kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিরুলিয়ায় জলাধার ভরাটে জড়িত অর্ধশত প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিরুলিয়ায় জলাধার ভরাটে জড়িত অর্ধশত প্রতিষ্ঠান

এভাবেই ভরাট করা হয় জলাধার খাল। ভরাটের কবলে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বিচিখালী খালটিও। ছবি : কালের কণ্ঠ

জলাধার আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, রাজউকের কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে সাভারের বিরুলিয়ায় খাল, বিল, জলাশয় ভরাট অব্যাহত রয়েছে। বর্ষায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান ভরাটকাজ অব্যাহত রাখায় হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ। এতে ড্যাপের আওতায় পরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ার উদ্যোগও সংকটে পড়বে। অন্যদিকে ঢাকার জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিতে পারে। সব কিছু দেখার পরও প্রশাসন রহস্যজনক ভূমিকা নিয়েছে। রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সাভারের স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। জানা গেছে, শুরুর দিকে এখানে ভরাটকাজে ছিল প্রিয়াংকা হাউজিং ও কালচারাল একাডেমি নামের একটি চক্র। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক সাইদুর রহমান সজল সরকারের বিভিন্ন মহলের নাম ভাঙিয়ে নদী, খাল ও জলাশয় ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। গত দুই দিন সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একইভাবে জলাশয়ে মাটি ফেলছে।

ড্যাপের প্রস্তাবিত এলাকায় প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান ও নানা ব্যক্তির উদ্যোগে জলাধার ভরাটসহ ভূমির প্রকৃতি বদলে দেওয়ার মহোৎসব চলছেই। গাবতলী-আমিনবাজার থেকে বিরুলিয়া-আশুলিয়া হয়ে টঙ্গী পর্যন্ত তুরাগের উভয় তীরজুড়েই চলছে দখলবাজির সীমাহীন দৌরাত্ম্য। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এমনকি শিল্প-বাণিজ্যের নানা প্রতিষ্ঠানের জবরদখলবাজি রোধে কেউ এগিয়ে আসছে না। বিআইডাব্লিউটিএর উদ্যোগে তুরাগপারের অবৈধ দখলবিরোধী মোবাইল কোর্টের অভিযান চললেও তা থেকে বিরুলিয়া, আশুলিয়া ও টঙ্গী অংশ মুক্ত রয়েছে। তুরাগের পূর্ব পারের রূপনগর ও তুরাগ থানা এলাকায়ও মোবাইল কোর্টের অভিযান চলতে দেখছে না এলাকাবাসী।

ড্যাপের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর বন্যাপ্রবণ এলাকা, জলাশয় ও কৃষি জমিতে কোনোরকম স্থাপনা নির্মাণ; এমনকি ভূমির প্রকৃতি পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উপরন্তু ড্যাপভুক্ত এলাকায় বেদখল হওয়া ডোবা-নালা, খাল, জলাশয় পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এরই মধ্যে উন্মুক্ত জলাশয়গুলো একে একে ভরাট করা হলেও রাজউকসহ ড্যাপ-সংশ্লিষ্টরা কোনোরকম বাধা দিচ্ছেন না।

প্রভাবশালী মহলটি এবার ঢাকা শহররক্ষা বাঁধের বিপুল পরিমাণ সরকারি জায়গাও জবরদখল করে নিচ্ছে। মিরপুর বেড়িবাঁধঘেঁষা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেহাত হওয়া এ জায়গার দাম প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এক ডজনের বেশি ড্রেজার আর শত শত শ্রমিকের সাহায্যে প্রভাবশালীরা রাতারাতি একরের পর একর জায়গায় বালু ভরাট করে দখল করে নিচ্ছে। বেড়িবাঁধের ভেতরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরাট জলাশয়ের একাংশও মাটি ফেলে ভরাট করে রীতিমতো পাকা ইমারত নির্মাণ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের আড়ালে শত শত একর জলাভূমি নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে বাধাহীনভাবে।

ঢাকা শহররক্ষা বাঁধ ও বিরুলিয়ার মুক্ত জলাশয় ভরাট করেই তড়িঘড়ি সে জায়গা প্লটে রূপান্তর করা হয়েছে। টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশালকায় সাইনবোর্ড, প্রচার চলছে সহজ কিস্তিতে প্লট বিক্রির। নানা কৌশলে ক্রেতার ভিড় জমিয়েই বুকিংমানির নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। সরকারি জায়গা-জমি কেনাবেচার রমরমা এ বাণিজ্য খোলামেলাভাবে চললেও তাতে বাধা দিচ্ছে না কেউ। অবৈধভাবে বালু ভরাট, প্লট তৈরি ও বিক্রির বাণিজ্য নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ জানিয়েও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের কোনো ভূমিকা দেখতে পাচ্ছে না।

সরেজমিন বেড়িবাঁধসহ বিরুলিয়া ঘুরে সরকারি বহু মূল্যবান জায়গা ও মুক্ত জলাশয় দখলবাজি ও ভরাটের ভয়ংকর দৃশ্য লক্ষ করা গেছে। বিরুলিয়া ব্রিজ পয়েন্ট থেকে কয়েক শ ফুট উত্তরেই বেড়িবাঁধঘেঁষা তুরাগপারে এ জায়গার অবস্থান। কিছুদিন আগেও সেখানে অবৈধ বালুর গদির বাণিজ্য চলছিল। তুরাগপারের অবৈধ দখলবাজ হিসেবে চিহ্নিত করে ভ্রাম্যমাণ আদালত সেসব বালুর গদি উচ্ছেদ করে দেন। কিন্তু দখলমুক্ত সে জায়গা নিয়ন্ত্রণে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তা অরক্ষিতই পড়ে থাকে। অতিসম্প্রতি এ সুযোগটাই লুফে নিয়ে রাতারাতি বিপুল পরিমাণ জায়গা নিজেদের কবজায় নিয়ে নেয় ভূমি দখলবাজরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জবরদখলকৃত জায়গায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে দেড়, দুই, আড়াই ও তিন কাঠা মাপের তৈরি করা প্লটগুলো চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথা জানিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা চলছে।

জলাধার দখল ও ভরাট চলছেই : এদিকে ড্যাপভুক্ত তুরাগঘেঁষা বিরুলিয়ার উন্মুক্ত জলাধার দখল ও ভরাটের দৌরাত্ম্য আরো বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই জলাশয়ের নতুন নতুন জায়গায় বালু ফেলে ভরাটের পাশাপাশি ইট-সিমেন্টের প্রাচীর তুলে জবরদখল পাকাপোক্ত করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় বিরুলিয়ায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশেষ পাহারায় দখলবাজ একটি প্রতিষ্ঠানের ২০-২৫ জন শ্রমিক সরকারি বিচিখালী খালটি বালু ফেলে ভরাট করছে। এ খালটির মাধ্যমে যুগ যুগ ধরেই খেয়াঘাট, কাকাবো ও নাইরাদী গ্রামের বিল-ডোবার সমুদয় পানি নিষ্কাশন হয়ে আসছে। বিচিখালী খাল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় ওই তিন গ্রামে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছে বাসিন্দারা।

সাভারের বিরুলিয়া, খেয়াঘাট, কাকাবো, নাইরাদী গ্রামের অনেক মানুষ প্রভাবশালী মহলের দখলবাজির কারণে রাতারাতি রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে গেছে। বাপ-দাদার সহায়-সম্পদ, ফসলি জমি, সবজি বাগান, মাছের ঘের—সব কিছুতেই ভূমি দখলদারচক্রের আগ্রাসী থাবা বসেছে। এমনকি উন্মুক্ত জলাধারের ৮-১০ ফুট গভীর পানিতে নিমজ্জিত থাকা জমিও রক্ষা পাচ্ছে না। দখলবাজ বাহিনী গভীর জলাশয় ঘিরেও হাজার হাজার ট্রাক বালু ফেলে সেসব জায়গা জবরদখল করে নিচ্ছে। তারা বেহাত জমি ফিরে পেতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, দফায় দফায় ধরনা দিয়েছে সাভার থানায়ও। কিছুতেই কিছু হয়নি। ভূমি দখলদার দুর্বৃত্ত চক্রটির কবজা থেকে এক ছটাক জমিও উদ্ধার করা যায়নি।

নাইরাদী গ্রামের বাসিন্দা মাসুদুর রহমান জানান, বড় কাঁকর মৌজার শতাধিক বিঘার জলাভূমিটি মাত্র এক রাতেই বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। তবু দখলবাজি থামছেই না। জলাশয়ের বিরাট এলাকা ঘিরে ইট-সিমেন্টের প্রাচীর নির্মাণ যেমন চলছে, তেমনি জলাধার ভরাটের বিস্তৃতিও ঘটানো হচ্ছে পাল্লা দিয়েই। দখলবাজির গ্রাসে নিজের জায়গাজমি হারানো মো. হান্নান, আশরাফুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, ইয়াসিন মিয়া, বিনয় মণ্ডল, মেজবাহ উদ্দিন, শহিদুর রহমান, এলাহী, সৈয়দ আলমগীরসহ অনেকেই জানান, তাঁদের বাপ-দাদার সম্পদ মুক্ত জলাশয় দখল করে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। সেখানেই গড়ে উঠছে বড় বড় অট্টালিকা।

খাল ভরাটকারী দখলবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজন। তিনি বলেন, বিরুলিয়ার উন্মুক্ত এ জলাশয়ের কোনো অংশ কোনোকালেই ভরাট ছিল না। জলাশয়ের মধ্য দিয়ে কোনো রাস্তা নির্মাণ করার প্রশ্নই ওঠে না। ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, এখানকার অতিগুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিচিখালী খাল ভরাট ও জবরদখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যেকোনো মূল্যে শিগগিরই এ খালটি উদ্ধার করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন চেয়ারম্যান।

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা