kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

উপাচার্য বলেছিলেন, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যান বি প্রাউড অব হার’

মাহফুজা খানম। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ ও লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ডাকসুর একমাত্র নারী ভিপি। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব টিচার্স ইউনিয়নের সভাপতি। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শেখ মেহেদী হাসান। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



উপাচার্য বলেছিলেন, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যান বি প্রাউড অব হার’

আপনার বেড়ে ওঠা?

আমার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৪ এপ্রিল, কলকাতায়। পূর্বপুরুষের আবাস ছিল ঢাকার মানিকগঞ্জে। দেশভাগের পর আমরা চট্টগ্রামে চলে আসি। সেখানকার নন্দন কানন স্কুলের পাশে, কৃষ্ণকুমারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। তবে শিশু শ্রেণিতে পড়ার পর ঢাকায় চলে আসি। আমাকে ভর্তি করানো হয় বাংলাবাজার স্কুলে। তখন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী লুত্ফুন্নেসা চৌধুরী। শিক্ষকরা আমাদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। নিজেদের মূল্যবোধ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন। সেই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা সেগুলো ধারণ করত এবং নিজেদের পেশাগত জীবনে সেটির প্রতিফলন ঘটাত। লুত্ফুন্নেসা আপা আমাদের সেভাবে তৈরি করেছিলেন। আমার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান খান ছিলেন এ দেশে ইনস্যুরেন্সের জনকদের একজন। ছিলেন ‘অনুশীলন’ আর ‘যুগান্তর’ দলের সদস্য। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বহুবার জেল খাটতে হয়েছে তাঁকে। দাদা মতিউর রহমান খান ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। সরকারি চাকরি করেও তিনি ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। ছিলেন সংস্কারমুক্ত সাহিত্যিকও। বড় চাচা মুসাবিরুর রহমান খান ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সেক্রেটারি। সেজো চাচা মুনতাসিরুর রহমান খান ছিলেন পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটের সেক্রেটারি ও রাষ্ট্রদূত। ছোট চাচা ড. মশিউর রহমান খান উপমহাদেশের একমাত্র ট্রিপল ডক্টরেট অর্জনকারী প্রকৌশলী। অন্যদিকে আমার বাবার সঙ্গে রাজীব গান্ধীর বাবা ফিরোজ গান্ধীর খুব বন্ধুত্ব ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর বিয়েতে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। মা-বাবাকে দেখেছি সবার সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার করতে। গরিব-দুঃখীর সেবা করতে।

 

ছোটবেলায় খ্যাতিমানদের সান্নিধ্য পেয়েছেন...

পুরান ঢাকার ৩৬ নম্বর স্বামীবাগে বাবা একটি বাড়ি কিনেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ এক বাড়ি ছিল সেটি। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি গোলাম মোস্তফা, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি সুফিয়া কামাল, প্রফেসর অজিত গুহ, কংগ্রেস নেতা আব্দুল জাব্বার খদ্দর, কংগ্রেস নেতা খগেন মিত্র, কমিউনিস্ট নেতা মহারাজ মণি সিং, অনিল দা, আবুল ফজল, জ্ঞান দা, জিতেন ঘোষসহ অনেকের যাতায়াত দেখেছি। তাঁদের স্নেহ-সান্নিধ্যে বড় হয়েছি।

 

খেলাধুলা পছন্দ করতেন?

স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। তিনবার বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। প্রিয় ইভেন্ট ছিল দৌড়, হাইজাম্প ও লংজাম্প। বড় হওয়ার পর স্প্রিন্ট ছেড়ে ডিসকাস থ্রো, শর্টপুট থ্রো, জেভলিন থ্রোতে অংশ নিতাম। ডাকসুর ভিপি হওয়ার পর নতুনদের সুযোগ দিতে খেলাধুলা বন্ধ করে দিলাম। পরে জাতীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থা গঠনে ভূমিকা রেখেছি।

 

রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেন কিভাবে?

১৯৬১ সালে বাংলাবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ইডেন কলেজে ভর্তি হই। তখন কলেজটির অবস্থান ছিল আজকের বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের জায়গায়। ইডেনে আইএসসি পড়ার সময় মতিয়া চৌধুরীর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হই। যখন প্রথম বর্ষে পড়ি, মতিয়া চৌধুরী ছিলেন বিএসসির ছাত্রী। কলেজে পড়ার সময় ১৯৬১-৬৩ সালে ‘শরিফ শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনের দিনগুলোতে কলেজ গেটে তালা ঝুলানো থাকত। সে সময় কতবারই না পেছনের দেয়াল টপকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় গিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছি! মিছিল শেষে মধুদার ক্যান্টিনে টিনের হাফপ্লেট শিঙাড়া আর রসগোল্লার সঙ্গে হরদ গ্লাস ফ্যাক্টরির সবুজাভ কাচের গ্লাসে পানি পান শেষে বাড়ি ফিরতাম। মা সালেহা খানম আমাকে কড়া শাসন করতেন। আমার ডান হাতে একটি দামি ঘড়ি ছিল। একবার পোস্টার ছাপানোর অর্থ ঘাটতি পড়ায় সেটি প্রেসে জমা রেখে বাসায় ফিরি। মা বললেন, ‘ঘড়ি কোথায় জমা রেখেছ জানি। কখনো সত্য গোপন করবে না।’ পরদিন তিনি টাকা দিলেন ঘড়ি ফেরত আনতে। সত্যি এক অসাধারণ মা তিনি। বাবাও ছিলেন সংস্কৃতিমনা উদার, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক।

 

আপনার শিক্ষাজীবন ও রাজনীতি এক সূত্রে গাঁথা...

১৯৬৩ সালে আইএসসি পাস করে বাবার ইচ্ছায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। তখন বিভাগীয় প্রধান ছিলেন বোস প্রফেসর ড. মতিন চৌধুরী। তিনি আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন। অন্যদিকে বাবা চেয়েছিলেন আমি যেন নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি। কার্জন হলে ড. মতিন চৌধুরীর ঘরে বসে ভর্তি ফরম পূরণ করার মুহূর্তগুলো আজও অনুভব করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকরা ছিলেন সত্যিকারার্থে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ড. মতিন চৌধুরী তখন ইকবাল হলের (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) প্রভোস্ট। কত ছেলের মাসিক পাওনা তিনি মওকুফ করেছেন! বহু ছাত্র-ছাত্রী তাঁর অর্থ আনুকূল্য পেয়েছে। ড. হিরন্ময় সেনগুপ্তের সৌম্য, শান্ত-সমাহিত চালচলন, আচার-ব্যবহার, জ্ঞানের গভীরতা আমাদের মুগ্ধ করত। ড. রফিকুল্লাহ স্যারের অসাধারণ শিক্ষাদান পদ্ধতির কারণে ক্লাসে কোয়ান্টাম মেকানিকসের মতো কঠিন বিষয় সহজ মনে হতো। ড. দেলোয়ার হোসেন সবাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে আমাদের সম্মানিত করতেন। নায়কোচিত চেহারার কারণে ড. লতিফ চৌধুরীকে আমরা ‘প্রিন্স অব ডেনমার্ক’ ডাকতাম। ছাত্রদের সঙ্গে তিনি বন্ধুর মতো মিশতেন। ড. মোতাশেম হোসেন সব সময়ই লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন; পরবর্তী সময়ে তিনি বোস প্রফেসর হয়েছিলেন। এই শিক্ষকদের চিন্তা, রুচি আমাদের বিকশিত করেছে। আমি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রী। পড়ুয়া হতেই হবে। কিন্তু না; তা আর হলো কই? বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। প্রথম বছরেই সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেলে রোকেয়া হল সংসদের সদস্য নির্বাচিত হলাম। দ্বিতীয় বছর হলাম ক্রীড়া সম্পাদিকা। তৃতীয় বছরে সহসাধারণ সম্পাদিকা।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আপনিই ডাকসুর একমাত্র নারী ভিপি...

১৯৬৭ সালের ১৯ মার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনের দিনটি স্পষ্ট মনে আছে। তখন উপাচার্য ছিলেন ড. মোহাম্মদ ওসমান গণি। নির্বাচন হলো ভিসির বাড়ির মিলনায়তন কক্ষে। গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীরা। জয়ী হলাম। সহকর্মীদের আনন্দ আমার ব্যক্তিগত আনন্দকে ছাড়িয়ে গেল। মিছিল করে গেলাম ইকবাল হলে। সভা হলো। আগের বছরের ভিপি ফেরদৌস কোরেশী ও শফি আহমেদ বক্তৃতায় আমাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। সহকর্মীদের এই অভিনন্দন পরবর্তী সময় আমাকে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। ডাকসু এ দেশের সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক নাম। আজকের এই স্বাধীন   বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে এই ছাত্রসংসদের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৬৬-৬৭ সালে ভিপি ছিলাম। ৫২ বছর আগের সেই সংগ্রামমুখর দিনগুলোর একজন প্রত্যক্ষ কর্মী ছিলাম বলে আমি গর্বিত।

 

সাম্প্রতিক আর আপনার সময়ের ডাকসু নির্বাচনের মধ্যে কী কী ভিন্নতা চোখে পড়েছে?

বর্তমান ডাকসুর প্রত্যক্ষ নির্বাচন থেকে আমাদের সময়কার নির্বাচন একেবারেই ভিন্ন ছিল। তখন কার্যকরী পরিষদের পদগুলো প্রতিবছর বিশেষ বিশেষ হলের জন্য বরাদ্দ থাকত। হলের কার্যকরী পরিষদের নির্বাচনের সঙ্গে ডাকসুর সদস্য হিসেবে প্রতি হল থেকে দুজন করে সদস্য প্রথমে নির্বাচিত হতেন। পরবর্তী সময়ে যাঁরা ডাকসুর সদস্য নির্বাচিত হতেন, তাঁদের মধ্যে আবার নির্বাচন হতো—যে হলে যে পদ নির্দিষ্ট থাকত, তার জন্য। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সরকারি সংগঠন এনএসএফ—এই তিনটি সক্রিয় ছাত্রসংগঠন ছিল। এ ছাড়া ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র শক্তি নামে আরো কয়েকটি সংগঠন ছিল। ষাটের দশক ছিল ছাত্র ইউনিয়নের স্বর্ণযুগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রায় সব মেধাবী ছাত্র কোনো না কোনোভাবে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রায় প্রতিটি হলেই ছাত্র ইউনিয়নের কেবিনেট ছিল। ১৯৬৭ সালে আমি পদার্থবিদ্যা বিভাগের এমএসসি বিভাগের ছাত্রী। রোকেয়া হলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ১৯৬৬-৬৭ সালে ডাকসুর ভিপি পদটি বরাদ্দ ছিল রোকেয়া হলের জন্য। এই হল থেকে নির্বাচনে সদস্য পদের জন্য ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে আমি ও মালেকা বেগম (বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাবেক সম্পাদিকা) দাঁড়ালাম। ছাত্রলীগ থেকে দাঁড়ালেন আমার বন্ধু শাফিনাজ বেগম (তেজগাঁও মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ) ও মমতাজ বেগম (মহিলা সংস্থার সভাপতি)। হল পর্যায়ের নির্বাচনে বিজয়ী হলাম আমি ও মালেকা বেগম। এরপর ডাকসুর নির্বাচনে ভিপি হলাম আমি। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন মোর্শেদ আলী। ঢাকা হল থেকে নির্বাচনের সময় তিনি জেলে ছিলেন। কোষাধ্যক্ষ হলেন সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. আতিকুজ্জামান। নির্বাচিত অন্য সদস্যের নামও মনে আছে—আজিজ, মোহাম্মদ মোস্তফা, মাহাবুব আলম বেগ, অসিত কুমার চক্রবর্তী ও বারী। আমাদের সময় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে হৃদ্যতা ছিল। তাই নির্বাচন বিতর্কিত হয়নি।

 

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কেমন ছিল?

উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওসমান গণি ছিলেন দক্ষ প্রশাসক। আমি ডাকসুর ভিপি থাকাকালে ছাত্র-ছাত্রীদের দাবিদাওয়া নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে সভা করেছি। প্রচণ্ড বাগিবতণ্ডাও হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্নেহ থেকে কখনো বঞ্চিত হইনি। এ কথাও ঠিক, আমরা তখন শিক্ষকদের যথার্থ সম্মান করেছি। মতাদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কখনো বেয়াদবি করার মানসিকতা লালন করিনি। প্রায়ই মিছিল নিয়ে ভিসির অফিস ঘেরাও করেছি। তিনি আমার বাবাকে টেলিফোনে নালিশ করতেন। কিন্তু প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করতেন না। একবার ফ্রান্সের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরে এলে তাঁর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে উপাচার্য বলেছিলেন, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যান বি প্রাউড অব হার’। আসলে তখন শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক ছিল মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্কের মতো। ডিপার্টমেন্টের বেয়ারা হীরালালদা, গঙ্গাদা, রহমান ভাইও আমাদের স্নেহ করতেন, সন্তানের মতো ভালোবাসতেন।

 

কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়েছিলেন?

১৯৬৮ সালের মার্চে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট অব পাকিস্তান থেকে মেধাভিত্তিক কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হই। লন্ডনের সাসেক্স ইউনিভার্সিতে অ্যাডমিশন হয়ে গেল। কিন্তু মোনেম খাঁর সরকার ‘নো অবজেকশন’ সার্টিফিকেট দিচ্ছে না। রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন ফেভারেবল নয়। পাসপোর্ট ইস্যু হচ্ছে না। এমন অবস্থায় পাসপোর্টের জন্য তদবির করতে পাসপোর্ট অফিসার বাহাউদ্দিন সাহেব ও মেজবাউদ্দিন সাহেবের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল করিম। অফিসাররা আমাদের বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, মোনেম খাঁ সরকারের চাকরি করে তাঁদের পক্ষে এ অবস্থায় পাসপোর্ট ইস্যু করা সম্ভব নয়। এ কারণে আমার বিলেতে পড়া হলো না।

 

অর্ধশতাব্দী আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনীতি করা একজন নারীর জন্য নিশ্চয়ই সহজ ছিল না?

আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে মেয়েদের উপস্থিতি যতটা সহজ, বায়ান্ন বছর আগে তা ছিল যথেষ্ট অভাবনীয় ও দুরূহ। একটি মেয়ে হয়ে যে দায়িত্ব সেদিন নিয়েছিলাম, তা যথাযথ পালন করার ব্যাপারে ছিলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কতটা পেরেছি, সেই মূল্যায়ন ভবিষ্যতে হয়তো কোনো দিন হবে।

 

১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনেও আপনার ভূমিকা ছিল...

১৯৬৬-৬৭ সাল, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল আওয়ামী লীগের ছয় দফা দাবি আন্দোলনের পটভূমিকায় উদ্বেলিত। ছাত্র আন্দোলনও ছিল এই আন্দোলনকে ঘিরে, আইয়ুব শাহি, মোনেম শাহির বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের সব ক্ষেত্রে ছিল চরম বৈষম্য। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ‘ইসলাম গেল’—এই ধুয়ায় রবীন্দ্রচর্চা, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে শাসকগোষ্ঠী বাধা দিয়েছিল। কিন্তু এ দেশের ছাত্রসমাজ তথা সমগ্র জাতি এ অন্যায় মেনে নেয়নি। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর, বাঙালির কলঙ্ক মোনেম খাঁ জেল-জুলুম, হুলিয়া, মিছিলে গুলি, লাঠিচার্জ, হল রেইড, গ্রেপ্তার, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র বহিষ্কার, সভা-সমিতি উপলক্ষে ১৪৪ ধারা জারি করতে থাকে। এনএসএফের কর্মী দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। পাঁচপাত্তু নামের একজন এনএসএফ কর্মী ছিল। নিজের গলায় সাপ পেঁচিয়ে সে ক্যাম্পাসে আসত। বিরোধীদের সাপের ভয় দেখাত। সহিষ্ণুতা বলে তার কিচ্ছু ছিল না। ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের মুখপাত্র, ডাকসুর ভিপি হিসেবে আমাকে কাজ করতে হয়েছে। প্রতিদিন সভা-মিছিল থাকত। ছাত্রসমাজের কোনো ইস্যুতে প্রধানত সভা হতো শহীদ মিনারে। জাতীয় ইস্যুতে সভা হতো বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে অথবা পল্টন ময়দানে। যেকোনো ইস্যুতে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ভিত্তিতেই সাধারণ সভাগুলো হতো। ছাত্রলীগের আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রউফ; ছাত্র ইউনিয়নের সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও শামসুদ্দোহা ছাড়াও অন্য দল থেকে মুজাহিদী, মাহবুবুল্লাহ—এঁরা থাকতেন। ছয় দফার আন্দোলনকে এ দেশের আপামর জনসাধারণের আন্দোলনে পরিণত করার দায়িত্ব ছিল ডাকসুর ওপর। দেশের এক প্রান্ত তেঁতুলিয়া থেকে অপর প্রান্ত টেকনাফ পর্যন্ত জনসভা ও ছাত্রসভা করতে ছুটে বেড়িয়েছি। পুলিশি অত্যাচারের শিকার হয়েছি। আমার ডান হাতের কবজির ব্যথা আজও রয়ে গেছে। ছয় দফা আন্দোলন চলাকালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ও বেআইনি সভায় সভানেত্রীত্ব করার অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলো। জেলও খেটেছি, তবু প্রতিটি আন্দোলনে সরাসরি কাজ করেছি।

 

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল?

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে সভা-মিছিলে অংশ নিয়েছি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা রকম গড়িমসি করে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান সম্পূর্ণ অন্যায় ও অগণতান্ত্রিকভাবে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশ প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ওই বিক্ষোভে আমিও অংশ নিই। ৭ই মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাদের নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। তখন পাড়ার ছেলেদের নিয়ে মিছিল-মিটিংয়ের আয়োজন করি। ২৫ মার্চ স্বামী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদসহ পাঁচ মাসের সন্তান নিয়ে পল্টনের বিজয়নগর এলাকার একটি বাসায় ছিলাম। বন্ধু, আত্মীয়দের কেউ কেউ ভারতে চলে যায়। আমার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারের। তাঁর নিদের্শনা অনুযায়ী কাজ করতাম। অর্থ সংগ্রহ, ওষুধ সংগ্রহ, পুরনো কাপড় সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে গিয়ে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে লিফলেট সাইক্লোস্টাইল করে আনতাম। রসায়ন বিভাগের ল্যাবরেটরি থেকে বেয়ারাদের সহযোগিতায় রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ করতাম। চিঠিপত্র আনা-নেওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশিত রেকির কাজ করতাম। ওই সময় ইউএসআইএস লাইব্রেরিতে যে অপারেশন হলো, সেখানে সরাসরি অংশ নিয়েছি। আমার বড় বোনের সহপাঠী ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তাঁর নির্দেশে ‘বিচিত্রা’ সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর ছোট ভাই ফাত্তাহর কাছে ওষুধ, টাকা ইত্যাদি পৌঁছে দিয়েছি। টেলিভিশন ভবনের অপারেশনেও অংশ নিয়েছি। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শত্রুবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজি যখন ৯২ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের প্রতিনিধি হিসেবে মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

 

রাজনীতি, আন্দোলনের পরও আপনার একাডেমিক পরীক্ষার ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়...

কখনো দ্বিতীয় হইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পর আমাকে থিসিস দেওয়া হলো অ্যাটমিক এনার্জি সেন্টারে ভেনডি-গ্রাফ জেনারেটরে। প্রথমে কেউ আমার গাইড হতে রাজি হয়নি। কারণ সারা রাত জেগে রিডিং নিতে হবে। অ্যাটমিক এনার্জি সেন্টারও একজন মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে অসম্মতি জানাল। কিন্তু নারী হওয়ায় গবেষণা করতে পারব না? আমার শিক্ষক অধ্যাপক ড. মতিন চৌধুরী গবেষণার সুযোগ দিতে রাজি হলেন। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. সিদ্দিক স্যার আমার এমএসসি থিসিসের গাইড হতে সম্মতি দিলেন। তিনি অনেক কষ্ট করে বাড়ি ও সেন্টারে যাওয়া-আসা করতেন। শিক্ষকদের এমন উদারতা ও মহত্ত্বের কথা বলে শেষ করা যাবে না!

 

শিক্ষক হিসেবে আপনি কেমন ছিলেন?

আমার কর্মজীবনের শুরু বাবার প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে। এরপর ১৯৬৯ সালে পুরানা পল্টন গার্লস কলেজে বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। ১৯৭২ সালে আমাদের কলেজে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী এলেন। তিনি আমাকে ইডেন সরকারি কলেজে যোগ দিতে বললেন। সে বছরের ২৮ আগস্ট ইডেনে যোগ দিলাম। তখন ছাত্রীরা দুপুরে ক্লাস করতে চাইত না। বাড়ি চলে যেত। অধ্যাপক হামিদা বানু দুপুরে ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব আমাকে দিলেন। আমার ক্লাসে বেশ ভিড় জমত। পড়াশোনোর বাইরে শিক্ষার্থীদের মানস গঠনের দিকে গুরুত্ব দিতাম। বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা শেষে ২০০৩ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছি।

 

দুই দফা এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এখন সভাপতি। এখানে বিশেষ কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

এশিয়াটিক সোসাইটি একটি উঁচু মানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। রেওয়াজ ছিল প্রবীণ শিক্ষাবিদ এসে এখানে গবেষণা করবেন। আমি সে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। আমরা যখন জাতীয় জ্ঞানকোষ ‘বাংলাপিডিয়া’ প্রণয়ন করি, তখন বহু তরুণ গবেষককে কাজের সুযোগ দিয়েছি। ‘কালচারাল সার্ভে অব বাংলাদেশ’ প্রণয়নকালেও একই কাজ করেছি। আমরা চেয়েছি একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে। তরুণ প্রজন্মকে গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে পারলে আমাদের দেশ সমৃদ্ধ হবে। এশিয়াটিক সোসাইটিতে গবেষণা পরিচালনা, বই প্রকাশ, সেমিনার আয়োজন, স্কলারলি সহযোগিতা, বিভিন্ন ট্রাস্ট গঠনসহ নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছি।

 

সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড কেমন লাগে?

শিক্ষা বিস্তারে আজীবন কাজ করেছি। এখনো করছি। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছি। সুবিধাবঞ্চিতদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি। সাধ্যমতো বৃত্তির ব্যবস্থাও করছি। মানিকগঞ্জের ১৪৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বৃত্তি দিচ্ছি। এসব কাজে আমি আনন্দ পাই।

 

আপনার লেখালেখি?

‘মাহফুজা খানমের ডায়েরি’ নামে ডায়েরি লিখতাম। এ পর্যন্ত কয়েক খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া আমার লেখা ‘ছাত্ররাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ আগে ও পরে’, ‘তোমারই ধ্রুবতারা’, ‘গণমানুষের মুক্তির আন্দোলন’, ‘মধুদা’ ইত্যাদি বই বের হয়েছে।

 

ব্যক্তিগত জীবন?

১৯৬৯ সালের ২৮ নভেম্বর ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সঙ্গে পরিচয়। পারিবারিকভাবে বিয়ে করি পরের বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি। আমাদের তিন সন্তান—ডা. মাহফুজ শফিক, ডা. মাশরুরা শফিক ও ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক। ছেলে-মেয়েরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

(ইন্দিরা রোড, ঢাকা; ৫ নভেম্বর ২০১৯)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা