kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে হত্যা করেন বাবা ও চাচা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে হত্যা করেন বাবা ও চাচা

তুহিন হত্যা

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে তুলে বাইরে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছেন বাবা আব্দুল বাছির ও চাচা নাসির। ঘাতকরা পরে দুটি কান ও পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলেন। আর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি ছুরির বাঁটে প্রতিপক্ষের সালাতুল ও সোলেমানের নাম লিখে পেটে বিদ্ধ করে লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন।

ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ সদরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পরিবারের লোকজনই নিজ সন্তানকে এমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা, তিন চাচা ও চাচাতো ভাইকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর আগে সোমবার রাতে নিহত শিশুটির মায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ১০ জনকে আসামি করে দিরাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়।

এদিকে গতকাল বিকেলে সুনামগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মিয়ার আদালতে চাচা নাসির ও চাচাতো ভাই শাহরিয়ার ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামকান্ত সিনহার আদালত বাবা আব্দুল বাছির, দুই চাচা জমসেদ ও আব্দুল মোছাব্বেরকে তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রবিবার রাতে হত্যাকাণ্ডের পর সোমবার দুপুরে সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুহিনের বাবা, তিন চাচা, চাচাতো ভাই-বোন ও চাচিকে থানায় নিয়ে আসা হয়। তাঁদের পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই দিন রাতেই পুলিশ নিশ্চিত হয় যে হত্যাকাণ্ডে পরিবারের লোকজন জড়িত।

গতকাল বিকেল পৌনে ৪টায় চাচা নাসির ও চাচাতো ভাই শাহরিয়ারকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মিয়ার আদালতে নিয়ে আসে পুলিশ। একই সঙ্গে বাবা আব্দুল বাছিরসহ দুই চাচাকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামকান্ত সিনহার আদালতে রিমান্ড শুনানির জন্য নিয়ে আসা হয়। পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে।

সাংবাদিকদের সামনেই বিচারক শিশুটির বাবা আব্দুল বাছিরকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির আহ্বান জানালে তিনি এ ঘটনায় জড়িন নন বলে দাবি করেন। এ সময় বিচারক তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার ভাই ও ভাতিজা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। আপনারা এই পরিকল্পিত নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে বাঁচতে পারবেন না।’ পরে আদালত তিনজনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, গ্রাম্য কোন্দল, মামলার জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই পরিকল্পিতভাবে পরিবার শিশুটিকে হত্যা করে। রবিবার দিবাগত রাতে শিশুটিকে ঘুম থেকে কোলে তুলে বাইরে বের হন বাবা আব্দুল বাছির। পরে চাচা নাসির ও বাবা মিলে তাকে নৃশংস কায়দায় গলা কেটে হত্যা করেন। শিশুটির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ছুরি দিয়ে দুই কান ও যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়। পরে ছুরিবিদ্ধ মৃতদেহ কদমগাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তিনি জানান, হাতের ছাপ ও ছুরির বাঁটের লেখা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরো বলেন, তুহিনের বাবা হত্যা মামলা ও লুট মামলার আসামি। ঘাতকরা জানিয়েছেন, শিশুটিকে ওর বাবাই কোলে করে নিয়ে যান। আর কোলে থাকা অবস্থায়ই শিশুটির গলা কেটে ফেলা হয়। আমরা পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করেছি। দ্রুততম সময়ে মামলাটির পুলিশ রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’ আদালতে দুজন হত্যার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এই মালায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আরো কেউ সংশ্লিষ্ট আছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রামের সাবেক ইউপি মেম্বার আনোয়ার হোসেন, তাঁর সহযোগী সালাতুল, সোলেমানসহ প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। প্রায় এক যুগ আগে কবীর মিয়া ও নিলুফার নামের দুই ব্যক্তির খুনের ঘটনায় তুহিনের বাবা আব্দুল বাছির ও চাচারা আসামি। গত সোমবার ওই মামলায় যুক্তিতর্কের দিন ধার্য ছিল। তাই ওই দিনের আগের রাতকে হত্যাকাণ্ডের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

মানববন্ধন : শিশু তুহিন হত্যার প্রতিবাদে ও ঘাতকদের কঠিন শাস্তির দাবিতে গতকাল সুনামগঞ্জ শহরে তিনটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন, খেলাঘর ও দিরাই-শাল্লা এলাকাবাসী এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। মানববন্ধনে দিরাই উপজেলার সব আইনজীবী ঘোষণা দেন, তাঁরা এ ঘটনায় খুনিদের কোনো আইনি সহায়তা দেবেন না।

দিরাই-শাল্লা প্রতিনিধি জানান, বর্বরতম এই হত্যার ঘটনায় শোককাতর ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল তাঁরা মানববন্ধন করেছেন। দুপুর সাড়ে ১২টায় দিরাই থানা পয়েন্টে খেলাঘর এবং বিকেল ৪টায় সুজন মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে।

সরেজমিন কাজাউড়া গ্রামে নিহত শিশু তুহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সুনশান নীরবতা। শোকে মুহ্যমান পরিবারের নারী সদস্যসহ আগত স্বজনরা। এভাবে সন্তান হারানোর শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তুহিনের মা। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের কোনো সদস্যই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তুহিনের মামা নুরুজ্জামান বলেন, ‘ওর মা অসুস্থ, কথা বলতে পারছেন না। কোনো মামলা হয়েছে কি না, আমরা জানি না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা