kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

বাসচাপায় আবরার হত্যা

ফের সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় শিক্ষার্থীরা

ইলিয়াস কাঞ্চনের সংহতি প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফের সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় শিক্ষার্থীরা

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফটকের উল্টোদিকে প্রগতি সরণিতে জেব্রা ক্রসিংয়ে বাসচাপায় নিহত আবরার আহমেদ চৌধুরীর সহপাঠীরা গতকাল রবিবারও রাজপথে নেমে আসে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ওই শিক্ষার্থীরা পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ক্লাস বর্জন করে গতকাল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে প্রগতি সরণি, মিরপুর ১০ নম্বর, ১২ নম্বর, ডিওএইচএস মোড় ও কালশী মোড়ে। মানববন্ধনের পাশাপাশি গতকাল তারা প্রথমবারের মতো সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার কাজও করে।

বিইউপির শিক্ষার্থীদের গতকাল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই, পথচারী পারাপারে শৃঙ্খলা, বাসের যথাস্থানে দাঁড়ানো এবং নির্ধারিত লেন ধরে চলা নিশ্চিত করার কাজে দেখা গেছে। দুপুরে প্রগতি সরণিতে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থিত হয়ে তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও শৃঙ্খলা রক্ষার কাজের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের’ চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। ওই সময় তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি সড়কে শৃঙ্খলায় সচেতনতার কাজ করার আহ্বান জানান।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছে, ২৮ মার্চ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় থাকবে তারা। প্রতিদিনই তারা মানববন্ধনের পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধেও কাজ করবে। ২৮ মার্চের আলটিমেটাম বাস্তবায়ন না হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

গত বছরের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর টানা আট দিন সড়কে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ওই সময় তারা চালকের কাগজপত্র যাচাইসহ সড়কের শৃঙ্খলায় কাজ করে। পরে স্কাউট সদস্যদের নামানো হয় ট্রাফিক পুলিশের কাজে সহায়তা করতে।

গতকাল সকাল ৯টার দিকে বিইউপির কয়েক শ শিক্ষার্থী প্রগতি সরণি এবং মিরপুরে কয়েক স্থানে সড়কে মানববন্ধন করে। তাদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে আবরার ‘হত্যায়’ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা এবং সড়কে শৃঙ্খলা আনার দাবি তুলে ধরা হয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সড়কে বিশৃঙ্খলা দেখে রাস্তায় নেমে আসে। তারা মিরপুর ১০ নম্বরে পথচারীদের ফুট ওভারব্রিজে উঠতে বাধ্য করে। সেখানে নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামানোর পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কাজে সহায়তা করতে দেখা যায়। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ কাগজপত্র যাচাই করে সমস্যা পাওয়ায় কয়েকটি বাস আটক করে ট্রাফিক পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে তারা। একইভাবে মিরপুর ১২ নম্বর, কালশী ও ডিওএইচএস মোড়ে শিক্ষার্থীরা সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে।

প্রগতি সরণিতে বসুন্ধরা ফটকের কাছে সকাল থেকেই সড়কে শৃঙ্খলার কাজ করতে দেখা যায় বিইউপি শিক্ষার্থীদের। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তারা ওই সড়কে মানববন্ধন করে। বিইউপির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব বলেন, ‘আমরা যখন আসি ওই সময় এখানে ট্রাফিক পুলিশই ছিল না। আমরা অনেক সময় কাজ করার পর দেখি দুপুরে তারা আসছে। আমরা সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসও আটক করেছি, যা আকাশ নাম দিয়ে চলছিল।’ 

সরেজমিনে দেখা যায়, নতুনবাজার থেকে কুড়িলের দিকে প্রগতি সরণিতে তিনটি বাস আটক করে ট্রাফিক পুলিশে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো ব: ১১-৩৬০৯) চালকের লাইসেন্স ছিল না। তুরাগ পরিবহনের আরেকটি বাসের (ঢাকা মেট্রো ব: ১৪-২০০৪) ফিটনেস ছিল না। তবে হেলপার পিন্টু বলেন, ‘ফিটনেস আছে। বেশি লোক ওঠানো হইছিল। এ জন্য ছাত্ররা আটকাইছে।’

রাস্তার উল্টোদিকে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ‘আকাশ’ নাম নিয়ে চলা সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস শনাক্ত করে শিক্ষার্থীরা। পরে নর্দা এলাকায় বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব: ১২-০৭৩৮) আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসের (ঢাকা মেট্রো ব: ১৪-৭১৭৯) কোনো জানালায়ই কাচ না থাকায় বাসটি আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। একইভাবে হিমাচল, ছালছাবিল ও অছিম পরিবহনের তিনটি বাস আটকায় শিক্ষার্থীরা। তাজিম চৌধুরী ও নাজমুলসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, পথচারীরা নিয়ম মেনে সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তা পার হচ্ছিল না। বাসগুলো ঠিকমতো দাঁড়ায় না। এসব বিষয়ে তারা কাজ করেছে। সমস্যাগুলো পুলিশ কর্মকর্তাদেরও তারা দেখাচ্ছে। প্রতিদিনই তারা সড়কে থাকবে।

দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট এম সজীব বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কয়েকটি বাস আটট করেছে। এগুলোর কাগজপত্র যাচাই করে মামলা দেওয়া হবে।’

দুপুর ২টার দিকে নর্দা এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা এভাবে আন্দোলন না করলে হয়তো কিছুই হতো না। এখন কিছু কাজ হচ্ছে। হয়তো দৃশ্যমান কম। আমি তোমাদের বলব, নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করো। আমি কখনো কাউকে সুযোগ দেই না যে বলবে, এই লোকটা আন্দোলন করে, নিজেই নিয়ম মানে না। তোমরাও নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করছ, তোমাদেরও যেন কেউ বলতে না পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সড়কের নিরাপত্তার বিষয়ে মাসে একবার হলেও আলোচনার ব্যবস্থা করো। সচেতনতার প্রথম কথা হলো আগে জানতে হবে। এরপর তা মানতে হবে। এই জানানোর দায়িত্ব তোমাদেরও নিতে হবে। আমার একার একটি সংগঠন দিয়ে এই জানানোর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। আমি বিশ্বাস করি, আমার এই সন্তানরা আমার সঙ্গে আছে।’

বিকেল ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে চলে যায়। তারা আজ সোমবারও সকালে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।

গত মঙ্গলবার সকালে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফটকের কাছে রাস্তায় বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র আবরারকে ‘চাপা দিয়ে হত্যা’ করে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির আন্দোলন শুরু হয়। বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ডিএমপি কমিশনারের আশ্বাসে ২৮ মার্চ পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত রাখে শিক্ষার্থীরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা