kalerkantho

পশুবাহী গাড়িতে পথে পথে চাঁদাবাজি

রেজোয়ান বিশ্বাস ও শওকত আলী   

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পশুবাহী গাড়িতে পথে পথে চাঁদাবাজি

“দুই ট্রাকে ৪৭টি গরু নিয়ে নওগাঁ থেকে ঢাকায় আসার পথে তিন জায়গায় ট্রাক থামিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের লোক পরিচয়ে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। কিসের চাঁদা জানতে চাইলে তারা বলে, ‘কৈফিয়ত দিতে পারব না। আমরা প্রতিবছরই চাঁদা নিই।’ অনেক তর্কাতর্কির পর এক হাজার টাকা করে চাঁদা দিয়ে রক্ষা পাই। তয় চাঁদাবাজরা শ্রমিক ইউনিয়নের লোক বলে পরিচয় দিলেও তারা পুলিশের লোক ছিল বলে মনে হয়।”

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার আফতাবনগর পশুর হাটে গতকাল সোমবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে আলাপকালে গরু ব্যবসায়ী মো. বাহার অভিযোগের সুরে কথাগুলো বলেন। এ সময় এই হাটে গরু নিয়ে আসা নওগাঁ ছাড়াও কুষ্টিয়া, পাবনা ও আলমডাঙ্গার আরো বেশ কয়েকজন গরু ব্যবসায়ী পথে পথে চাঁদাবাজির ঘটনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাঁরা জানান, নানা ঝক্কি ঠেলে ঢাকায় পশুর হাটে এসে তাঁরা ডেঙ্গু আতঙ্কে পড়েছেন। হাটে মশার উপদ্রব সব বছরই থাকে। তবে এবার মশার উত্পাত মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পথে পথে চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নওগাঁর পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোরবানির পশুবাহী ট্রাকে যাতে কেউ চাঁদাবাজি করতে না পারে সে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখান থেকে যারা ঢাকায় গরু নিয়ে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে আগে থেকেই বৈঠক করে চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই আইনগত সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এর পরও গরুবাহী গাড়িকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রাজধানীতে গাবতলীর বাইরে এবার ২৪টি স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় ১০টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষ থেকে ১৪টি হাট বসানো হয়েছে।

গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েকটি পশুর হাট সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, হাটে একের পর এক গরুবাহী ট্রাক ঢুকছে। তবে অনেক ব্যাপারী ইতিমধ্যে গরু নিয়ে ঢাকায় এলেও গতকাল পর্যন্ত হাটগুলোতে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

হাটগুলোতে ইজারাদারদের পক্ষ থেকে শুধু বাঁশের কয়েকটি করে খুঁটি পুঁতে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে তাঁবু টাঙিয়ে নিচ্ছেন। ব্যাপারীরা নিজেরাই রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা করছেন। অজ্ঞান পার্টির আতঙ্কে তাঁরা হাটের খাবার খেতে নারাজ। আতঙ্ক আছে জাল টাকা নিয়েও। এ ছাড়া হাটে যাঁরা গরু নিয়ে আসছেন তাঁদের খাবার পানি ও টয়লেটের জায়গারও অপর্যাপ্ততা রয়েছে।

আফতাবনগর হাটে নওগাঁর এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘পথে চাঁদাবাজির শিকার হয়েছি। তবে হাটে এসে মশার যন্ত্রণায় টিকতে পারছি না। হাট কর্তৃপক্ষ এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সামনে আরো বড় বিপদ হয় কি না তা নিয়ে আতঙ্কে আছি। পাশেই বাঁশ-খুঁটি আর পলিথিনের ঘর বানিয়ে অবস্থান নেওয়া ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম ও আফজাল বলেন, ‘কুষ্টিয়া থেকে দুই ট্রাকে মোট ৩২টি গরু এনেছি। পথে দু-একটি জায়গায় চাঁদা দিতে হয়েছে। আর এখানে মশার যন্ত্রণায় আমরা আতঙ্কিত।’

পাবনা থেকে আসা ব্যাপারী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তাহীনতা আর চাঁদাবাজদের খুশি করে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ২৫ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া দিয়ে ঢাকায় গরু এনে আরেক ঝামেলায় পড়েছি। হাটে অনেক মশা। কিন্তু দুই দিনে এখানে মশার কোনো ওষুধ দিতে দেখি নাই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য আনিছ কালের কণ্ঠকে জানান, মশার ওষুধ ছিটানো হয়। তবে ঠিক কখন ছিটানো হয়েছে সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

ঝিনাইদহ থেকে ১৫টি গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছেন বাহার। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ২০ বছর ধরেই কোরবানির ঈদের আগে ঢাকায় গরু নিয়ে আসি। বরাবরই পথে চাঁদাবাজদের পাশাপাশি পুলিশও ঝামেলা করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।’

নতুন বাজার ১০০ ফিট সাঈদ নগর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার পাশেই গরু বেঁধেছেন ব্যাপারীরা। তাঁদের একজন শফিউল ইসলাম বলেন, ‘কুষ্টিয়া থেকে দুই দিন আগে ২৬টি গরু নিয়ে এসেছি। জায়গা খালি পেয়ে সেখানেই গরু রাখি। কিন্তু কমিটির লোকজন এসে এখান থেকে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে চলে যেতে বলেছিল। তর্কাতর্কি করে এখানেই আছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি : এদিকে গরুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল ধানমণ্ডিতে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোরবানির পশুবাহী গাড়িতে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না। পশুবাহী প্রতিটি গাড়িতে স্টিকার লাগানো থাকবে। এক হাটের গরু অন্য হাটে নিলে বা কেউ জোর করে হাটে গরু নামালে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

মন্তব্য