kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

চাঁদাবাজি দখল জুয়া চলছে সমানতালে

আপেল মাহমুদ   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চাঁদাবাজি দখল জুয়া চলছে সমানতালে

আরামবাগের ক্লাবপাড়ায় একদিকে ময়লা-আবর্জনা, অন্যদিকে দখলে সড়ক পরিণত হয়েছে গলিতে। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

ডিএসসিসির (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) ৯ নম্বর ওয়ার্ডটি নানা কারণে আলোচিত। বঙ্গভবন এবং দেশের প্রথম অফিসপাড়া মতিঝিল ও দিলকুশা এ ওয়ার্ডে অবস্থিত। এ ছাড়া প্রেসপাড়া, মেসপাড়া, আদমপাড়া, ক্লাবপাড়া নামেও খ্যাতি আছে এ এলাকার। এমন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ওয়ার্ডটি গড়ে উঠলেও চাঁদাবাজি, দখল, জুয়া ও বাণিজ্যিক আগ্রাসনে এর ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। একদিকে ফকিরাপুল ও আরামবাগের প্রেসপাড়া সারা রাত জেগে থাকে, অন্যদিকে মতিঝিলের ক্লাবপাড়া জেগে থাকে জুয়া আর মাদকের নেশায়। দিলকুশা আর মতিঝিল অফিসপাড়ার খ্যাতি পেলেও সেখানকার ফুটপাত ও খালি জায়গা হকারদের দখলে। আর ফুটপাত ঘিরে সেখানে চলে চাঁদাবাজি।

প্রেসপাড়া নামে খ্যাত ফকিরাপুল-আরামবাগে রয়েছে হাজার হাজার প্রিন্টিং প্রেস, কাটিং-বাইন্ডিং কারখানা, কাগজ-কালি, কম্পিউটার ও গ্রাফিকস ডিজাইনের দোকান। সারা রাতই তাদের কাজ চলে। কয়েকজন প্রেস মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমানে নিরাপত্তার নামে তাঁদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। প্রতিটি প্রেস, কাগজ-কালির দোকান, কারখানা থেকে মাসে ৫০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাইদের লোকজন সে চাঁদাজির সঙ্গে জড়িত। এখানকার হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান থেকে এভাবে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।

৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলের সচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, 'এলাকার নিরাপত্তার জন্য রাতদিন ২৪ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ জন্য নিরাপত্তা প্রহরীদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর জন্য বিভিন্ন দোকান ও প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু টাকা নেওয়া হয়। সে টাকাটা দোকান-প্রতিষ্ঠানপ্রতি সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। তবে সেটা চাঁদাবাজি নয়।' এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানায়, বর্তমান কাউন্সিলর রাস্তা-ঘাটে ময়লা-আবর্জনা ঠিকমতো অপসারণ করলেও নিরাপত্তার নামে চাঁদা আদায়ে তাঁর সেই অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

ফকিরাপুল শুক্কর পাগলা গলির আদি বাসিন্দা হেমায়েতউদ্দিন আহমেদ জানান, স্বাধীনতার আগে ফকিরাপুল ও আরামবাগ নির্ভেজাল আবাসিক এলাকা ছিল। তবে মতিঝিল-দিলকুশার অফিসপাড়া হওয়ায় সেখানে অনেক মেস গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে সেখানে একটার পর একটা প্রিন্টিং প্রেস চালু হতে থাকে। বর্তমানে দুটি মহল্লায় কমপক্ষে পাঁচ হাজার প্রেস ও কাগজের দোকান রয়েছে। ফলে এলাকাটির আবাসিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেছে অনেক আগেই; যার কারণে এলাকার আদি বাসিন্দারা বাড়িঘর ভাড়া দিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।

মতিঝিলের উত্তর পাশে দেশের অধিকাংশ খ্যাতিমান ক্লাব রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ওয়ারী ও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে সঙ্গে সদ্য প্রতিষ্ঠিত সোনালী অতীত ক্লাব, আরামবাগ ও মেরিনার্স ক্লাব এ এলাকায়। ক্লাবগুলো দিনের বেলায় অলস সময় অতিবাহিত করে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সরব হতে থাকে। তবে সেটা ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলার জন্য নয়, জুয়া খেলার জন্য। জুয়া-মাদকের কারণে পুরো এলাকা অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। যুবলীগের চিহ্নিত এক নেতা কর্তৃক ক্লাবপাড়ার কোটি কোটি টাকার জুয়া-মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সবাই জানে, কিন্তু কেউ মুখ খুলে কিছু বলে না।

আরামবাগের বর্ষীয়ান বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আকমল হোসেন ফরাজী বলেন, 'সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার সাহস কারো নেই। তাই অনেকটা নিরুপায় হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছি। অথচ অনেক শখ করে মতিঝিলের কাছে ফ্ল্যাট কিনেছিলাম।' একই অভিযোগ করেছেন আরো কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। কিন্তু তাঁরা কেউ ভয়ে পরিচয় দিতে চাননি।

এলাকাবাসী জানায়, ফকিরাপুল ও আরামবাগে কতগুলো মেস রয়েছে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এলাকার অর্ধেক বাড়িতেই মেস ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফকিরাপুল গরম পানির গলির বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া বলেন, 'এলাকাটি মেস এবং আদম অফিসের কারণে আভিজাত্য হারিয়েছে। ফরিকাপুলে পরিবার নিয়ে বসবাস দুরূহ হয়ে উঠেছে।'

দেশের সবচেয়ে মূল্যবান এলাকা হলো মতিঝিল ও দিলকুশা। এখানকার প্রতি কাঠা জমির মূল্য পাঁচ থেকে দশ কোটি টাকা। ঠিক এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেখানকার ফুটপাত বরাদ্দ দিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজচক্র। ছোট একটি টং দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা চাঁদা নেয় এ চক্র; যে চাঁদার পরিমাণ প্রতিদিন দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা। মাসে এর পরিমাণ হয় সাড়ে তিন কোটি টাকা। সূত্র জানায়, মতিঝিল এলাকার ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আছে তিনটি দল। তারা সবাই ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কিংবা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

ফকিরাপুল নূরানীর মোড় থেকে বক্স কালভার্ট সড়ক পর্যন্ত রাস্তার দুরই পাশে শত শত ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস। স্থানীয়ভাবে এসব অফিসকে আদম অফিস বলা হয়। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ আদম অফিসের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। পাসপোর্ট ও টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আর বিদেশ না পাঠিয়ে ঘোরাতে থাকে তারা। ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির গলিতে কথা হয় ভুক্তভোগী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ফকিরাপুলের একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে এক বছর আগে দুবাই যাওয়ার জন্য তিন লাখ টাকা দিয়েছেন। এখন তাঁকে বিদেশ পাঠাচ্ছে না এবং তাঁর টাকাও ফেরত দিচ্ছে না।

৯ নম্বর ওয়ার্ডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো বক্স কালভার্ট রোড এলাকা। সেগুনবাগিচা খালের একটি অংশের ওপর এ রোডটি অবস্থিত। ১০-১২ বছর আগে এলাকার যানজট নিরসন এবং যোগাযোগব্যবস্থা সহজতর করার জন্যই খালের ওপর রোডটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে দখলের কারণে বক্স কালভার্ট রোডটি এলাকায় যানজট সৃষ্টির জন্য দায়ী। রাস্তার ওপর বিভিন্ন দোকানপাট নির্মাণ, নির্মাণসামগ্রী রাখা, যানবাহন পার্কিংসহ নানা রকম কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল কালাম অভিযোগ করে বলেন, 'কোটি কোটি টাকা খরচ করে রোডটি নির্মাণ করলেও বর্তমানে এলাকাবাসীর কোনো কাজে আসছে না। পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠান কিংবা বাড়ির মালিকরা কালভার্ট সড়ক দখল করে রেখেছেন।'

বিভিন্ন সমস্যা ও অভিযোগ নিয়ে কথা বলার জন্য ৯ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয়ে গেলে ওয়ার্ড সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, কাউন্সিলর মমিনুল হক সাইদ বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন। তিনি দেশে ফিরতে আরো বেশ কয়েক দিন লাগবে। তিনি কাউন্সিলরের পক্ষে বলেন, 'মমিনুল হক সাইদ কোনো চাঁদাবাজি কিংবা অন্যায় কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এলাকার মাদক সমস্যা ও চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য কাজ করছেন।'