kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

মা দিবস আজ

'এমন দরদি ভবে কেউ হবে না'

ফারজানা লাবনী   

১০ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



'এমন দরদি ভবে কেউ হবে না'

এই সন্তান একদিন বড় হবে কিন্তু মায়ের এই ভালোবাসা থাকবে অটুট। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

মা, তুমি না হলে আমার জন্ম হতো না। আমি পৃথিবীর আলো দেখতাম না। তোমার মমতামাখা যত্ন না পেলে আজ হয়তো বেঁচেও থাকতাম না। মা, তুমি তিলে তিলে শেষ হয়ে সন্তানকে বড় করেছ, জীবনযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছ। তাই তো শিল্পী গেয়েছেন- 'মায়ের একধার দুধের দাম/কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোশ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না/এমন দরদি ভবে কেউ হবে না'।

মাকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা জানাতে, ভালোবাসতে, স্মরণ করতে আজ পালিত হচ্ছে 'মা দিবস'। প্রতিবছরই মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বাংলাদেশে এ দিবসটি পালিত হয়। দিবসটি ঘিরে গণমাধ্যমে বিভিন্ন আয়োজন থাকে। বিভিন্ন সংগঠন নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাণী দেওয়া হয় মায়েদের প্রতি বিশেষ সম্মাননা জানিয়ে। আর থাকে মাকে নিয়ে সন্তানদের ব্যস্ততা। যদিও মাকে মনে রাখার, শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা জানানোর বিশেষ কোনো দিনক্ষণ থাকার কথা নয়; কিন্তু বাস্তবতা হয়ে গেছে বড় কঠিন। মাকে ঠিকমতো মনে রাখা, ঠিকমতো পাশে থাকা, যত্ন নেওয়ার উপায় হয়ে ওঠে না এই আধুনিক নাগরিক জীবনে। সন্তানরা বড় হলে লেখাপড়া কিংবা কাজের তাগিদে দূরে চলে যায়। তখন অসহায় হয়ে পড়েন মা। ভালো খাবারটি পর্যন্ত মুখে ওঠে না তাঁর। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে প্রিয় সন্তানের কথা মনে করে চোখের জলে ভাসেন। মনের পর্দায় সন্তানের মুখ ভেসে ওঠে যখন-তখন। আবার কখন সন্তান কাছে আসবে, অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন। কিন্তু জীবনের বাস্তবতায় চাইলেও তাঁর বুকের ধনকে কাছে ধরে রাখতে পারেন না মা। আবার সন্তান যদি কষ্ট পায়, সে কথা ভেবে মনের এ আকুতি মুখ ফুটে বলেনও না।

ধানমণ্ডিতে থাকেন ৮৫ বছর বয়সী জোবেদা আব্বাস। তাঁর পাঁচটি সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত। স্বামী মারা যাওয়ার পর ব্যবসার হাল ধরে কঠিন পরিশ্রম করে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। সন্তানদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটি কম্পানিতে চাকরি করেন। উচ্চশিক্ষা নিয়ে লন্ডনে ডাক্তারি করছেন দুজন। একজন ইতালিতে একটি টেলিফোন কম্পানিতে চাকরি করেন। অন্যজন কানাডায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ব্যস্ত সন্তানরা মাকে সময় দিতে পারেন না। অর্থবিত্তের অভাব না থাকলেও জীবনের শেষ সময়ে বৃদ্ধ মায়ের দিন কাটে নিঃসঙ্গ। এই মা কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সব পাখি ঘরে ফিরে আসে, আমার পাখিরা ফেরে না! তারা ভালো আছে, এতেই আমি খুশি। আমি তাদের কাজ ফেলে আমার কাছে আসার জন্য বলি না। তারা ব্যস্ততায় আসতে পারবে না। হয়তো মন খারাপ করবে, কষ্ট পাবে।'

এমনই অপেক্ষায় থাকেন খুলনার জামিরা গ্রামের কোহেলী বেগম। মেয়েদের পড়াশোনার অনুমতি ছিল না পরিবারে। এর বিরোধিতা করে যৌথ পরিবারে দিন-রাত পরিশ্রম করে নিজে খেয়ে না খেয়ে মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়েছেন। প্রাইভেট পড়ার খরচ জুগিয়েছেন। রাজধানীতে বড় চাকরি করেন তাঁর মেয়ে। চাকরি, স্বামী-সন্তান নিয়ে ব্যস্ততায় নিয়মিত গ্রামে যেতে পারেন না। মাসে কিছু টাকা পাঠান। কিন্তু গ্রামে ছোট্ট কুটিরে মায়ের মন মানে না। পথ চেয়ে থাকেন শহরে থাকা সন্তানটির জন্য। সন্তানকে কাছে পাওয়ার ব্যাকুলতা তাঁকে কাঁদায়। এ রকম হাজারো দুঃখগাথা ছড়িয়ে আছে পৃথিবীজুড়ে।

সময়ের ব্যবধানে দূরন্ত বাল্য-কৈশোরের দিনগুলোর মতো মাকে হয়তো আর ক্ষণে ক্ষণে জড়িয়ে ধরা হয় না। মা হয়তো ভাবেন, সন্তান বড় হয়েছে, মায়ের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। মায়ের বুকটা হয়তো হাহাকার করে সন্তানকে একটু জড়িয়ে ধরতে।

মায়ের সেই আবেগী প্রত্যাশা পূরণ করার দিন আজ। সব শঙ্কা ঝেড়ে ফেলে মায়ের কাছে ছুটে যাওয়া যায়। পরম মমতায় কাছে বসে হাত ধরে বসা যায়। মা দিবসে মাকে জড়িয়ে বলা যায়, 'বড় হয়ে গিয়েছি। জীবন বড় কঠিন, মা। মন চাইলেই তোমায় ছুঁতে পারি না। ছেলেবেলার মতো করে হয়তো কথা বলতে পারি না। কিন্তু মনে রেখো, তুমি আমার সব। মাগো, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি তোমায়।'

ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা মা-বন্দনা করে কত কথাই না বলেছেন। আব্রাহাম লিংকন মাকে স্মরণ করে বলেন, 'আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু হয়েছি অথবা যা হতে আশা করি, তার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।'

জগতে মায়ের মতো আপনজন আর কে আছে! তাই প্রতিবছর এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় প্রিয় মায়ের মর্যাদার কথা। দেশে-বিদেশে মা দিবস একটি প্রতীকী দিন। পৃথিবীর ৪৬টি দেশে মা দিবস পালন করা হয়, তবে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে। বাংলাদেশে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস। উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মা দিবসের সূচনা হয় ১৯০৮ সালে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার স্কুলশিক্ষিকা অ্যানা জারভিস সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করার কথা ভাবেন। কিন্তু তাঁর সে ভাবনা বাস্তবায়নের আগেই ১৯০৫ সালের ৯ মে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশে কাজ শুরু করেন। বন্ধুবান্ধব নিয়ে ১৯০৮ সালে তাঁর মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন, সেখানে এলাকার সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের সূচনা করেন। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মায়েদের জন্য উৎসর্গ করে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়।

মা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বাণী দিয়েছেন। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতারে এ দিবস ঘিরে থাকছে বিশেষ আয়োজন। আজ সকাল ১১টায় আজাদ প্রডাক্টস 'রত্নগর্ভা মা ২০১৪' সম্মাননা দেবে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে। বিকেল ৫টায় শাহবাগের গণগ্রন্থাগারের সেমিনার কক্ষে 'সৎসঙ্গ মাতৃ সম্মেলন' আলোচনা অনুষ্ঠান ও বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। মা দিবস উপলক্ষে শিশুশিল্পী সুহা আনাদিল চৌধুরীর 'ছোট্ট পাখি' নামের গানের অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে ৮ মে।



সাতদিনের সেরা