kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভাবার আছে দেখার আছে

কবির হুমায়ূন

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাবার আছে দেখার আছে

সম্পর্কটা মেলার এক মাসের নয়, বছরজুড়ে বই আমার প্রিয় সঙ্গী। এই একটি মাত্র বস্তুতে এখনো ক্লান্তি জন্মায়নি। বিরতিহীন সঙ্গ নিয়ে যাচ্ছি। সপ্তাহের ছুটির দিনে এখনো প্রিয় গন্তব্য বইয়ের দোকান। বিশ্বজুড়ে গ্রন্থমেলা বলতে যা বোঝায়, তার সঙ্গে বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে গ্রন্থমেলার মিল নেই। মাসজুড়ে বিশ্বের আর কোথাও গ্রন্থমেলার আয়োজনও হয় না। কিংবা পাঠক-প্রকাশক-লেখকের এ রকম সম্মিলনও হয় না। বাংলা একাডেমির একুশে গ্রন্থমেলার মূল শক্তিটা ভাষা আন্দোলনের। বাঙালির সংগ্রামী চেতনা এর সঙ্গে যুক্ত; বিশ্বের অন্য গ্রন্থমেলাগুলোর মতো শুধু বাণিজ্যের নয়।

এই গ্রন্থমেলা আয়োজনের যথেষ্ট বছর কেটে গেছে। বহু দেন-দরবারের পর মূল গ্রন্থমেলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তর হয়েছে। তার পরও এখনো লেজ রয়ে গেছে সেই বাংলা একাডেমি চত্বরেই। একটি মেলায় গিয়ে দুই প্রান্তে ঢু মারা বিরক্তির। দুবার নিরাপত্তারক্ষীর দেহ তল্লাশির ঝক্কি বিব্রতকর। কিছু এনজিও ও লিটলম্যাগ কর্নার কোন যুক্তিতে এখনো বাংলা একাডেমি চত্বরে, বোধগম্য নয়। এবার দেখা গেল, পুথিঘর প্রকাশনীর স্টলটিও বাংলা একাডেমি চত্বরে। কেন?

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিসর যথেষ্ট। বাংলা একাডেমির প্রতিদিনের সেমিনারের বাইরে গ্রন্থবিষয়ক সব প্রতিষ্ঠানের স্টল কিংবা প্যাভিলিয়ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হওয়াই শ্রেয়। বাংলা একাডেমির বহেরাতলায় এবার যে সংখ্যক লিটলম্যাগের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা বিস্ময়ের। সবচেয়ে খারাপ লাগল এর ব্যবস্থাপনা দেখে। আবার দেখা যায়, কোনো কোনো লিটলম্যাগের নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থাও রয়েছে। একই নামে এরা মেলার উভয় প্রান্তে স্টল বরাদ্দ পাচ্ছে। লিটলম্যাগের চেতনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, রয়েছে বাণিজ্যিক সম্পর্ক।

প্রকাশনা সংস্থার ক্ষেত্রেও নৈরাজ্য রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক প্রকাশনা সংস্থা গ্রন্থমেলায় অংশ নিচ্ছে, বছরজুড়ে এদের সামান্যতম তৎপরতাও চোখে পড়ে না। অনেকের অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই। কিন্তু এরাও মেলায় স্টল বরাদ্দ পেয়ে যাচ্ছে। মেলা শুরুর পর যথেষ্ট বছর তো কাটল। ধীরে ধীরে এবার মেলাটাকে গোছানো প্রয়োজন।

গ্রন্থমেলায় শুধু বই কিনতে যায় না মানুষ, দেখতেও যায়। সময় কাটাতে যায়। আড্ডার লোভে যায়। বহুকাল দেখা হয় না এমন বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রত্যাশায় যায়। আর সময়টা যেহেতু দীর্ঘ এক মাসের, মেলার ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন আরো যত্নবান হওয়া। মেলা প্রাঙ্গণে পথে যেভাবে ইট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা ঝুঁকিপূর্ণ। অনেককেই হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি হোঁচট খেতে হচ্ছে বয়স্কদের। প্রথম সপ্তাহে ধুলার যে সন্ত্রাস থাকে মেলাজুড়ে, ব্যবস্থাপনায় যত্নবান হলে তা থাকার কথা নয়। গুটিকয় প্যাভিলিয়ন ও স্টলের বাইরে বেশির ভাগেরই সাজসজ্জা বারোয়ারি। সামান্যতম রুচির বালাই নেই। এই বিষয়গুলোও ভাবার, দেখার আছে।

দুই.

যত পুরনোই হোক, যে বইটি আগে পড়া হয়নি, সেই বইটি হাতে আসা মানেই আমার কাছে নতুন বই। এক মাস মেলার প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। এই সংখ্যা বিস্ময়ের। প্রচ্ছদে, কাগজে, ছাপায়, বাঁধাইয়ে বাংলাদেশে প্রকাশিত বই বেশ ভালো একটি মানে পৌঁছেছে। এবার বিবেচনায় নেওয়া জরুরি লেখার মান। মেলায় যে সংখ্যক বই প্রকাশিত হচ্ছে মেলার পর এসব বইয়ের ৯৮ শতাংশের খোঁজ মেলে না আর। বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে, বই প্রকাশ এখন আর দশটা শখের মতো। মেলায় প্রকাশিত বেশির ভাগ বই শখের লেখকের। ফলে রীতিমতো বিড়ম্বনায় পড়তে হয় পেশাদার লেখকদের। এই বিষয়গুলোও ভাবার আছে। শত ফুল ফুটতে দিতে বাধা নেই। তবে বাড়াবাড়ি সব অর্থেই খারাপ। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত বিপুলসংখ্যক অপেশাদার লেখকের বই প্রকাশ হয় বলে আমার জানা নেই। এত বিপুলসংখ্যক অপেশাদার প্রকাশকও বোধ হয় নেই।

গ্রন্থমেলা সব অর্থে সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠলে লাভ সবার। গ্রন্থমেলার সঙ্গে জড়িত অনেকের জীবন-জীবিকাও। আবেগের সঙ্গে এবার এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ ভাববে, দেখবে—এই আশা করতেই পারি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা