kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পদ্মা যেন শুধু বর্ষায়ই নদী

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পদ্মা যেন শুধু বর্ষায়ই নদী

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা এখন শুকিয়ে কাঠ। ছবি : কালের কণ্ঠ

বর্ষা এলেই শুধু পদ্মা যেন তার রূপ ফিরে পায়। বর্ষা শেষ তো পদ্মা মৃতপ্রায় এক নদীর নাম। অন্য মৌসুমে রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকা থেকে পদ্মার দিকে তাকালে কখনো কখনো মনেই হয় না যে সামনে কোনো নদী আছে। ফসলে ফসলে ভরে যায় পদ্মার বুক। আবার কোথাও কোথাও ধু ধু বালুচর।

তবে রাজশাহীর পদ্মাচরের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের বেশির ভাগই স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। যুগ যুগ ধরে পদ্মার চরে ফসল ফলানোর কাজে যারা ব্যস্ত থাকে, তাদের বেশির ভাগই এখন কোণঠাসা। তারা আবার কেউ জমি বর্গা নিয়েও ফসল ফলাচ্ছে।  

গত ৩ ফেব্রুয়ারি রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজশাহীর পদ্মা গার্ডেনের নিচ থেকে শুরু করে পশ্চিমে একেবারে শ্রীরামপুর এলাকা পর্যন্ত শত শত হেক্টর চর জেগে আছে। মাঝখানে একটি নালার মতো সরু এলাকায় পানি জমে আছে। তবে কোনো প্রবাহ নেই। আর নালার দুই পাশজুড়েই ফসলের সমারোহ। পদ্মা গার্ডেন থেকে পূর্ব দিকে সামান্য পানি পার হলেই শুধু বালু আর বালু। এখন কিছু জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে ধান চাষের জন্য।

সাইফুল ইসলাম নামে চরের এক ব্যক্তি বলেন, ‘পদ্মা আর পদ্মা নেই। এখন শুধু বর্ষা মৌসুমেই পদ্মার জৌলুস। এই পদ্মা তার যৌবন হারিয়ে ফেলেছে। বর্ষার সময় মাত্র তিন থেকে চার মাস পদ্মায় পানি দেখা যায়। আর ভরা পদ্মা থাকে আরো কম সময়; এক-দেড় মাস। এরপর দ্রুত পানি নামতে থাকে। তিন-চার মাসের মধ্যে পদ্মা একটি মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়।’

স্থানীয় কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, এখন পদ্মায় আর বেশি সময় পানিই থাকে না। গত কয়েক বছরের চেয়ে বেশি জমিতে পলি

পড়ে চরের সৃষ্টি হয়েছে। এসব পলিমাটিতে ফসল চাষ হচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগ জমি চলে গেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। পদ্মাপারের এসব স্থানীয় প্রভাবশালী বাসিন্দার কেউ বাপ-দাদার পৈতৃক সম্পত্তি আবার কেউ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লিজ নিয়ে এবং কেউ শাহ মখদুম দরগা থেকে লিজ নিয়ে জমিগুলো দখল করেছে। তবে বেশির ভাগেরই কোনো কাগজপত্র নেই। প্রভাবশালী হওয়ার কারণে এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তারা এসব জমি দখল করে ফসল ফলাচ্ছে। কেউ আবার বর্গা দিচ্ছে। যারা ফসল ফলাচ্ছে তারাও দিনমজুর ডেকে নিয়ে জমিতে কাজ করাচ্ছে। আর নিজেরা তদারকি করছে। কিন্তু আদৌ যারা এই পদ্মার বুকে একসময় ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত তারা হচ্ছে বঞ্চিত। 

নগরীর শ্রীরামপুর এলাকার বাসিন্দা ও ধান চাষি নবীর উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এই চরে দীর্ঘদিন ধরেই ধান চাষ করছি। প্রতিবারই এক জমিতে ধান চাষ করতে পারি না। দুই-চার বছর একই জমিতে ধান চাষ করা গেলেও পরের বছর দেখা যায় ওই জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। আবার অন্য কোথাও চর জেগেছ। ওই চরে ধান চাষ করতে গেলে তখন প্রভাবশালীরা নিজেদের জমি দাবি করে। বাধ্য হয়ে তাদের নিকট থেকেই বর্গা বা লিজ নিয়ে ধান চাষ করি।’

পানি গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘ভারতের আগ্রাসী পানি নীতি গত সাড়ে চার দশকে পদ্মা ও তার শাখা-প্রশাখাগুলোর দফারফা করে ছেড়েছে। একসময়ের অন্যতম নদী হিসেবে পরিচিত পদ্মা এখন বিশাল বালুচরের নিচে চাপা পড়ে হাহাকার করছে। এর শাখা-প্রশাখা নদী বড়াল, মরা বড়াল, নারদ, হোজা, বারনই, মুছাখান, ইছামতী, ধলাই, হুড়াসাগর, চিকনাই, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতা কালিকুমার, হরিহর, কালিগঙ্গা, কাজল, হিসনা, সাগরখালী, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলাবত—এগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা