kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চারজন এখনো নিখোঁজ

এস এম আজাদ   

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চারজন এখনো নিখোঁজ

রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ৬৮ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিএনএ পরীক্ষার জন্য মর্গে নেওয়া দুই নিহতের লাশ শনাক্ত হয়নি এখনো। আর এখনো নিখোঁজ আছে চারজন। নিখোঁজ চারজন মৃত ধরে নিলে চুড়িহাট্টায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়াবে ৭৪ জন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা দুই নিহতের স্বজনদের শনাক্তের চেষ্টা করছেন।

এদিকে চকবাজারের নিখোঁজ গৃহবধূ বিবি হালিমা শিল্পীর (২৫) স্বামী জহিরুল হক সুমন জানিয়েছেন, পুলিশ তাঁর স্ত্রীর লাশ শনাক্তের খবর দিলেও হস্তান্তর করতে পারেনি। পরে পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে, শিল্পীর লাশ ভুলে নোয়াখালীতে দাফন হয়ে গেছে। ওই লাশ এনে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

পাশাপাশি রাজু (১৮) নামের আরেক নিহতের লাশ নিয়েও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী এলাকার রাজুর স্বজনরা লাশ গ্রহণ করে দাফন করেছিল। ওই তরুণের স্বজনদের ফের ঢাকায় এনে আবারও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছে সিআইডি।

দুই দফায় সিআইডি ১৬ জনের লাশ শনাক্ত করার পর নিখোঁজ হিসেবে ছিল সাতজন। এদের মধ্যে শিল্পী ছাড়াও কামরাঙ্গীর চরের রিকশাচালক শাহাবুদ্দীন (৩৩), নিহত দম্পতি নাসরিন জাহান ও সালেহ আহমেদ লিপুর একমাত্র সন্তান আফতাহী (৭) এবং সোয়ারীঘাটের রিকশাচালক হেলালের (৪৫) সন্ধান মেলেনি। নুরুল ইসলাম (৫২) নামের এক নিখোঁজ জীবিত বাড়ি ফিরেছেন। রফিক মিয়া (৩০) নামে আরেকজনের স্বজনরা পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা দিলেও এখন তাদেরই হদিস নেই।

গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি জানায়, মর্গে ৬৮টি বডি ব্যাগ (লাশ রাখার ব্যাগ) পায় সিআইডি। এর মধ্যে ৪৮টি লাশ শনাক্ত হওয়ায় সেগুলো হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০টি ব্যাগ থেকে লাশের এবং ২৩টি পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। প্রথম ধাপে ১১টি মরদেহের পরিচয় মেলে। দ্বিতীয় ধাপে আরো পাঁচটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।

বাকি চারটি লাশের নমুনার প্রসঙ্গে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) রুমানা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা বাকি চারটি লাশের নমুনার মধ্যে দুটি খণ্ডিত দেহের। এই খণ্ডিত দেহ দুটি আগেই হস্তান্তর করা হয়ে গেছে। বাকি দুটি নমুনার পরিচয় মিলছে না।’ তিনি দাবি করেন, নিখোঁজ দাবিদার পরিবার এখন আছে তিনটি। এদের ডিএনএ দুই লাশের সঙ্গে মিলছে না। কয়েকজন দাবিদার আছে যারা পরে তাদের স্বজনদের লাশ পেয়েছে।

বিভ্রান্তিতে শিল্পীর স্বামী চকবাজারের ব্যাগের দোকানদার জহিরুল হক সুমনের স্ত্রী বিবি হালিমা শিল্পী গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে হাজী বালুগেটের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ। সুমন ও শিল্পী দম্পতির দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। বিবি মরিয়ম সানিন নামে বড়টির বয়স পাঁচ এবং ছোটটির বয়স মাত্র পাঁচ মাস ২১ দিন। শিশু সানিন ডিএনএ নমুনা দিয়ে মায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। সুমন বলেন, “চকবাজার থানা থেকে আমাকে বলা হয়েছে, ‘তোমার স্ত্রীর লাশ মিলেছে। ভুলে নোয়াখালীতে দাফন হয়ে গেছে। আনা হবে।’” তিনি আরো বলেন, ‘তবে আমি লিস্টে পাচ্ছি না। বুঝতে পারছি না।’

অপেক্ষায় শাহাবুদ্দীনের পরিবার

নিখোঁজ আছেন রিকশাচালক শাহাবুদ্দীন। তাঁর পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি, পরিবারের চারজন। তাঁর স্ত্রী ছকিনা বেগম জানান, ভোলার দৌলতখান উপজেলার মধ্যজয়নগর গ্রামের শাহাবুদ্দীন কামরাঙ্গীর চরে গ্যারেজে থেকে রিকশা চালাতেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে লোহারপুল থেকে যাত্রী নিয়ে চকবাজারে যান শাহাবুদ্দীন। এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ। শাহাবুদ্দীনের বাবা হাছান আলী মাল, তিন ছেলে সাগর (১১), শান্ত (১৪) ও রাব্বি (৯) ডিএনএ নমুনা দিয়েছে।

নিশ্চিহ্ন শিশু আফতাহী?

মদিনা গ্রুপের সিনিয়র ক্যাশ এক্সিকিউটিভ নাসরিন জাহান ও তাঁর স্বামী কামরাঙ্গীর চরের ইগলু আইসক্রিমের পরিবেশক সালেহ আহমেদ লিপুর একমাত্র সন্তান আফতাহীকে খুঁজে পায়নি স্বজনরা। ঘটনাস্থলের কাছে হায়দারবক্স এলাকায়ই ছিল তাদের বাসা। ডিএনএ পরীক্ষায় গত ৬ মার্চ স্বামী-স্ত্রীর লাশ শনাক্ত হলেও শিশুটির হদিস মেলেনি।

হেলালের স্বজনের ফের নমুনা

সোয়ারীঘাটের রিকশাচালক হেলালের সন্ধান পাচ্ছে না স্বজনরা। তাঁর দুই ভাই শফিকুল ইসলাম ও কামাল ডিএনএ নমুনা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। ছোট ভাই শফিকুল কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বালিয়াটি গ্রামে। তাঁদের বাবা মৃত মোতালেব হোসেনের তিন ছেলের মধ্যে হেলাল বড়। শফিকুল বলেন, ‘কয়েক দিন আগে সিআইডির স্যারেরা আবার আইছিলেন। ডিএনএ ঠিকমতো করতে আবার নমুনা লাগব বইলা আমার মা আনোয়ারা বেগমের পরীক্ষা (নমুনা) নিছে।’ 

রাজুর লাশ নিয়ে বিভ্রান্তি

প্রথমে হস্তান্তর করা লাশের তালিকায় দুই রাজুর নাম পাওয়া গেছে। এঁদের একজন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর নাটেশ্বর ইউনিয়নের সাহেব আলীর ছেলে মাহাবুবুর রহমান রাজু (২৮)। ভাই মাসুদ রানাসহ (৩৬) কয়েকজনের সঙ্গে তিনি নিহত হন। তাঁর লাশ পরিবার নিয়ে দাফন করেছে।

আরেক রাজুর (বয়স ১৮ বছর, ব্যাগ নম্বর ৫৩) লাশ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থানার হাসনাবাদ গ্রামের রাজু হিসেবে এই লাশটি গ্রহণ করেন তাঁর চাচাতো ভাই মাসুদ। জেলা প্রশাসনের তালিকার সূত্রে বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করা হলে প্রতিবেশী মামুন সিরাজ বলেন, সিআইডি জানিয়েছে, রাজু শনাক্তে ভুল হওয়ায় তারা আরেকজনের লাশ নিয়ে গেছে। তাই ডিএনএ নমুনা দিতে রাজুর ভাই নাজিবুর রহমান ঢাকায় আছেন। রবিবার নমুনা দেবেন। মামুন সিরাজ জানান, তাঁর চাচাতো ভাই রাজু ছিলেন ওয়াহিদ ম্যানশনের কর্মী। তাঁর বাবার নাম মজিবুর রহমান। মায়ের নাম নাজমা বেগম।

বিভ্রান্তিটি তৈরি হয়েছে, ছেলে রাজু নিখোঁজ দাবি করে ফাতেমা বেগম নামে একজন ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন। নাগেশ্বরীর রাজু হিসেবে যাঁর লাশ দাফন করা হয়েছে তাঁর মায়ের নাম নাজমা বেগম,  ফাতেমা বেগম নয়। তাই ফাতেমা বেগমের সন্তান রাজুর লাশ কোথায়, সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বাড়ি ফিরেছেন নিখোঁজ নূরুল

বাবা নিখোঁজ আছেন বলে নূরুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ ডিএনএ নমুনা দেন। যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, তাঁদের বাড়ি ভোলা জেলার চরফ্যাশনের শশীভূষণে। তাঁর বাবা বিশ্ব ইজতেমায় যান। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁর হদিস মিলছিল না। সঙ্গে যাওয়া ব্যক্তিরা বলেন, ২০ ফেব্রুয়ারি নূরুলের চকবাজার যাওয়ার কথা ছিল। বাবাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে মোহাম্মদ ডিএনএ নমুনা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। গত সপ্তাহে নূরুল ইসলাম বাড়িতে ফোন করে জানান, তিনি তাবলিগে আছেন। এরপর তিনি বাড়ি ফিরেছেন।

এদিকে ছেলে রফিক মিয়া নিখোঁজ দাবি করে সিআইডিতে নমুনা দিয়েছিলেন আলতাফ মিয়া নামের এক বাবা। রফিক মিয়া নামের কারো লাশ পাওয়া যায়নি। আবার বাবা দাবি করা আলতাফ মিয়া আর যোগাযোগ করছেন না।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা