kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

রিশা হত্যা মামলা

ওবায়দুলের ফাঁসির দণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ওবায়দুলের ফাঁসির দণ্ড

রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশা হত্যার দায়ে একমাত্র আসামি ওবায়দুল খানকে ফাঁসির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ তাঁর জনাকীর্ণ আদালতকক্ষে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়।

ওবায়দুল রাজধানীর ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটে বৈশাখী টেইলার্সের কর্মচারী ছিলেন। রায় ঘোষণার সময় ওবায়দুলকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায়ের পর আবার কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালত রায়ে বলেছেন, আসামির বিরুদ্ধে রিশাকে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণে এটা স্পষ্ট যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে রিশাকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। কাজেই এই আসামিকে অনুকম্পা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। তাঁর মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করতে হবে। তবে রায় কার্যকরের আগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুয়ায়ী হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হবে। বিচারক মামলার নথি অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে পাঠাতে নির্দেশ দেন।

গত ১১ সেপ্টেম্বর আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গতকাল রায়ের তারিখ ধার্য করেন আদালত। এ মামলায় ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল ওবায়দুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। বিচার চলাকালে ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট রিশা ও তার বন্ধু মুনতারিফ রহমান রাফি রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরীক্ষা শেষে কাকরাইল ফুট ওভারব্রিজ পার হওয়ার সময় ওবায়দুল রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। রিশা ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ওবায়দুল তাকে ছুরিকাঘাত করেন। রক্তাক্ত অবস্থায় রিশাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার দিন পর ২৮ আগস্ট রিশা মারা যায়।

ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ২৪ আগস্টই রিশার মা তানিয়া হোসেন বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। রিশার মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ঘটনার পাঁচ-ছয় মাস আগে রিশা ও তার মা তানিয়া রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটে বৈশাখী টেইলার্সে কাপড় সেলাই করাতে যান। এ সময় তার মা ওই দোকানের রসিদে ফোন নম্বর দিয়ে আসেন। ওই টেইলার্সের কর্মচারী ওবায়দুল ওই ফোন নম্বর সংগ্রহ করে রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। মাঝেমধ্যেই রিশাকে ওবায়দুল বিরক্ত করতেন। একসময় ওই মোবাইল সিমটি বন্ধ করে দেন রিশার মা। এ বিষয়ে ওবায়দুলকে সতর্কও করে দেন। কিন্তু কোনো কথা না শুনে রিশাকে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে বিরক্ত করতে থাকেন ওবায়দুল। কিন্তু রিশা পাত্তা না দেওয়ায় ওবায়দুল রিশাকে খুন করার পরিকল্পনা করেন।

ওবায়দুলকে ঘটনার ছয় দিন পর ৩১ আগস্ট নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় বাজারের ব্র্যাক অফিসের পেছনের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বাড়ি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের মিরাটঙ্গী গ্রামে। পরদিন ১ সেপ্টেম্বর ওবায়দুলকে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এরপর ওবায়দুল মহানগর হাকিম আহসান হাবীবের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জাবনবন্দি দিয়ে রিশাকে হত্যার দায় স্বীকার করেন।

স্বীকারোক্তিতে ওবায়দুল বলেন, রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় রিশাকে খুনের সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনার দিন তিনি পরিকল্পনা করেই উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের গেটে আসেন। ছুটি শেষে তিনি রিশার পিছু নেন। কাকরাইল ফুট ওভারব্রিজের ওপর গেলে রিশাকে আবারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। রিশা রাগ হয়ে ওই প্রস্তাব নাকচ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওবায়দুল হাতিরপুল বাজার থেকে ১৩০ টাকা দিয়ে একটি ছুরি কেনেন। রিশাকে ছুরি মেরে তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। এ সময় কাকরাইলের রাজস্ব ভবনের পাশে ছুরিটি ফেলে দেন বলেও স্বীকারোক্তিতে জানান ওবায়দুল।

২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর ওবায়দুলকে একমাত্র আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলী হোসেন।

রিশার মায়ের কান্না : রায় শোনার জন্য আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত রিশার মা তানিয়া হোসেন। তিনি খুনির উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে বলে মনে করেন। তবে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় কার্যকর করার দাবি জানান। তিনি বলেন, এভাবে যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়।

রায় শোনার জন্য উলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা আদালত এলাকায় উপস্থিত ছিল। তারা আসামির ফাঁসির দাবি ও ফাঁসি দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর করার দাবিসংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করে।

রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত পিপি তাপস কুমার পাল মামলা পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা