kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

কোষাধ্যক্ষ, অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ভিসি নিজেই

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কোষাধ্যক্ষ, অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ভিসি নিজেই

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য মাসুম হাবিব অবৈধভাবে নিজেই কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গেজেট অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান হবেন কোষাধ্যক্ষ। সেই সুবাদে উপাচার্য কোষাধ্যক্ষ হিসেবে অর্থ কমিটিরও চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। ভিসি হয়ে তিনি তিনটি পদ দখল করে রেখেছেন। দেশের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিদের এ ধরনের পদ দখলের ইতিহাস নেই বলে জানা গেছে।

এদিকে রামেবি রাজশাহীতে হলেও সিন্ডিকেট সভা করা হয় ভিসির সুবিধার জন্য ঢাকায়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে সিন্ডিকেট সভার ইতিহাসও দেশে প্রথম বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। এতে অতিরিক্ত অর্থও খরচ হয়। এমনকি সদস্যদের ঢাকায় যাতায়াত করতে বিমানভাড়াও প্রদান করা হয়। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়টির নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ।

সূত্র মতে, রামেবির অস্থায়ী ক্যাম্পাস হলো নগরীর বন্ধগেট এলাকায়। রাজশাহী মেডিক্যাল ক্যাম্পাস চত্বরে নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার ভবনে চলার কথা রামেবির সার্বিক কার্যক্রম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টির লিয়াজোঁ অফিসের নামে ঢাকার মোহাম্মদপুরে নবোদয় এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেখানে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চারটি সিন্ডিকেট সভাও হয়েছে রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায়। দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা প্রথম বলে দাবি করেছেন সিন্ডিকেট সদস্যরা। এমনকি এখন পর্যন্ত দুইবার পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রায় ৪০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও সেই নিয়োগ পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায়। এতে চাকরি প্রার্থীদের ব্যাপক ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। চাকরি প্রার্থীদের অভিযোগ, ভিসি তাঁর পছন্দের প্রার্থীদের চাকরি দিতেই ঢাকায় নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণ করেন।

সূত্র মতে, চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ সিন্ডিকেট বৈঠকে উপাচার্যের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সিদ্ধান্ত আকারে অনুমোদন করে নেওয়া হয়। এর ব্যাখ্যা হিসেবে দেখানো হয়, কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যত দিন এই নিয়োগ না হবে, ততদিন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করবেন

পদটিতে। সেই হিসেবে ভিসি কাম কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রয়েছেন। সেই সুযোগে তিনি ইচ্ছামতো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ খরচ করে চলেছেন। যার হিসাবও দাখিল করা হয় না কখনো। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি বার্ষিক বাজেটও ইচ্ছামতো করে থাকেন।

২০১৮ সালের ১ জুলাই দ্বিতীয় সিন্ডিকেট সভায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ছয় কোটি ১৩ লাখ টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন ভিসি মাসুম হাবিব। কিন্তু ওই বাজেটে খাতভিত্তিক আয়-ব্যয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না। ওই সময় সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে খাতভিত্তিক আয়-ব্যয় দাখিলসহ বাজেট উপস্থাপনের জন্য বলা হয়। কিন্তু চলতি বছরের শেষদিকে এসেও এখনো ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়নি। বাজেট উপস্থাপন ও সিন্ডিকেট সভায় সেটি অনুমোদন ছাড়াই ভিসি ইচ্ছামতো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আয়-ব্যয় করে চলেছেন।

দ্বিতীয় সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিন্ডিকেট সদস্যদের সিটিং অ্যালাউন্স পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। আর বলা হয় বাইরের জেলা থেকে আগত সদস্যরা টিএ (বিমান/ট্রেন/বাসের টিকিট) বিল দাখিল সাপেক্ষে অর্থ পাবেন। সব মিলিয়ে ১৮ জন সিন্ডিকেট সদস্য রয়েছেন রামেবির।

সিন্ডিকেট সভার একাধিক সদস্য জানান, রামেবির তৃতীয় সিন্ডিকেট সভায় বিডিএস ও নার্সিংয়ের ফি সংশোধন করার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে বলা হয়, পরের সভায় তা উপস্থাপন করে অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু চতুর্থ সিন্ডিকেট সভায় এসংক্রান্ত কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। কিন্তু বিডিএস ও নার্সিংয়ের অধিভুক্তি, অধিভুক্তি নবায়ন, পরীক্ষাসহ সব ধরনের ফি এখন পর্যন্ত ভিসির ইচ্ছামতোই আদায় করা হচ্ছে।

সিন্ডিকেটের একাজন প্রভাবশালী সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৭ সালে রামেবির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রথম সিন্ডিকেট বৈঠকের পর বারবার রাজশাহীতেই সিন্ডিকেট বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য বলা হলেও সবগুলোই হয়েছে ঢাকায়।

এদিকে আরেকজন প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, ‘দেশের বাইরে ভালোমানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্য একটি টিম গঠনের সিদ্ধান্ত হয় তৃতীয় সিন্ডিকেটে। কিন্তু পরের সিন্ডিকেটের এজেন্ডায় এসংক্রান্ত আর কোনো কিছু রাখা হয়নি। ফলে সেই টিম আদৌ গঠন হয়েছে কি না অথবা গঠন হলে কাদের নিয়ে হয়েছে—সে ব্যাপারে সিন্ডিকেট সদস্যরা অবহিত নন।’ এই সদস্য বলেন, রামেবির ভিসি যেভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করছেন, সেটি রাজশাহীর জন্য কলঙ্ক। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী রাজশাহীতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও ভিসির স্বেচ্ছাচারিতায় সেটি ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। ভিসির এমন কাণ্ডের কারণে সিন্ডিকেটের সব সদস্যই ক্ষুব্ধ। এ নিয়ে দুদকও তদন্তে নেমেছে।

এদিকে ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ চাই’ নামের একটি সংগঠন মাসুম হাবিবের অপসারণের দাবিতে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দিয়েছে। ওই মানববন্ধন সফল করতে এবং ভিসির নানা কর্মকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরে লিফলেটও বিতরণ করা হয়েছে নগরীতে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ভিসি মাসুম হাবিব বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কিছু অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যা সঠিক নয়। প্রধানমন্ত্রী যত দিন চাইবেন, আমি তত দিন ক্ষমতায় থাকব। তিনি না চাইলে সরে যাব। আমি এসব অভিযোগ নিয়ে মাথা ঘামাই না। দুদক তদন্ত করছে। আমি আমার বক্তব্য তাদের বলেছি।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেট সভায় যেসব আপত্তি আছে, সেগুলো ওভাবেই আছে। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে কোনো অনিয়ম হয়নি।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা