kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

লেখকের মেলা

১০ সদর স্ট্রিট রবীন্দ্রনাথের কলকাতা

শাকুর মজিদ   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১০ সদর স্ট্রিট রবীন্দ্রনাথের কলকাতা

২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। মধ্যমগ্রামে আমাদের নাটকের প্রদর্শনী শেষে দলের ছেলেদের নিয়ে এসেছি কলকাতার সদর স্ট্রিট। মধ্য কলকাতার এই নোংরা, ঘিঞ্জি এলাকাটি নানা কারণেই আমার খুব

পছন্দের। ১৯৯০ সালে প্রথম যখন কলকাতা আসি, এই সড়কের অন্য একটি সস্তা হোটেলে থেকেছিলাম আট রাত। এর পর যখনই কলকাতা যাই, মনে হয় ওই সড়কটি আমার পাড়ার গলি। সুযোগ পেলেই সদর স্ট্রিট ঘুরে আসি।

সেবার এই সড়কের এক গলির মোড়ে মাটির ভাঁড়ে চা খেতে খেতে দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বিচ্ছিরি মূর্তি। এর নিচে লেখা—১০ সদর স্ট্রিটের বাড়িতে বসবাসকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি লিখেছিলেন। ঘটনার স্মরণে তাঁর এই আবক্ষমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। ২৫ বৈশাখ ১৪০৭। রবীন্দ্র স্মৃতিরক্ষা উদ্যাপন সমিতি।

যে বাড়িটির সামনের ফুটপাতে এটি রাখা, সে বাড়িটি একটি আবাসিক হোটেল। নিচতলায় কতগুলো ট্রাভেল এজেন্ট, মানিচেঞ্জার—এদের অফিস। ওপরে একটা ডেন্টাল ক্লিনিক, দালানের সঙ্গে দালান লাগানো। এ বাড়িতেই কি রবি ঠাকুরের ১২ বছরের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ থাকতেন কাদম্বরীকে নিয়ে? আমি চিন্তায় পড়ে যাই।

১৯৯০ সালে আমার বয়স তখন পঁচিশ, ‘কলিকাতা’র তিন শ। ঠিক তিন শ বছর আগে, ১৬৯০ সাল থেকে এখানে নগরায়ণের সূচনা হয়েছিল। আর প্রায় একই সময় বাংলাদেশের যশোর থেকে পঞ্চানন কুশারী নামের নিম্নবর্গের এক ব্রাহ্মণ কলকাতায় তাঁর ডিঙ্গি ভিড়িয়ে ঠাকুর পরিবারের সূচনা করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কমপানির সঙ্গে প্রায় পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠেছিল এই ঠাকুর পরিবার। এক সময় ইংরেজরা বিদায় নেয় ভারত থেকে, ঠাকুর পরিবারের জমিদারিরও সমাপ্তি ঘটে। ইংরেজ ও ঠাকুর জমিদারের বিদায়ের পর কলকাতা এখন তাহলে কী নিয়ে আছে?

কলকাতাকে নানা নামে ডাকতে শুনেছি। সিটি অব জয়, সিটি অব প্যালেস, সিটি অব বুকস, কত নামই বা তার ছিল! এখন কলকাতার কী আছে?

২৫ বছরের ব্যবধানে কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে প্রথম যে মানুষটির ছবি বড় করে দেয়ালে টাঙানো দেখি, তিনি রবীন্দ্রনাথ। গঙ্গার বুকে নৌকায় করে ভাসছি, শুনি পার থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রনাথের গান। শুধু কি গানই? সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য এমনকি খাবার-দাবারে রবীন্দ্রনাথ কেমন ছিলেন সেসবের খোঁজ নেওয়া শুরু করি, আর লিখতে বসি ২৫ বছর ধরে দেখা কলকাতার গল্প।

১৯৯০ সালে কলকাতা দিয়ে শুরু হয়েছিল আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। এরপর ত্রিশাধিক দেশ ঘুরেছি। একবার একটা দেশে পাঁচ-ছয় দিন থেকেও তা নিয়ে ভ্রমণ কাহিনী লিখে ফেলেছি। এ নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ১৮টা ভ্রমণগ্রন্থ আমার বেরিয়ে গেছে, কিন্তু কলকাতা নিয়ে কখনো লেখার ইচ্ছা করেনি। ২৫ বছরের কলকাতা ভ্রমণ নিয়ে লিখতে বসে দেখি কলকাতা আসলে এখন ‘সিটি অব টেগোর’। আর এই ঠাকুরের গভীর সৃজনশীল মনের ভ্রূণের সঞ্চারে ও তার বিকাশে আছে সদর স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাড়িটি। এখান থেকেই ১৭ বছরের এক ‘নির্ঝরের স্বপ্ন’ ভাঙানো ‘চারুলতা’র ‘নষ্ট নীড়’।

প্রায় আড়াই বছর লাগে এ বইটি লিখতে। প্রথমে ২০১৩ সালে ‘ঠাকুরবাড়ির উত্তরাধিকার’ শিরোনামে একটা অধ্যায় ছাপা হয় দৈনিক সমকালের ‘কালের খেয়ায়’। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ঈদ সংখ্যায় আলাদা কয়েকটি অধ্যায় ছাপা হয়। বই আকারে এটা ছাপার জন্য কয়েকজন প্রকাশক আগ্রহ দেখান, কিন্তু আমি উৎসাহী হয়ে পড়ি যখন ‘প্রথমা প্রকাশন’ এটা ছাপার জন্য নির্বাচন করে। এই প্রকাশনী থেকে এর আগেও আমার আরেকটি স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল। এদের পেশাদারি দেখে আমি মুগ্ধ। এরা সাংঘাতিক খুঁতখুঁতে। ওদের এই ভাবটি দেখে আমি মুখে বিরক্তি দেখাই, কিন্তু মনে মনে খুশি হই।

বড় প্রকাশনী বই ছাপলে মাতবরিও বেশি করে। আমার সব ভ্রমণগ্রন্থে অনেক ছবি থাকে, অনেক রঙিন পাতাও ব্যবহার করতে আমি প্রকাশককে রাজি করিয়ে ফেলি। কিন্তু এখানে এসব চলে না। তারা খালি ক্যালকুলেটর টেপে। বইয়ের দাম বেড়ে গেলে পাঠক বা ক্রেতা সরে যাবে এই আশঙ্কায় দাম কম রাখতে গিয়েও ২৭২ পৃষ্ঠার বইটির দাম রাখা হলো ৪৫০ টাকা।

বইটির প্রচ্ছদ দেখে আমি খুশি। ১০ সদর স্ট্রিটের বাড়িটা এখন যে আবাসিক হোটেল, তার নিচতলার আর্চের তলা থেকে যে ছবিটা তুলেছিলাম, সেটা দেখেই অশোক কর্মকার লাফিয়ে উঠলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচ্ছদ হয়ে যায়। কিন্তু সদর দপ্তর থেকে পাস হয়ে আসতে সময় লাগে অনেক। উকুন বাছার মতো একটা একটা করে চুল বেছে অন্তত চারজন মুরব্বির দপ্তর পার হয়ে প্রায় চার মাসের মাথায় বইটি প্রেসে গেল। বইমেলা শুরুর সাত দিন আগে নমুনা বাঁধাই কপি হাতে পেলাম। প্রকাশক ফোন করে জানতে চাইলেন, বইটি কি ঠিক আছে?

আমি একটু উল্টেপাল্টে বলি—জি, সব ঠিক আছে মতি ভাই।

—তাহলে বাইন্ডারকে বলি কাজ শুরু করুক।

আমি বলি, আল্লাহ ভরসা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা