kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আওয়ামী লীগ নির্ভার বিএনপিতে লড়াই

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১ জুন, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আওয়ামী লীগ নির্ভার বিএনপিতে লড়াই

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়া উপজেলায় বর্তমান সরকারের আমলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়েছে। চাকরি পেয়েছে এলাকার ৯০০-এর মতো লোক। দুই উপজেলাতেই শতভাগ বিদ্যুতায়নসহ আরো কিছু ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। আর এ সবই হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের হাত ধরে। নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত আর সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সজ্জন এই নেতার ভাবমূর্তিকে আরো উজ্জ্বল করেছে। এসব কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তাঁর ওপর ভরসা করছে আওয়ামী লীগ। নেতাকর্মীরাও বলছে, আনিসুল হক বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।

অন্যদিকে প্রার্থী নিয়ে বিএনপিতে চলছে প্রবীণ ও নবীনের লড়াই। সাবেক সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের পাশাপাশি নবীন প্রার্থী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা নাছির উদ্দিন হাজারী মনোনয়নপ্রত্যাশী।

জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা আখাউড়া ও কসবাতে খুব একটা ভালো নয়। দলটির কেন্দ্রীয় নেতা তারেক এ আদেল এ আসন থেকে প্রার্থী হতে পারেন।

আওয়ামী লীগ : এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আইনজীবী আনিসুল হক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট মরহুম সিরাজুল হক ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনিসুল হক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবারের মতো এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আইনমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পান। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই আনিসুল হক তাঁর নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দেন। দুই উপজেলাতেই দল গোছানোর দায়িত্ব নেন। নেতাকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কসবা উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো তৃণমূল পর্যায়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সুসংগঠিত। আনিসুল হকের প্রচেষ্টায় দীর্ঘ সময় পর দলীয় কার্যালয় পায় আখাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ। সাবেক সংসদ সদস্য শাহ আলম দলে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি রেখে যান তা থেকে উত্তরণ ঘটান আনিসুল হক।

দলের নেতাকর্মীরা জানায়, আনিসুল হকের আমলে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো নতুন করে করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দুই উপজেলার অন্তত ৯০ শতাংশ রাস্তার কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইনমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় দুই উপজেলাতে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে। আনিসুল হকের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছে প্রায় ৯০০ জন লোক। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, চাকরি নিতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছে—এমন অভিযোগ নেই। বরং চাকরির জন্য ঘুষ সেধে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। মামলা হয়েছে একাধিক।

কসবা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. মনির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন খান রিমন বলেন, কসবা-আখাউড়া আওয়ামী লীগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিকল্প কেউ নেই। তাঁর মতো মানুষকে সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া কোনো এলাকার মানুষের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে করেন তাঁরা। আগামী নির্বাচনেও আনিসুল হক বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।

আইনমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব ও কসবা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদুল কাওছার ভূঁইয়া জীবন বলেন, ‘কসবা-আখাউড়াতে আনিসুল হক যে উন্নয়ন করেছেন, তা অতীতে হয়নি। তিনি সারাক্ষণ শুধু এলাকার উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন। রাষ্ট্রীয় শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সুখে-দুঃখে এলাকার মানুষের পাশে থাকেন। এলাকার মানুষকে তিনি যথেষ্ট সময় দেন।’ 

আখাউড়া পৌরসভার মেয়র তাকজিল খলিফা কাজল বলেন, ‘আমাদের ভাগ্য ভালো যে আনিসুল হকের মতো একজন মানুষকে সংসদ সদস্য হিসেবে পেয়েছি। তাঁর চিন্তা-চেতনায় শুধুই এলাকার উন্নয়ন। গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হয়েও তিনি এলাকায় যে সময় দিচ্ছেন, তা ভাবা যায় না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা নির্দ্বিধায় তাঁকে চাই।’

কসবা পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মো. এমরান উদ্দিন জুয়েল বলেন, ‘কসবা-আখাউড়া আনিসুল হকের কোনো বিকল্প নেই। তিনি কসবা-আখাউড়া আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী।’

তবে সাবেক সংসদ সদস্য শাহ আলম ও কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা শ্যামল কুমার রায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতে পারেন। যদিও শাহ আলমের পক্ষে এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা নেই। এলাকায়ও তিনি আসেন না। তাঁর দু-একজন অনুসারী ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্যদিকে বিগত সংসদ নির্বাচনের পর পর শ্যামল কুমার রায় মাঠে নামলেও এখন আর তাঁকে দেখা যাচ্ছে না।

আখাউড়া উপজেলা যুবলীগের এক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, এ আসন থেকে মন্ত্রী যদি নির্বাচন না করেন কিংবা অন্য কোনো কারণে তিনি নির্বাচনে না আসেন তাহলে শ্যামল কুমার রায় এগিয়ে থাকবেন। কসবা-আখাউড়াতে তাঁর অনেক কর্মী-সমর্থক রয়েছে।

বিএনপি : এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে প্রবীণ নেতা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক সচিব মুশফিকুর রহমান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন হাজারীর মধ্যে। মুশফিকুর রহমান এই আসন থেকে ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে হেরে যান। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন—এটা এক প্রকার নিশ্চিত। দলের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে আখাউড়ার নেতাকর্মীরা তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায়।

বিভিন্ন কারণেই বিএনপিতে নির্বাচনী আবহ নেই। দলটির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও খুব একটা পালন করা হচ্ছে না। সাবেক সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের প্রতিই দলটির নেতাকর্মীদের বেশি আস্থা। কিন্তু তিনি নিয়মিত এলাকায় আসেন না বলে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। প্রায় এক বছর পর ৩০ এপ্রিল মুশফিকুর রহমান আখাউড়ায় এলেও বিএনপির এক নেতার কুলখানিতে যোগ দিয়ে চলে যান। সেখানে গুটিকয় নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। কয়েক দিন দেশে থেকে তিনি আবারও কানাডা চলে গেছেন বলে জানা গেছে। নেতাকর্মীরা জানায়, তিনি মেয়ের সঙ্গে কানাডায় বসবাস করেন।

আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী নাছির উদ্দিন হাজারী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলেও দলটির সিনিয়র নেতাদের তাঁর সঙ্গে এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে কসবায় তিনি এরই মধ্যে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করতে পেরেছেন। বলা চলে ওই উপজেলায় মুশফিকুর রহমান ও নাছির উদ্দিন হাজারীকেন্দ্রিক দুই ভাগে বিভক্ত বিএনপি। আখাউড়াতেও নিজের পক্ষ ভারী করার চেষ্টা করছেন নাছির।

এদিকে বিএনপির প্রবাসী নেতা মামুনুর রশিদ মোহন ও ব্যবসায়ী শাকিল ওয়াহেদ সুমন এবারও মনোনয়ন চাইতে পারেন। তবে এলাকায় তাঁদের কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে না। কেন্দ্রীয়ভাবে তাঁরা লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

কসবা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য দলের সবাই সাবেক সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু তিনি দলের দুঃসময়ে দেশের বাইরে চলে যান। বহুদিন পর তিনি এলেও দলের কোনো বিষয়ে নির্দেশনা দেননি।’

এ বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল মুনসুর মিশন বলেন, ‘কসবা-আখাউড়ার সব নেতাকর্মীই মুশফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। কেন্দ্রীয় কর্মসূচিগুলো আমরা এখানে পুলিশের বাধার মুখে করতে পারছি না। তবে নির্বাচনকেন্দ্রিক ‘কেন্দ্র কমিটি’ করার বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। কেন্দ্র থেকে নির্দেশ পেলেই কাজ শুরু করে দেব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুশফিকুর রহমানই আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। তিনি এলাকায় কম আসেন বলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে—এ কথাটি ঠিক নয়।  কেননা সারা দেশেই তো কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা যাচ্ছে না। যে কারণে তাঁর আসা না আসা কোনো বিষয় নয়। এ ছাড়া তিনি তো নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিতই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তিনি হলেন দলের হেভিওয়েট প্রার্থী। সব ক্ষেত্রেই তাঁর একটা আলাদা মূল্যায়ন কিংবা গুরুত্ব রয়েছে।’

আখাউড়া উপজেলা বিএনপি নেতা মো. আবুল ফারুক বকুল বলেন, ‘দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে রয়েছেন নাছির উদ্দিন হাজারী। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি এলাকায় এসে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছেন। আশা করছি, দল তাঁকে মূল্যায়ন করবে।’

জাতীয় পার্টি : সাংঠনিকভাবে জাতীয় পার্টির অবস্থান নাজুক হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কসবা উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর জাতীয় পার্টির নেতা তারেক এ আদেল এ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি এই আসনে জাতীয় পার্টির একমাত্র প্রার্থী। তাঁর বাবা প্রয়াত জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ছিলেন।

এ বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক মো. নজরুল হক ধনু বলেন, ‘আমাদের সাংগঠনিক অবস্থা খুব ভালো। পুরনো কমিটিগুলো ভেঙে নতুন কমিটি করার চেষ্টা চলছে। এ আসনে তারেক আদেল আমাদের প্রার্থী। মহাজোট থেকে আসনটি জাতীয় পার্টিকে দেওয়ার জন্য দাবি জানানো হবে।’

বাংলাদেশ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন থেকে দলটির প্রার্থী হিসেবে মোসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দেওয়ার চিন্তা করছে দল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি নির্বাচন করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থায় দলটি নতুন প্রার্থী খুঁজছে।

মন্তব্য