kalerkantho

কোরবানির গরুর নিরাপদ মাংসে নজর মানুষের

হাটে গরুর রক্ত-প্রস্রাব পরীক্ষার উদ্যোগ

তৌফিক মারুফ   

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোরবানির গরুর নিরাপদ মাংসে নজর মানুষের

বৃষ্টির কারণে অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে গরু বেচাকেনা গতকালও জমে ওঠেনি। ছবিটি রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি মাঠ থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকার আলমগীর হোসেন এবার সংশয়ে পড়েছেন কোরবানির গরু কিনতে গিয়ে। এখনো তিনি গরু কেনেননি এ কারণেই। তিনি বলেন, ‘আগে তো শুধু বিষাক্ত উপায়ে গরু মোটাতাজা করার কথা শুনতাম। কিন্তু এবার যেভাবে দুধের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার কথা শুনেছি, তাতে মনের মধ্যে সন্দেহ ঢুকে গেছে—যে গরুর দুধে রাসায়নিক থাকবে সেই গরুর মাংসেও তো সেগুলো থাকার আশঙ্কা রয়েছে।’

বনানীর বাসিন্দা সহিদুল ইসলামের উদ্বেগও এই একই বিষয়ে। তিনি বলেন, ‘কোনো গরু যদি হেভি মেটাল বা ভারী ধাতুযুক্ত কোনো খাদ্য খেয়ে থাকে, তবে তো তা মাংসের মধ্যে যাবেই। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এটা তো জানা আছে। তাই ভরসা পাই কী করে! নিরাপদ মাংসের নিশ্চয়তা এখন তো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

শুধু ওই দুজনের উদ্বেগই নয়, গরুর দুধে ক্ষতিকর উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-পাল্টা পরীক্ষা, আলোচনা-পর্যালোচনা, আদালতের নির্দেশনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়ের শুরু হয়েছিল চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন প্রকাশের পর।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সূত্র থেকে জানা যায়, গত ১০ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শুধু গরুর দুধই নয়, গরুর খাবারেও মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বেশ কিছু রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ওই গবেষণায় গরুর খাবারের ৩০টি নমুনার মধ্যে ৬৯ থেকে ১০০ শতাংশে কোনো না কোনো রাসায়নিকের উপস্থিতি মিলেছে। কোনো কোনোটিতে একই সঙ্গে কয়েক ধরনের রাসায়নিক পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি নমুনায় কীটনাশক, ১৬টিতে ক্রোমিয়াম, ২২টিতে টেট্রাসাইক্লিন, ২৬টিতে এনরোফ্লোক্সাসিন, ৩০টির সব কটিতেই সিপ্রোসিন এবং চারটিতে আফলাটক্সিন পাওয়া গেছে। গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মহানগরী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা জেলার ছয়টি উপজেলার ১৮টি এলাকা থেকে মোট ১৯০টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা ও গবেষণার পর ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, গরুর দুধ ও গোখাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে খামার থেকে। দইয়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান ও আশপাশের উপজেলার বাজার থেকে। আর বাজারে প্রচলিত সব ব্র্যান্ডের স্থানীয় ও আমদানি করা প্যাকেটজাত দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে, যা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গবেষণাগারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম মানা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গোখাদ্যে নানা ধরনের ক্ষতিকর হেভিমেটাল পেয়েছি, দুধেও পেয়েছি। এ ছাড়া বরাবর বিভিন্ন হরমোন ও স্টেরয়েড ব্যবহারের অভিযোগ অনেক আগে থেকেই রয়েছে। তাই মাংসে এর উপস্থিতি আছে কি না, সেটা জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্যই ভালোভাবে পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ যেকোনো খাদ্য মানুষের জন্য নিরাপদ থাকতে ও রাখতে হবে।’

ফলে ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই দুধের পাশাপাশি গরুর মাংস কতটা নিরাপদ, তা নিয়েও সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যেও সংশয় তৈরি হয়। এমনকি নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরাও এমন প্রশ্নের মুখে পড়েন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আসন্ন কোরবানিতে একসঙ্গে ব্যাপকসংখ্যক গরুর বা অন্য গবাদি পশুর মাংস খাওয়ার প্রশ্নে নিরাপদ মাংসের বিষয়টি আবারও সামনে চলে এসেছে। এর আগে কোরবানির সময়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অসৎ উপায়ে গরু মোটাতাজা করার বিষয়টি সামনে আসে। এবার এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গরুর খাবারে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, ভারী ধাতু ও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতির বিষয়টি।

এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মাহবুব কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে নিজেরা সরাসরি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যেতে পারছি না জনবলের অভাবে। তবে আমরা প্রাণিসম্পদ বিভাগকে নিরাপদ গবাদি পশু নিশ্চিতকরণে পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়েছি। এমনকি আজও (গতকাল) সবাইকে নিয়ে এসব বিষয়ে বৈঠক করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ এবার গরুর হাটে গরুর রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখছে।’

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাভাবিক হিসেবে কোনো গবাদি পশুর খাদ্যে যদি কোনো হেভিমেটাল থাকে, সেটা ওই পশুর শরীরে ঢুকে মাংসে থাকতেই পারে। তবে কথা হচ্ছে এর মাত্রা নিয়ে। কোন মাত্রায় ওই হেভিমেটাল বা অ্যান্টিবায়োটিক থাকে, সেটাই বিবেচনায় নিতে হবে। এসব উপাদানের উপস্থিতি যদি সহনীয় মাত্রায় থেকে থাকে, তবে সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই। তবে যেহেতু প্রতিবারই কোরবানির সময় গরু মোটাতাজা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেশি দেখা যায়, তাই এ ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করাও আমাদের দায়িত্ব; যাতে মানুষ কোরবানির পশু কেনার আগে ভালোভাবে দেখে তারপর যেই পশু নিরাপদ, সেটা কেনে।’

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস অনুষদের ফিজিওলজি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রকিবুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো গরু যদি হেভিমেটালযুক্ত কোনো খাদ্য খায়, তবে সেটা ওই গরুর শরীরে থেকে যাবে। আর সেই গরুর মাংস মানুষ খেলে তা আবার মানুষের শরীরে ঢুকবেই। এ ক্ষেত্রে ওই হেভিমেটালের প্রভাবে গরু এবং মানুষের উভয়েরই লিভার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

এ ছাড়া গরু মোটাতাজাকরণ প্রসঙ্গে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ডোজ অমান্য করে অতিরিক্ত স্টেরয়েড ব্যবহারের মাধ্যমে গরু দ্রুত মোটাতাজা করতে গিয়ে গরুর লিভার, কিডনি ও হার্টের মারাত্মক ক্ষতি হয়। শরীর ফুলে গিয়ে মাংসের কোষের ফাঁকে ফাঁকে বিষাক্ত উপাদান জমে। পরে মাংসের মাধ্যমে ওই স্টেরয়েড মানুষের শরীরে ঢুকে যায়। তাই নিরাপদ মাংস নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই খামারিদের সচেতনতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেই সঙ্গে যথাযথ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’

মন্তব্য