kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

বছরে অভিযুক্ত ১৪২৫৯ বেশির ভাগ লঘুদণ্ডে পার

পুলিশে অপরাধ বেড়েছে

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বছরে অভিযুক্ত ১৪২৫৯ বেশির ভাগ লঘুদণ্ডে পার

বিগত এক বছরে সারা দেশে ১৪ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলছে। বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর সদস্যদের এভাবে একের পর এক দুর্নীতি-অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরও বিব্রত।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও অন্যান্য মহানগরসহ সারা দেশে পুলিশের ১৪ হাজার ২৫৯ জন সদস্য দুর্নীতিসহ নানামুখী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে সদর দপ্তরে। তাঁদের মধ্যে ডিএমপিরই কয়েক শ সদস্য রয়েছেন।

দুর্নীতির এসব অভিযোগ তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় এরই মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে লঘুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন ১৩ হাজার ৬৫৫ জন। গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৬০৪ জনকে। ৬৯ জনকে করা হয়েছে চাকরিচ্যুত। আর পাঁচজনকে পাঠানো হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরে।

সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৮ সালের আগেও সারা দেশে দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে পুলিশের অনেক সদস্য অভিযুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৭ সালে এক হাজার ৫১২ জন, ২০১৬ সালে ১১ হাজার ও ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৩৪ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এসব পুলিশের মধ্যে ডিএমপির সহস্রাধিক সদস্য রয়েছেন। ডিএমপি সদর দপ্তরের ডিসিপ্লিনারি বিভাগ থেকে ৫০টি থানা ও আটটি বিভাগের পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশের কর্মকর্তা থেকে কনস্টেবল পর্যায়ে নানামুখী দুর্নীতি এবার গত বছরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কেননা এরই মধ্যে পুলিশে দুর্নীতির বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ডিএমপির উপকমিশনার, পরিদর্শক থেকে কনস্টেবল পদের সদস্যও রয়েছেন।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ৩৫ লাখ টাকার চেক সংগ্রহ করে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে গ্রেপ্তার হন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের পরিদর্শক মীর আবুল কালাম আজাদ ও এএসআই মোস্তাফিজুর রহমান। ঢাকা রেঞ্জের একজন অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি প্রাথমিক তদন্তে ওই অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় তদন্তে ওই দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আরো দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরেই নানা আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শুধু ৩৫ লাখ টাকা নয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেক জালিয়াতি করে এর আগে তাঁরা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য মিলেছে। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অর্থ ও প্রশাসন) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্নীতির দায়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আইজিপির নির্দেশে চেষ্টা চলছে একজন পুলিশও যেন দুর্নীতিতে না জড়ায়। এর পরও এত বড় বাহিনীর মধ্যে কিছু সদস্য বিপথে চলে যাচ্ছে। তবে দুর্নীতি করে কেউই পার পাবে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, সব দেশেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কমবেশি অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে পুলিশের কাছ থেকে জনগণ সব সময় সেবা আশা করে। বর্তমান সরকার পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা যেভাবে বাড়িয়েছে তাতে মোটামুটিভাবে জীবন চলায় তাঁদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এর পরও যাঁরা দুর্নীতিতে জড়াচ্ছেন তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমান সরকার যেভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে, বাস্তবে এর প্রয়োগ থাকতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ ধরা পড়ার আগে পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ দুর্নীতির দায়ে আরো চারবার দণ্ডিত হন। এর পরও ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার আশীর্বাদ পেয়ে তিনি বারবার দুর্নীতি করেও পার পেয়ে গেছেন।

অভিযুক্ত অন্যজন এএসআই মোস্তাফিজুর রহমান ২০১৬ সালের ২১ জুন কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতির আগে থেকেই ঢাকা রেঞ্জ অফিসে কর্মরত ছিলেন। পদোন্নতির পরও নানা কায়দায় সেখানেই বহাল থাকেন।

এ দুই পুলিশ সদস্যের মতোই সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে শাস্তির মধ্যে আছেন ডিএমপির উপকমিশনার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খান। তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানীর ওয়ারীতে সম্পত্তি দখলে আট থেকে ১০ কোটি টাকার আর্থিক সম্পৃৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এই দুর্নীতিতে সহায়তার অভিযোগ ওঠে বংশাল থানার সাবেক ওসি সাহিদুর রহমান ও নবাবপুর ফাঁড়ির সাবেক ইনচার্জ এসআই জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধেও। প্রাথমিক তদন্তে সেই অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। এ ছাড়া গত সপ্তাহেই ১০ লাখ টাকা ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন বংশাল থানার কনস্টেবল মামুন। এর আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক সদস্যকে জব্দ করা ইয়াবা চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির আরো বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছে।

তবে এভাবে একের পর এক পুলিশ সদস্য দুর্নীতির দায়ে ধরা পড়লেও পরিস্থিতির পরিবর্তন নেই। সম্প্রতি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিরপরাধ এক ব্যক্তিকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার এএসআই আলমগীরকে ক্লোজ করা হয়। এর মাঝেই যশোরের শার্শায় পুলিশ কর্মকর্তাসহ চারজনের বিরুদ্ধে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এভাবে গত এক মাসে সারা দেশে আরো অন্তত ২০ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি, এমনকি ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সেসব অভিযোগের বিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে।

পুলিশের আর্থিক দুর্নীতি এবং মাদকসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রথমে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়। এরপর সত্যতা পাওয়া গেলেই তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটা চলমান প্রক্রিয়া।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা