kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

কওমির দাওরায়ে হাদিস মাস্টার্স মর্যাদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কওমির দাওরায়ে হাদিস মাস্টার্স মর্যাদায়

কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি দেওয়ার বিধান রেখে ‘কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান আইন, ২০১৮’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তাঁর তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় মন্ত্রিসভার বৈঠক। পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

এর আগে গত বছরের এপ্রিল মাসে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দেয় সরকার। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, গত বছরের ১৩ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে সে অনুযায়ী সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী হয়েছে বলে গণ্য করা হবে।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী বিদ্যমান ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ডের সমন্বয়ে একটি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থাকবে। ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ নামের কমিটিই এই বোর্ড হিসেবে কাজ করবে। এর কার্যালয় হবে ঢাকায়। কমিটির চেয়ারম্যান হবেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি। এ কমিটি সনদবিষয়ক সব কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলে বিবেচিত হবে। কমিটির নিবন্ধিত মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের সনদ মাস্টার্সের সমমান বলে বিবেচিত হবে। দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষাও হবে এই কমিটির অধীনে। দাওরায়ে হাদিসের সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল, সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক সব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক উপকমিটি গঠন করতে পারবে ওই কমিটি। এসব বিষয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে ওই কমিটি। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, এ কমিটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে।

মন্ত্রিপরিষদসচিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে একটি কমিটি করা হয়। তারা কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের মতো কাজ করবে। সেটাকে অনেকটা এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। এটি ১০টি ধারার একটি আইন।’

খসড়া আইনে বিভিন্ন বিষয়ে সংজ্ঞা দেওয়া আছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘কওমির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ মূলনীতি ও মত-পথের অনুসরণে মুসলিম জনসাধারণের আর্থিক সহায়তায় ওলামায়ে-কেরামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ইলমে ওহির শিক্ষাকেন্দ্র।’

কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার ডিগ্রি সমমান দেয়ার বিষয়টি আগেই হয়ে আসছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘এখন সেটাকে আইনের কাঠামোতে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে একটি বোর্ডের বিষয় রয়েছে। এটির নাম হচ্ছে—আল-হাইয়্যাতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।’

শফিউল আলম বলেন, ‘এখন ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড আছে ওনাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। একেক এলাকায় একেকটি। বেফাকুল মাদারিসিলি আরাবিয়া বাংলাদেশ, বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিসিল বাংলাদেশ, আজাদ দ্বিনি এদারায়ে তা’লিম বাংলাদেশ, তানজিমুল মাদারিস দ্বিনিয়া বাংলাদেশ ও জাতীয় দ্বিনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ। বাংলাদেশে যত কওমি মাদরাসা আছে, সেগুলোকে এই ছয়টি বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করে। এই ছয়টি বোর্ড নিয়ে আল-হাইয়্যাতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ গঠন করা হবে। এটিই হবে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড।’

আল-হাইয়্যাতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর কমিটিতে ৯ ধরনের ব্যক্তি থাকবেন জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘বেফাকুল মাদারিসিলি আরাবিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হবেন কমিটির সভাপতি। কো-চেয়ারম্যান হবেন বেফাকুল মাদারিসিলের সিনিয়র সহসভাপতি। বেফাকের আরো পাঁচজন সদস্য, এটা পদাধিকারবলে বেফাকের মহাসচিব বা বোর্ড নির্ধারণ করে দেবে।’

এ ছাড়া কমিটিতে বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গার দুজন সদস্য, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিসিল কওমিয়ার দুজন সদস্য, আযাদ দ্বিনি এদারায়ে তা’লিমের দুজন সদস্য, তানজিমুল মাদারিসিল কওমিয়ার দুজন সদস্য, জাতীয় দ্বিনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশের দুজন সদস্য কমিটিতে থাকবেন। চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলে কমিটিতে যেকোনো সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন। তবে সেই সংখ্যা ১৫ জনের বেশি হবে না বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব।

এরই মধ্যে যত সনদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো এই আইন অনুযায়ী হয়েছে গণ্য করা হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। শফিউল আলম বলেন, ‘আল-হাইয়্যাতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর অধীন বোর্ডগুলো আইন অনুযায়ী গঠিত কমিটির মাধ্যমে নিবন্ধন, কওমি মাদরাসাগুলো দারুল উলুম দেওবন্দের নীতি, আদর্শ ও নেসাব বা পাঠ্যসূচি অনুযায়ী দাওরায়ে হাদিস শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।’

খসড়া আইনে কমিটির কার্যক্রম ও কার্যকাল সম্পর্কে বলা হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, ‘এই কমিটি সনদ বিষয়ে যাবতীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলে বিবেচিত হবে। এই কমিটির মাধ্যমে নিবন্ধিত মাদরাসাগুলো দাওরায়ে হাদিসের সনদ মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান বিবেচিত হবে। দাওরায়ে হাদিসের সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল ও সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক উপকমিটি গঠন করতে পারবে। কমিটি এ বিষয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানাবে।’ এই কমিটির এক-তৃতীয়াংশ বা ১১ জনের উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হবে। কমিটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে বলেও খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণে বিধি ও সংবিধি প্রণয়ন করা যাবে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব। কমিটিতে সরকারের কোনো প্রতিনিধি নেই—এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে কমিটি যেটা ছিল সেটাকে বোর্ড আকারে নিয়ে আসা হয়েছে। ছয়টি বোর্ডকে একীভূত করে বোর্ড করা হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েশন ছাড়া মাস্টার ডিগ্রি কিভাবে দেওয়া হবে—এই প্রশ্নের জবাবে শফিউল আলম বলেন, ‘এটি একটি ব্যতিক্রমী বিষয়। এটি হলো মূলত কওমি মাদরাসায় পড়ালেখা করা প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীকে মূলধারায় নিয়ে আসা। সরকারের এই কাঠামোতে নিয়ে আসার বিষয়টি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।’

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সনদ দেওয়ার দায়িত্ব তাদের দেওয়া যেত—এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘আইনে এ বিষয়ে কিছু বলা নেই, ভবিষ্যতে হয়তো বিবেচনায় আসতে পারে।’ মাস্টার্সের আগের ডিগ্রিগুলোর স্বীকৃতি না দিয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে কেন স্বীকৃতি দেওয়া হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা গভর্নমেন্টের পলিসি, আইনের বাইরে আমাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। ওখানে দাওরায়ে হাদিসটাকে চূড়ান্ত শিক্ষা সমাপনী হিসেবে গণ্য করা হয়।’

গতকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৮’-এর খসড়াও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।

মন্তব্য