kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

ছাত্রসংগঠন বন্ধের বিধান মানছে না দলগুলো

অপকর্মের মাসুল গুনতে হচ্ছে মূল দলকেই

কাজী হাফিজ   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ছাত্রসংগঠন বন্ধের বিধান মানছে না দলগুলো

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯০(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র বা শিক্ষক; কোনো আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা শ্রমিক এবং অন্য যেকোনো পেশার সদস্যদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন করা নিষিদ্ধ। এ বিধান না মানলে সংশ্লিষ্ট দলের নিবন্ধনও বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার আছে নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু বাস্তবে এ বিধান কার্যকর হচ্ছে না। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে গঠনতন্ত্রে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ না থাকলেও বাস্তব কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো পরিবর্তনের দেখা মেলে না। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের এবং ছাত্রদল বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবেই এখনো পরিচিত। শ্রমিক ও পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। শিক্ষকদের মধ্যে নীল-সাদার বিভাজন শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নয়নের বিপরীতেই কাজ করছে বলে অনেকের বিশ্বাস।

আওয়ামী লীগ সভাপতিই হচ্ছেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেতা। এই ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব পরিবর্তনে মূল দলের কর্তৃত্ব অপ্রকাশ্য নয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁদের পদ  থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয় এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ছাত্রলীগের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ও আওয়ামী লীগকে বহন করতে হয়।

গত ৩ জুন এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি করার ঘোষণা দেয় বিএনপি। আদালতে এই ঘোষণার বৈধতা চ্যালেঞ্জ হয়।

২০১০ সালের মার্চে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার বিষয়ে চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছিল। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও জনসভায় দেওয়া বক্তৃতা উদ্ধৃত করে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ কয়েকটি দলের কাছে জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানাতে বলা হয়েছিল চিঠিতে। তবে শামসুল হুদা কমিশনের পর কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কমিশন এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নেয়। ২০১৭ সালে কে এম নুরুল হুদার কমিশনের কাছে আইন লঙ্ঘন করে চালু থাকা রাজনৈতিক দলের এসব অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন এবং দলগুলোর বিদেশি শাখার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি। কে এম নুরুল হুদার কমিশনও বিষয়টি সম্পর্কে কাজী রকিব কমিশনের মতোই নির্লিপ্ত অবস্থানে রয়েছে।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী আইনে ব্যাপক সংস্কার সাধনের উদ্যোগ নিয়েছিল শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি। ওই সময় ইসির সঙ্গে সংলাপে সহযোগী বা অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগ বলেছিল, ‘পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত এবং গণতান্ত্রিক দেশেই অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন বিদ্যমান এবং তা নিষিদ্ধ করা মৌলিক অধিকারের, বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের পরিপন্থী।’ 

সে সময় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাসদ (ইনু) ইসিকে একই মত জানিয়েছিল। জাতীয় পার্টি মত দিয়েছিল অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন বন্ধ করার পক্ষে। আর সব দলের অভিমত নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল সিপিবি। বিভাজনের কারণে বিএনপির মূল অংশ ওই সময় সংলাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি।

অন্যদিকে ওই বিধান করার পক্ষে ইসির বক্তব্য ছিল, ‘এসব অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা স্বাধীনতার পূর্বে বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সংগঠনের অবদানের কথা বিস্মৃত হয়ে আদর্শহীন রাজনীতির অপসংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির জন্য এ অবস্থা হতাশাজনক। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এসব অঙ্গসংগঠন প্রতিষ্ঠা করে দেশের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছেন। এ ধরনের আচরণ সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রবর্তনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন সংযুক্তি বন্ধ করা প্রয়োজন।’

বিষয়টি সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘২০০৭/২০০৮ সালের দিকে আমাদের নির্বাচন কমিশন ছাত্রদের রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা চেয়েছিলাম ছাত্রসংগঠনগুলোর কোনো দলীয় পরিচয় থাকবে না। কিন্তু সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতের কারণে আমরা আমাদের শক্ত অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসি। তার পরও এ বিষয়ে দল নিবন্ধনের যে শর্ত রয়েছে তা মানা হচ্ছে না। এর মাসুল রাজনৈতিক দলগুলোকেই দিতে হচ্ছে। ফেসবুকে একটা পোস্ট দেওয়ার কারণে বুয়েটের একজন ছাত্রকে সাপ মারার মতো পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

এম সাখাওয়াত হোসেন আরো বলেন, ‘ছাত্রসংগঠনগুলো এখনো মূল দল থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। ছাত্রসংগঠনে অ্যাপয়েন্টমেন্টও দেওয়া হচ্ছে মূল দল থেকে। সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এরা যা খুশি তাই করছে। সব দলেরই এক অবস্থা। আরপিওতে ছাত্রসংগঠন সম্পর্কে যে বিধান রয়েছে, সেটাও যদি মূল দলগুলো পুরোপুরি মেনে চলে তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। প্রয়োজনে এসংক্রান্ত আইন আরো কঠোর করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব না। রাজনৈতিক দলগুলোসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত সময় এখনই।’

আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার বুয়েটে বিক্ষোভকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে আট দফা দাবি জানিয়েছেন, তার প্রথমেই রয়েছে ক্যাম্পাসে নোংরা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা। বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানও ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে গতকাল বলেন, ‘আমার মনে হয় না বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। বুয়েটেও ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা