kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

আমি লোকসাহিত্যকে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে গেছি

২ জুন, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



আমি লোকসাহিত্যকে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে গেছি

প্রবীণ শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক ড. আশ্রাফ সিদ্দিকী। তিনি এ দেশের অন্যতম প্রধান লোকসাহিত্যিক। লোককথা, লোকগাথা, প্রবাদ, রূপকথা ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিখেছেন তিনি। তাঁর ফেলে আসা জীবন ও কাজের ভুবনের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

আপনার জন্ম? মা-বাবা?

আমার জন্ম টাঙ্গাইলের নাগবাড়িতে ১৯২৯ সালের ১ মার্চ। বাবা আবদুস সাত্তার সিদ্দিকী চিকিৎসক ছিলেন। মা ছিলেন খুব প্রগতিমনা। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর তিনি আপন ফুফু। তাঁর বাবা আবদুল হামিদ চৌধুরী পার্লামেন্টে বিরোধী দলে ছিলেন। একই গ্রামে তাঁদের জন্ম। আবদুল হামিদ চৌধুরী আবার আমার বাবার আপন চাচাতো ভাই। আমরা ভাই-বোন পাঁচজন। আমার বড় ভাই, বোন। তারপর আমি। এর পর ভাই, বোন আছে। তবে এখন আমিই বেঁচে আছি। বাকিরা চলে গেছেন।

 

লোকসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কিভাবে হলো?

আমাদের নাগবাড়িতে সারা বছরই লোকেরা গান গাইত। ধান, পাট কাটার সময় গান করত। মাঝেমধ্যে লোকগীতি নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতো। বহু দূর থেকে গায়করা আসতেন। যাঁরা গ্রামের অর্থশালী লোক, তাঁরাই তাঁদের আনতেন। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, দুর্গাপূজা, মহররম ইত্যাদিতে তাঁদের দাওয়াত করে আনা হতো। প্রায় সারা রাত তাঁরা গান করতেন। তাঁদের সেসব গান শুনেই আমার লোকসাহিত্যের প্রতি একটি ভালোবাসা জন্মায়। এ ছাড়া স্কুলে পড়ার সময়ও বিশেষত ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়ার সময় দেখেছি, সে অঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রচুর লোকসাহিত্যনির্ভর অনুষ্ঠান হতো। সেগুলো দেখে দেখে লোকসাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নিল। লোকসাহিত্যে এই অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখান থেকেই মৈমনসিংহ গীতিকা সংগৃহীত হয়, দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদনা করেন। দীনেশচন্দ্র, আশুতোষ ভট্টাচার্যদের বই পড়েও লোকসাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। যখন শান্তিনিকেতনে গেলাম, অনেক কিছুর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের সম্পর্ক ছিল। তখন লোকসাহিত্য পড়ার যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হলো, বহু লোকগবেষকের সঙ্গে পরিচিত হলাম। দীনেশচন্দ্র সেন, আশুতোষ ভট্টাচার্য, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সংগীতকার আব্বাসউদ্দীন আহমদসহ আরো অনেককে দেখলাম। তাঁদের দেখেও লোকসাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ, ভালোবাসা হলো। শান্তিনিকেতনে অনেক বিখ্যাত লোকবিজ্ঞানী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সবারই লোকসাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা ছিল, রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। তিনি লোকসাহিত্য, ছড়ার ওপর বই লিখেছেন। কাজেই শান্তিনিকেতন আমার বেইজ বা ভিত্তিটি তৈরি করে দেয়।

 

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ কিভাবে?

রবীন্দ্রনাথকে দেখিনি, তবে তাঁর দুটি চিঠি আমি পেয়েছি। ছোটবেলায় তাঁকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। তিনি তার জবাবে আমাকে দার্জিলিং থেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালেন। তারপর শান্তিনিকেতন চলে গেলেন। তাঁকে নিয়ে বন্ধু ও আত্মীয়দের মধ্যে আমি অনেক আলোচনা করলাম। সেই থেকে তাঁর সাহিত্যের প্রতি আমার একটি আকর্ষণ হয়। পরে তাঁকে চিঠি লিখলাম, শান্তিনিকেতনে যেতে চাই। তিনি শান্তিনিকেতনের প্রিন্সিপালকে দিয়ে চিঠির উত্তর দিলেন—‘ঠিক আছে তুমি আসো। এখানে তোমার পড়াশোনার ব্যবস্থা হবে।’ তাঁর এই চিঠির সূত্র ধরেই শান্তিনিকেতনে পড়তে গেলাম। কর্তৃপক্ষও আমাকে হাফ ফ্রি করে দিল। সেই চিঠিও আছে। আমার লেখা বই আছে ‘রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন’, ‘শান্তিনিকেতনের পত্র’—এগুলোর মধ্যে এসব বর্ণনা আছে। সেখান থেকে এক বছর পর ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম। তারপর বিএ অনার্স পড়লাম। কিন্তু এরপর দেশভাগ হয়ে গেল বলে বাংলাদেশে এসে পরীক্ষা দিলাম। করটিয়া সা’দত কলেজে আমার সিট পড়েছিল। সেখান থেকে অনার্স পাস করলাম। প্রথম শ্রেণি পেলাম। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ পড়লাম। সেখানেও প্রথম শ্রেণিই পেলাম। প্রথম শ্রেণিতে বোধ হয় দ্বিতীয় হয়েছিলাম। তারপর খেয়াল হলো বিদেশে পড়তে যাব, ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করলাম এবং পেয়েও গেলাম। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ ডিগ্রি নিয়ে চলে এলাম। সেখানেও ফোকলোর আমার বিষয় ছিল।

 

কলকাতায় থাকতে তো অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

কলকাতায় থাকার সময় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তখনই তাঁর কথা জড়িয়ে আসছিল। কবি তখন কলকাতার শ্যামবাজারে থাকতেন। একবার কোনো এক সিনেমা হলে তিনি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে দুই দলের ঝগড়া লাগল। তাদের লাঠির একটি বাড়ি তাঁর মাথায় এসে লাগল। ফলে তাঁর মাথার খুলি ভেঙে গেল। এরপর থেকে আস্তে আস্তে তাঁর বাক্শক্তি বন্ধ হয়ে গেল। কলকাতায় চিকিৎসা করা হলো, কিন্তু কোনো উন্নতি হলো না। তারপর তাঁকে বিলাতে পাঠানো হলো। সেখানে তিনি অনেকটা উন্নতি করলেন। ফিরে আসার পর আবার অসুবিধা হলো। তখন সরকারই তাঁকে রাঁচিতে পাঠাল। সেখানেও উন্নতি হলো না। এরপর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ঢাকায় নিয়ে এলো। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অনেক চিকিৎসা হলো। কিন্তু ইমপ্রুভ হলো না।

বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশী কলকাতা সিটি কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। বুদ্ধদেব বসু ভালো পড়াতেন। তিনি আসতেন, সুন্দরভাবে পড়িয়ে চলে যেতেন। কথাবার্তা বলতেন না। প্রমথনাথ বিশী ক্লাসে খুব হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে কথা বলতেন। সে জন্য তিনি ছাত্রমহলে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। এ ছাড়া অরবিন্দু বসুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তিনি আমাদের লেখায় খুব উৎসাহ দিতেন—‘পড়ো পড়ো পড়ো, লিখতে হলে আরো পড়তে হবে। রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর পড়ো। পড়তে পড়তে তুমি একটি পথের দিশা পেয়ে যাবে’—এসব বলতেন। আনন্দমেলার পরিচালকেরও সঙ্গে দেখা হয়েছে। ড. নিহাররঞ্জন রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি অনার্সে আমাদের পড়াতেন। তিনি খুব ভালো পড়াতেন। প্রাচীন সাহিত্য পড়াতেন, অত্যন্ত ভালো শিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া দৈনিক আজাদে আবুল কালাম শামসুদ্দীন ছিলেন, তাঁর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। সেখানে মোহাম্মদ মোদাব্বেরের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি আজাদের মুকুলের মাহফিল পরিচালনা করতেন। তাঁর বাড়ি ছিল বশিরহাট।

 

আপনার পিএইচডির বিষয় কী ছিল?

‘বেঙ্গলি ফোকলোর ডিউরিং ব্রিটিশ পিরিয়ড।’ দুই বছর অমানুষিক পরিশ্রম করে আমি ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির গবেষণা করেছি। দীনেশচন্দ্র সেন লোকসাহিত্য নিয়ে বিরাট কাজ করেছেন। সে কাজকে অবলম্বন করেই আমি ওখানে কাজ করেছি। আমার কাজের পুরোটাই তাঁর গবেষণাকে কেন্দ্র করে হয়েছে। তিনি বাংলায় কাজ করেছিলেন, আমি ইংরেজিতে করেছি। তাঁর কাজকে ডেভেলপ করে আমি লোকসাহিত্যকে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে গেছি। আমার পিএইচডির থিসিস বিদেশ থেকে ওরা বের করেছে। এই থিসিসগুলো ওদের সম্পত্তি, তারা বই আকারে বের করে। পরে অবশ্য আমাদের বাংলা একাডেমিও এটি প্রকাশ করেছে।

 

শিক্ষকতায় কেন এসেছিলেন?

আমি তো শান্তিনিকেতনে পড়তাম, কাজেই পড়াতেই ভালো লাগত। সেই জীবন আমার পছন্দ ছিল। সে জন্য শিক্ষকতাকেই বেছে নিলাম। আর প্রশাসন আমার ভালো লাগেনি। মাঝখানে আমাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দুই বছর ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ছিলাম। ঢাকার ইডেন বিল্ডিংয়ে অফিস ছিল, ঢাকা জেলার ইতিহাস লিখতে হতো। কিন্তু সেটি আমার ভালো লাগেনি বলে তদবির করে ঢাকা কলেজে চলে গেলাম। তখন এই কলেজে বাংলা বিভাগে চারজন শিক্ষক ছিলেন, আমি বিভাগীয় প্রধান। কলেজে ছাত্রসংখ্যা ভালোই ছিল, ১০ হাজারের কাছাকাছি। সেখানে দুই বছর থাকার পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বদলি করা হলো। সেখান থেকে বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে বদলি হলাম।

 

শিক্ষকতার শুরু তো কুমুদিনী কলেজ থেকে?

সেখানে আমি ১৯৫১ সালে গেলাম। এমএ পরীক্ষা দিয়ে টাঙ্গাইল বেড়াতে গেলাম। তাঁরা বললেন, এখানে কিছুদিন পড়ান। রাজি হয়ে গেলাম। মাত্র ছয় মাসের সেই জীবনটি খুব ভালো কেটেছে। রায়বাহাদুর আরপি (রণদা প্রসাদ) সাহা মাঝেমধ্যে কলেজে আসতেন। এটি মেয়েদের কলেজ।  এরপর ফল প্রকাশিত হলো। সরকারি চাকরি শুরু করলাম। প্রথমে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপনা করেছি। দুই বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। এই কলেজটি পদ্মা নদীর ধারে। কলেজের অবস্থা ভালোই ছিল। ছাত্রও অনেক। কলেজে তেমন কোনো গণ্ডগোল ছিল না। শিক্ষকদের প্রায় সবাই উত্তরবঙ্গের মানুষ। তাঁদের লেখাপড়াও ভালো ছিল। কেউ রাজনীতি করতেন না। সরকারি কলেজে রাজনীতি করাও যায় না। সেখানে দুই বছর থাকার পর দুই বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এলাম। আমাকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি রাজশাহী কলেজে একটি সেমিনারে এসেছিলেন। তিনি বললেন, ‘এখানে থেকে কী হবে? তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসো। তোমার যে বিষয়, সেখানে গেলে ভালো হবে।’ তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। তিনি তখন বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন না। তবে ইমেরিটাস প্রফেসর ছিলেন। সেখানে এক হিন্দু ভদ্রলোক বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনিও আমাকে পছন্দ করলেন। শান্তিনিকেতনের ছাত্র বলে তিনি আমাকে নিয়ে এলেন। তখন মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। আমাকে ডেপুটেশনে নেওয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। দেশের অবস্থা রাজনৈতিকভাবে তখন খুব উত্তপ্ত ছিল। এ অবস্থায় মনে হলো, রাজশাহীতে তো ভালোই ছিলাম। আমি তো ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের চাকুরে নই, আমার সরকারি চাকরি। সেখান থেকে পিএইচডির জন্য আমেরিকায় চলে গেলাম। ফেরার পর সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি হলো। এরপর আবার রাজশাহী কলেজে। এক বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে চলে এলাম। দুই বছর থাকলাম। সেখান থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। মাত্র এক বছর ছিলাম। সেখানে এমএ পড়ানো হতো। তখন এই কলেজে ১০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ছিল। এরপর জগন্নাথ কলেজে বদলি করে দেওয়া হলো। সেখানেও এমএ পড়ানো হতো। ২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ছিল। আমার অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত ছাত্র আছে। তাদের মধ্যে ড. মনিরুজ্জামান, ড. আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ড. ওয়াকিল আহমেদও আমার ছাত্র। তারা সবাই দেশ অথবা বিদেশে পিএইচডি পেয়েছে।

 

জগন্নাথ কলেজে তো অধ্যক্ষ ছিলেন?

হ্যাঁ, প্রিন্সিপাল হিসেবে দুই বছর ছিলাম। ওই কলেজে খুব বেশি রাজনীতি ছিল। ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। ছাত্রদের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি হতো, অহরহ গোলাগুলি লেগেই থাকত। দুই-একটি হত্যাকাণ্ডও হলো। সে খবরও পত্রপত্রিকায় বের হয়েছিল। ফলে দেখলাম যে এখানে আর চাকরি করা যাবে না। কোনো শিক্ষকই সম্মানের সঙ্গে ক্লাস নিতে পারছেন না। এখানে থাকলে অপমানিত হতে হবে। যদি অন্য কোথাও দিত, তাহলে চাকরি করতাম। কিন্তু সরকার অন্য কোনো জায়গায় আমাকে দিল না। তারা আমাকে দুই বছর এক্সটেনশন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমার ভালো লাগেনি। কাজেই  ১৯৬৬-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত থেকে রিটায়ার করে বাড়িতে চলে এলাম, গবেষণা করতে লাগলাম।

 

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের জীবন?

আমাকে এখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি নিজে একজন গবেষক ছিলেন। কাজেই তিনি শুধু আমাকে নয়, যাঁরা গবেষণা করতেন, তাঁদের সবাইকেই আদর করতেন। আমার পরে ড. আনিসুজ্জামান, ড. রফিকুল ইসলামদের তিনি স্নেহ করে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে যোগদানের পর ফোকলোর বিভাগকে বিস্তৃত করতে শুরু করলাম। আগে এটি তেমন কোনো অবস্থায় ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক সংগ্রাহক নিযুক্ত করলাম। লোকসাহিত্য সংগ্রহের জন্য টাকা বরাদ্দ করা হলো। আগে এখানে ফোকলোরের চর্চা কম ছিল। আমি চেষ্টা করতে লাগলাম, ধীরে ধীরে ফোকলোর বিভাগ খুবই সমৃদ্ধ হতে লাগল। একাডেমি থেকে অনেক বই বেরোলো। আমার নিজেরই অনেকগুলো বই প্রকাশিত হলো। আগে এখানে ফোকলোরের চর্চা ছিল ১০ শতাংশ, আমি গিয়ে শতভাগ করলাম। বাংলা একাডেমিতে আমি ১৯৬০ থেকে ৬৬ সাল পর্যন্ত ছিলাম। এখানে দলাদলি একটু কম ছিল। এটি ভালো বিষয় ছিল।

 

লেখালেখির শুরু কিভাবে হলো?

তখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। সেখানে দেখলাম ছাত্ররা অনেকেই বই লেখে। ফলে একটি বই লেখা যায় কি না আমিও ভাবলাম। বাংলার লোককথানির্ভর ‘ভোম্বল দাস দ্য আংকেল অব লায়ন’ নামের একটি পাণ্ডুলিপি লিখে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাকমিলান কম্পানিকে পাঠালাম। তারা সেটি ছাপতে রাজি হলো। তখন আমার ৫২ বছর, মধ্য বয়স। ‘সিংহের মামা ভোম্বল দাস’ ১১টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এরপর আমার আরো একটি বই তারা ছাপতে রাজি হলো—‘টুনটুনি অ্যান্ড আদার টেলস।’ এটিও সংগ্রহ করা লোককাহিনি। এ দুটি বইয়ের লোককথাগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে ময়মনসিংহ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে স্কুল-কলেজে এ বই দুটি পাঠ্য হলো। বই দুটি প্রকাশের পর আমার বেশ লাভ হলো। দেশে বেশ নাম হয়ে গেল। 

 

শিশুদের নিয়ে লেখার কথা মাথায় কেন এলো?

ছোটবেলায় আমরা আজাদ পত্রিকার শিশুদের আসর মুকুলের মাহফিল করতাম। সেখানে মোদাব্বের সাহেব ছিলেন। আবুল কালাম শামসুদ্দীন, হাবিবুর রহমানসহ আরো অনেক লেখক সেখানে শিশুদের জন্য লিখতেন। তাঁরা আমাদের লিখতে বলতেন, উৎসাহ দিতেন। তাঁরা মাঝেমধ্যে সভা ডাকতেন, সেগুলোতে শিশুসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। এরপর তো ঢাকায় চলে এলাম। ইত্তেফাক, আজাদ, ইত্তেহাদ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হতে লাগল। এসব পত্রিকায়ও শিশুদের পাতা ছিল। সেখানে আমরা লিখতাম। মাঝেমধ্যে সাহিত্যসভা হতো, আমরা যেতাম। এভাবেই তাদের নিয়ে লেখার শুরু।

 

আপনার আরো অনেক বই আছে।

আমার লোকসাহিত্যের ওপর ১২ খণ্ডের বই আছে। সেটির একেক খণ্ডে একেকটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। একটিতে লোকগান, অন্যটিতে লোকগীতিকা, কোনোটিতে প্রবাদ, কোনোটিতে ধাঁধা—এভাবে খণ্ডগুলো সাজিয়েছি। এসব বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হতো, সেগুলো আমার কাছে ছিল। বাংলা একাডেমির পত্রিকায়ও অনেক কিছু পেয়েছিলাম। নিজেরও কিছু কালেকশন ছিল। সব মিলিয়ে প্রাচীন ও বর্তমান বই থেকে সংগ্রহ করে বইগুলো লিখেছি। আমার আরেকটি বই ‘কিংবদন্তির বাংলায়’ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ইত্যাদি অঞ্চল নিয়ে যেসব কিংবদন্তি, মুখে মুখে প্রচলিত কথা আছে, সেগুলো তুলে ধরেছি। যেমন ঢাকা নামটি কেন হলো? ঢাক্কা মানে ঢাকায় ঢোল বাজানো হতো বলে এর নাম ঢাকা হয়েছে। টঙ্গো-আইল নামটি থেকে টাঙ্গাইল নাম হয়েছে। এসব লোককথা বিভিন্ন জায়গায় চলিত ছিল, কিন্তু আমার আগে সংগ্রহ করা হয়নি। ‘শুভ নববর্ষ’ বইটি আমার ভালো লাগে। এতে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে। আর ‘বাংলাদেশের লোকগীতিকা’ বইটি আট খণ্ডের। দীনেশচন্দ্র সেনের সংগ্রহকে কেন্দ্র করে, নতুন আরো কিছু সংগ্রহ নিয়ে এই বইটি তৈরি করেছি। ‘আবহমান বাংলা’ এবং ‘বাংলার মুখ’ও সেই ধরনের লেখা নিয়ে তৈরি করেছি। আমাদের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব লোকসাহিত্য, লোকগীতি, লোককথা, লোকগাথা লুকায়িত আছে, সেগুলো নিয়ে এ বইটি লেখা। ‘প্যারিস সুন্দরী’ আমার রম্যরচনা। ‘লোকায়ত বাংলা’ লোকসাহিত্যগুলো আমাদের এখানে যেভাবে প্রচলিত আছে, সেটি নিয়ে লেখা। যেমন একটি গান কিভাবে, কখন, কোন অঞ্চলে গাওয়া হয়, সত্যিকারভাবে মাঠেঘাটে এগুলো কী অবস্থায় আছে, সেসব নিয়ে লেখা। লোকসাহিত্যের ওপর আমার প্রায় ৩০টি বই আছে। বাকিগুলো অন্যান্য বিষয়ে লেখা।

 

কিভাবে সংগ্রহ করতেন?

কোনো এলাকায় ভালো কিছু আছে জানার পর সাধারণত ছাত্রদের দিয়ে সংগ্রহ করাতাম। আবার নিজেও সংগ্রহ করতাম। এভাবেই নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের লোকসাহিত্যগুলো সংগ্রহ করেছি। আর বাংলা একাডেমিতে থাকতে আমরা নেত্রকোনা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় ফোক কালেকটর বা লোক সংগ্রাহক নিযুক্ত করলাম। আমাদের ১০১ জন কালেকটর ছিলেন। লোকসাহিত্যের জন্য টাকাও বরাদ্দ ছিল। এসব সংগ্রাহকের বেশির ভাগই স্কুল শিক্ষক ছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন গ্রামের কবি। সিলেটের একজন গ্রাম্য কবি আলী আকবর চৌধুরী অনেক লোকসাহিত্য আমাদের সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তাঁরা আমাদের যেসব সংগ্রহ করে দিতেন, মান যাচাইয়ের পর সেগুলোর বিনিময়ে টাকা নিতেন। শুধু বাংলা একাডেমিই নয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, নজরুল একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিতেও তাঁরা বিভিন্ন নথি, গুরুত্বপূর্ণ নানা কিছু সংগ্রহ করে দিতেন। একটি লোকগীতির জন্য ১০ টাকা, লোকগীতিকাপ্রতি ২৫ টাকা, লোককথার জন্য ১৫ টাকা দেওয়া হতো। কোন ধরনের সংগ্রহের জন্য কেমন টাকা দেওয়া হবে সেটি আমাদের মিটিংয়ে ঠিক করা হতো। এভাবেই চট্টগ্রাম, মৈমনসিংহ গীতিকার অনেক লোকগীতিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেছিলেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। তিনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছিলেন। তিনি পূর্ববঙ্গ গীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকার ওপর চমৎকার কাজ করেছেন। আমাদের মতো বিদেশে না গেলেও তিনি দেশে থেকেই চমৎকার সুনাম কুড়িয়েছিলেন।

 

লোকসাহিত্যকে রেডিও-টিভিতে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।         

বিটিভি থেকে আমাকে লোকসাহিত্যের ওপর অনুষ্ঠান করতে বলা হলো। বললাম কী করব? বলল, লোকগীতি ও লোকগীতিকার ওপরেই আপাতত কাজ করেন। পরে কী করা যায় দেখা যাবে। কাজেই ‘হীরামন’ নামের একটি অনুষ্ঠান তৈরি করতে লাগলাম। তারা সে অনুষ্ঠান প্রায় এক বছর প্রচার করেছিল। অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল বলে মনে হয়। অসংখ্য চিঠি আসত। অনুষ্ঠানটি তারা বারবার দেখতে চাইত বলে হীরামন কয়েকবার রিপিটও করা হয়েছিল।

 

আপনার একটি বিখ্যাত কবিতা আছে ‘তালেব মাস্টার’।

দেশভাগের পর করটিয়া সা’দত কলেজে পড়ার সময় কবিতাটি লিখেছিলাম। নতুন সাহিত্য নামের একটি সাহিত্যপত্রে কবিতাটি প্রকাশিত হলো, খুব প্রশংসিত হলো। নানা সংকলনেও কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছে। (এই বলে তিনি কবিতাটি আবৃত্তি করতে লাগলেন)—‘তাল সোনাপুরের তালেব মাস্টার আমিঃ/আজ থেকে আরম্ভ করে ৪০ বছর দিবসযামী/যদিও করছি লেন নয় শিক্ষার দেন (মাফ করবেন। নাম শুনেই চিনবেন)।’ এই কবিতাটি ম্যাট্রিকে র্যাপিড রিডারে পড়ানো হতো। আমার লেখা গল্প ‘গলির ধারের ছেলেটি’ও ম্যাট্রিকে র্যাপিড রিডারে পাঠ্য ছিল। তারপর আমাদের বিখ্যাত চিত্রাভিনেতা সুভাষ দত্ত গল্পটিকে ‘ডুমুরের ফুল’ নামের ছবি আকারে বের করলেন। সেটিও দেশে-বিদেশে খুব প্রশংসিত হলো। আমিও দেখেছি। তবে নামটি আমার পছন্দ হয়নি। তাঁকে বললাম, ডুমুরের ফুল কেউ বোঝে না, ছবির নাম গলির ধারে ছেলেটি রাখলেই ভালো হতো। তখন বললেন, পরে ঠিক করে দেব। কিন্তু আর করেননি।

 

আপনার ছেলে-মেয়ে?

পাঁচজন। বড় ছেলে বিখ্যাত গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ক্যাটস আইয়ের মালিক, ছোট ছেলে তার অংশীদার। মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও কলেজে আছে। আমার মেয়ে তাসনিম সিদ্দিকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক।

 

তরুণদের জন্য কোনো উপদেশ?

বারবার চেষ্টা করতে হবে, বেশি করে লিখতে হবে। প্রাচীন ও বর্তমানে যাঁরা লিখছেন তাঁদের বই, দেশ-বিদেশের সাহিত্য পড়তে হবে।

 

(৭ মে ২০১৭ বারিধারা আবাসিক এলাকা, ঢাকা)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা