক সময় মানুষ কিছু না বুঝেও গুজবের পেছনে দৌড়াতে থাকে। এখন ভোলায় যে ‘তৌহিদি জনতা’ আন্দোলনের ডাক দিল, তারা কারা, কী উদ্দেশে এই সংগঠনের সৃষ্টি, তা খুঁজে বের করতে হবে। ভোলার ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘যখন সরকার প্রধান অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে, তখন সেই সময়ে আমাদের দৃষ্টি সরানোর জন্যও এই কাজ হতে পারে। তবে প্রশাসন আরো শক্তভাবে ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।’

এদিকে ফেসবুকে হ্যাক করে একটি বিভ্রান্তিকর পোস্টের সূত্র ধরে ভোলায় চারজনের মৃত্যুর ঘটনা অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম। গতকাল কমিশনের এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এ ঘটনায় ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা করা হয়েছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এ ঘটনায় কমিশন সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা