kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

১৫ বছরে কিভাবে এত সম্পদ!

বাবুরহাটের নিয়ন্ত্রণ বাকির পরিবারের

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১৫ বছরে কিভাবে এত সম্পদ!

নরসিংদীর সদর উপজেলার শীলমান্দি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল বাকিরের পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলছে প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার খ্যাত পাইকারি কাপড়ের বাজার শেখেরচর বাবুরহাট। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, হাটে পরিবারটির চলমান কোনো ব্যবসা না থাকলেও গত দেড় দশকে প্রভাব খাটিয়ে আবদুল বাকির হয়েছেন ছয়টি বহুতল মার্কেট ভবন, কয়েক একর জমিসহ প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। সম্প্রতি তিনি বাবুরহাট বণিক সমিতির সভাপতি হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের হোল্ডিং ট্যাক্সের নামে ব্যাপক চাঁদাবাজি শুরু করলে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন ব্যবসায়ীরা।

এ নিয়ে গত রবিবার কালের কণ্ঠ’র শেষের পাতায় ‘বাবুরহাটে চাঁদাবাজি ইউপি চেয়ারম্যানের, পাঁচ হাজার দোকান থেকে ৩০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে ব্যবসায়ীরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও কোনো প্রতিকার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।

চেয়ারম্যানের বাবা মৃত আবু সিদ্দিক ওরফে সিদ্দিক মিয়ার কাছ থেকে কয়েক শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি এবং বাবুরহাটে মাত্র একটি দোকানঘর পেলেও বর্তমানে তাঁরা কিভাবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন তার হিসাব মেলাতে পারছে না স্থানীয় কেউ। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের নানা প্রশ্ন থাকলেও চেয়ারম্যানসহ তাঁর ছয়  ভাইয়ের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়।

চেয়ারম্যান ও তাঁর ভাইদের দখলে যত পদ ও সম্পদ : বাবুরহাটে ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল বাকির একাই দখল করেছেন বেশ কয়েকটি পদ। প্রতিটি পদের জন্যই প্রতি সপ্তাহে আসে বিপুল পরিমাণে চাঁদা। বাজারের পাশে বাড়ি হওয়ায় চেয়ারম্যান বাকিরের ব্যাপক প্রভাব। তা খাটিয়েই তিনি প্রথমে বাবুরহাট লেবার সমিতির সভাপতি হন। পরে ঘর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, আড়তদার সমিতির সভাপতি, পাবনা জেলার বাসিন্দা না হয়েও প্রভাব খাটিয়ে বাবুরহাট পাবনা ক্ষুদ্র সমিতির সভাপতি, বাবুরহাট মসজিদের সভাপতি ও সর্বশেষ বাবুরহাট বণিক সমিতির সভাপতি হন।

বাবুরহাটে কয়েক শ কোটি টাকার বহুতল তিনটি ভবনসহ মোট চারটি মার্কেটের যৌথ মালিকানা রয়েছে তাঁর। এর মধ্যে ছয়তলা বিশিষ্ট বাবুরহাট প্লাজা-১, যার প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে শতাধিক দোকান। আর প্রতিটি দোকানের আনুমানিক মূল্য গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। এ ছাড়া রয়েছে ছয়তলা বিশিষ্ট বাবুরহাট প্লাজা-২ ও বাবুরহাট টাওয়ার। এই দুটিরও প্রতি ফ্লোরে শতাধিক দোকান রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচদোনা-ডাঙ্গা সড়কে রয়েছে ৫৫ শতাংশ জমির ওপর যৌথ মালিকানায় একতলা বিশিষ্ট পাকুরিয়া নিউ মার্কেট। বাকিরের শেখেরচরে রয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ জমির ওপর ছয়তলা বিশিষ্ট একটি বাগানবাড়ি। এর পাশেই নির্মাণাধীন ১১ তলা বিশিষ্ট বসতবাড়ি।

তাঁর ছোট ভাই মো. রফিকুল ইসলাম বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি নরসিংদী সদর উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরও কোনো চলমান ব্যবসা নেই। নামসর্বস্ব মেসার্স এসএ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যক্রম নেই বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান। তিনিও বাবুরহাটে বহুতল ভবনের চারটি মার্কেটের যৌথ মালিক। এগুলো হচ্ছে ১০ তলা বিশিষ্ট বাবুরহাট লেক টাওয়ার, ছয়তলা বিশিষ্ট ম্যানচেস্টার সিটি, আটতলা বিশিষ্ট পানামা প্লাজা ও পাঁচতলা বিশিষ্ট বন্ধন প্লাজা। এসব মার্কেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে রয়েছেন তিনি। এ ছাড়া সম্প্রতি শেখেরচরে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আলিশান বাড়ি নির্মাণ করে সবার দৃষ্টি কেড়েছেন। এ ছাড়া তিনি মাধবদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট ও মাধবদী সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদেও আছেন।

চেয়ারম্যানের আরেক ভাই আতিকুর রহমান। তিনি সারা দেশ থেকে বাবুরহাটে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ করেন। ভাইদের মধ্যে সবার বড় মো. জাকারিয়া। তিনি একসময় ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। করেছেন আটটি বিয়ে। ভাইয়েরা তাঁর এহেন কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। তাঁদের অপর দুই ভাই মো. শফিকুল ইসলাম মাদকাসক্ত ও আজাহার মানসিক ভারসাম্যহীন।

নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন ভূইয়া বলেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আবদুল বাকিরকে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তার পরিবারের প্রায় সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। শুধু বাকির আওয়ামী লীগ করত। সম্পদের পাহাড় করার জন্যই কি তারা ভাইয়েরা মিলেমিশে সমঝোতার রাজনীতি করত কি না, এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাই না। তবে সবাই এটাই মনে করে।’

নরসিংদী সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শাহ আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাবুরহাট বাজারটি অব্যবস্থাপনার মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইনের নির্দেশনায় শেখেরচর বাবুরহাটে আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শেখেরচর বাবুরহাটটি মূলত সরকারি সম্পত্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা বাজারটিকে তাদের নিজেদের বলে মনে করত।

এসব বিষয়ে জানার জন্য আবদুল বাকিরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা