kalerkantho

বুধবার । ১২ কার্তিক ১৪২৭। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ইতিহাসের কান্না

পানাম নগরের সেকাল একাল

আসাদুজ্জামান নুর, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)   

২১ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পানাম নগরের সেকাল একাল

ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো পানাম নগরের ক্ষয়িষ্ণু দালানকোঠা। ছবি : রফিকুর রহমান রেকু

প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁর একাংশে রয়েছে পানাম নগর। এখানেই ছিল মসলিনের মূল বাণিজ্যকেন্দ্র। এখনো পানাম নগরে দেখা যায় অপূর্ব ও নিপুণ কারুকাজখচিত প্রাচীন সব ইমারত। সরু রাস্তার দুই পাশে অট্টালিকা, সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির, মঠ, ঠাকুর ঘর, গোসলখানা, কূপ, নাচঘর, খাজাঞ্চিখানা, টাঁকশাল, দরবার কক্ষ, গুপ্তপথ, প্রশস্ত দেয়াল, প্রমোদালয় জানান দেয় এ নগরের প্রাচীন সমৃদ্ধির কথা।

কিন্তু পানাম নগর হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক রূপ, সোন্দর্য ও জৌলুস। এই নগরের অনেক প্রাচীন স্থাপনাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ। প্রায় ১০ বছর আগে এ নগর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থগিত হয়ে যায়। নগরের পুরনো ভবনগুলোর ইট, সুরকি ধসে পড়ছে। ভবনের দখল নিয়েছে শেওলা ও আগাছা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি।

পানাম নগর একসময় সন্ধ্যা নামার পর নাচ, গান, সুর ও সাকির আয়োজনে মেতে উঠত; নৃত্যের তালে তালে ঝুমুরের শব্দ ও তানপুরার সুরে মুখর হয়ে উঠত সোনারগাঁর বাতাস। আজ সেই নগরে সন্ধ্যা নামলে নেমে আসে গা-ছমছমে নীরবতা। সেই সুযোগে মাদকসেবীরা নিরাপদ স্থান হিসেবে এখানে বসায় নেশার আসর। সন্ধ্যার পর এলাকায় ঢুকতে ভয় পায় মানুষ। দিনের বেলায় বাড়িগুলো পরিণত হয় অন্ধকূপে। লোনা ইট ও কালো পাথরের টেরাকোটা এখন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পানাম ও আশপাশের গ্রামে। যে নাচঘরে সারা রাত চলত জলসা, নর্তকীর পায়ের ঘুঙুরের শব্দে মুখরিত থাকত; সেই নাচঘর এখন আর আলোকিত হয় না। নামিদামি বণিক ও পর্যটকদের ডিঙি নৌকা ভেড়ে না নগরের ময়ূরপঙ্খি ঘাটে। এখন যেন পানাম নগরের দেয়ালে কান পাতলে শোনা যায় নগরের হাহাকার আর আর্তনাদ।

তবু প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ভিড় জমায় পানাম নগরে। দেশ-বিদেশের প্রচুর পর্যটক আসে এখানে। যারা সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে বেড়াতে আসে, তারাও ঘুরে যায় বিবর্ণ এই নগরে।

পানাম নগর ঘুরে দেখা যায় ৪০০ বছরের পুরনো মঠবাড়ি, যার পশ্চিমে রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বাণিজ্যকুঠি (নীলকুঠি) পোদ্দারবাড়ি, কাশীনাথের বাড়িসহ নানা প্রাচীন ভবন। তবে সেগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শের শাহের আমলে নির্মিত সোনারগাঁ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মাইল দীর্ঘ ঐতিহাসিক গ্র্যান্ডট্যাংক রোডের নির্দশন এখনো বর্তমান। পাঁচটি প্রশস্ত ছয় মিটার দীর্ঘ সড়কের দুই পাশে একতলা, দোতলা ও তিনতলা প্রায় ৫২টি ভবন রয়েছে পানাম নগরে, যার বেশির ভাগই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ১০টি ভবন প্রায় বিলুপ্তির পথে। সব ভবনের বেশির ভাগ কক্ষের ইট খসে পড়েছে, কারুকাজগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা অবকাঠামো দেখে সহজেই অনুভব করা যায়, পানাম নগর কত সুন্দর ছিল! সরকার পানাম নগরকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে নিয়েছে।

পানাম নগরে প্রবেশের আগে দক্ষিণ দিকে পঙ্খিরাজ খালের ওপর ঐতিহ্যবাহী পঙ্খিরাজ সেতু। এখন এটি ব্যবহৃত হচ্ছে সোনারগাঁর একাংশের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে। এই সেতুর একাংশে বিশাল গর্ত। ভেঙে যাচ্ছে সেতুর রেলিংও। পানামের প্রবেশপথে পঙ্খিরাজ খালের উপর থাকা প্রাচীন সেতুটি নিশ্চিহ্ন করে বেশ কয়েক বছর আগেই তৈরি করা হয়েছে বাস চলাচলের রাস্তা। ঈশা খাঁর নাচঘর হিসেবে কথিত বাড়ি নীহারিকার একাংশ ধ্বংস করে তৈরি হয়েছে একটি নতুন রাস্তা।

এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি মোস্তফা মিয়া, আব্দুল মান্নাফ ভুইয়া, মজিবুর রহমান, নজু মিয়া, রমজান মিয়াসহ কয়েকজন এবং সোনারগাঁ যুব সংঘ পানাম নগরের কয়েকটি ভবন দখল করে দোকানপাট বানিয়ে ফেলেছেন। আরো কয়েকজন মালিকানা দাবি করে জায়গা দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন।

একইভাবে অস্তিত্ব হুমকির মুখে এই নগরের প্রাচীন বাড়িগুলোও। তবু প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকে আসে প্রাচীন এ নগর দেখতে। নগরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করল অনেকে। পানাম নগরের নিরাপত্তার দায়িত্বে কয়েকজন কর্মচারী-কর্মকর্তা থাকলেও তাঁদের দেখা মেলে না।

পানাম নগরে ছবি আঁকতে আসা শিল্পী বিপ্লব শ্রাবণ বললেন, 'আমি চার বছর ধরে পানাম নগরীর ওপর কাজ করছি। কিন্তু প্রতিবার এসেই দেখছি পানামের ভবনগুলো আগের চেয়ে আরো জরাজীর্ণ হয়েছে। বাড়িগুলো ভেঙে পড়ছে। বিভিন্ন ভবনে দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন ফাটল। শিল্পী হিসেবে আমি চাই ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত প্রাচীন এই নগরী টিকে থাকুক।' তিনি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করে বলেন, অচিরেই পানাম নগর সংস্কার করা না হলে এই নগরকে কোনোভাবেই রক্ষা করা যাবে না।

পর্যটকরা জানাল, ঐতিহাসিক পানাম নগর নিঃসন্দেহে পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান, যদিও বিদেশি পর্যটকদের ঘোরার জন্য এখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই।

সোনারগাঁ নাগরিক কমিটির সভাপতি এ টি এম কামাল বলেন, প্রাচীন স্থাপত্যের সংস্কার করতে হয়। এর আগে পানাম নগরের সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তাতে এই মূল বিষয়টি উপেক্ষা করে শুধু প্লাস্টার করা শুরু হয়েছিল। এরপর আর সংস্কারের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সরকার।

আজ থেকে প্রায় চার শ বছর আগে পানাম নগর স্থাপন শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ধাপে ধাপে মোগল নির্মাণশৈলীর সঙ্গে ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে নির্মিত হয় এ নগর।

পানাম নগরে মূলত উচ্চ মাধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যবসায়ী ও জমিদাররা বসবাস করতেন। এর পাশাপাশি রাজাদের আমির-ওমরাহদের জন্য পানাম নগর ও এর আশপাশের গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছিল নিপুণ কারুকাজখচিত পাকা ইমারত। পানাম ও এর আশপাশ ঘিরে পঞ্চদশ শতক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ জনজীবন ছিল।

ইতিহাসবিদ জেমস টেলরের মতে, আড়ংয়ের তাঁতখানা সোনারগাঁর পানাম নামক স্থানে ছিল এবং মসলিন শিল্প কেনাবেচার এক প্রসিদ্ধ বাজার ছিল পানাম নগর।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পানাম নগরের দায়িত্বে নিয়োজিত উচ্চমান সহকারী শেখ আলাউদ্দিন জানান, পানাম নগর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ছয়জন সাইট পরিচালক ও ছয়জন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ভুয়া দলিল করে জায়গার মালিকানা দাবি করছেন।

শেখ আলাউদ্দিন বলেন, ঐতিহাসিক এই নগরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য সীমানাপ্রাচীর নির্মাণসহ ভবনগুলো সংস্কারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু নাছের ভূঞা জানান, পানাম নগরের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই নগর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের আড্ডা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য স্থানীয় পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান মিঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, পানাম নগর সংস্কার ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগির সংস্কারের কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।

 

 

মন্তব্য