kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

আমি ছাড়া তিতাস হতো না

কলেজে পড়ার সময় ঋত্বিক ঘটকের লেখা পড়ে মানুষটিকে ভালোবেসে ফেললেন। স্বাধীনতার পরে কলকাতায় তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নিদারুণ কষ্ট করে তাঁকে দিয়ে তৈরি করালেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম ক্লাসিক ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। তারপর ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘মনের মানুষ’, ‘শঙ্খচিল’, ‘হঠাৎ বৃষ্টি’সহ আরো অনেক ছবিই প্রযোজনা করেছেন হাবিবুর রহমান খান। তাঁর সিনেমা জীবনের গল্প শুনেছেন গাউস রহমান পিয়াস। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২২ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



আমি ছাড়া তিতাস হতো না

ফিল্মের সঙ্গে কিভাবে জড়িয়ে পড়লেন?

ফিল্মের দিকে আগ্রহ ফিল্মের জন্য হয়নি, একজন ডিরেক্টরের ওপর আগ্রহ থেকে ফিল্মে এসেছি। তাঁর নাম ঋত্বিক ঘটক। ১৯৬৪-৬৫ সালে পত্রপত্রিকায় তাঁর কিছু লেখা পড়ে আগ্রহ তৈরি হলো। তখন কলেজে পড়ি।

বিজ্ঞাপন

তখন তো দেশটি পাকিস্তান, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনাও নেই। যোগাযোগের উপায় হলো ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখনো সক্রিয় রাজনীতি করি। একুশে ফেব্রুয়ারি পালন উপলক্ষে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা’ নামে আমাদের এক সংগঠনের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়, হেমন্ত মুখার্জিদের ঢাকায় আনার বন্দোবস্ত করলাম। হেমন্ত আসতে পারেননি, সত্যজিৎ, শ্যামল মিত্র এসেছেন। এই প্রোগ্রামে সত্যজিৎ রায়ের পিএস ছিলেন বরুণ বক্সি, এক পাগল লোক। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি সত্যজিৎ বাবুর ছবি করবেন?’ বললাম, সিনেমা একটি করতে পারি, যদি ঋত্বিক ঘটককে পাওয়া যায়। বললেন, ‘ও তাই?’

মাস দেড়েক পরে ফোন দিলেন, ‘ঋত্বিককে পেয়েছি, চলে আসেন। ’ ঋত্বিকের তখন থাকার জায়গা ছিল না। তিনি তাঁকে খুঁজে খুঁজে এক জায়গায় পেয়ে নিজের বাড়িতে উঠিয়েছেন। চলে গেলাম। ঋত্বিকের সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো। তাঁর ছবি দেখলাম, স্পেশালি অ্যারেঞ্জ করা হলো—‘সুবর্ণরেখা’।

 

এই প্রথম ঋত্বিকের ছবি দেখলেন?

হ্যাঁ। দেখার পর মনে হচ্ছিল, কোনো মানুষ এই ছবি বানায়নি। ছবিটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলাম। মানুষ ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করে না? তাঁকে ঠিক সেভাবে প্রণাম করলাম। বরুণ বক্সির বন্ধুর বাসায় বসে কথাবার্তা হচ্ছিল। তাঁকে বললাম, ‘আমি আপনার কোন সিনেমা করব?’ তিনি বললেন, ‘আমার তো তিতাস [তিতাস একটি নদীর নাম : অদ্বৈত মল্লবর্মণ] করার শখ। ’ বললাম, ডান। একটি ট্রাস্টের কাছে তিতাসের রাইটটি ছিল। তাতে ট্রাস্টি ছিলেন সত্যজিৎ রায়। যখন জানালাম, আমরা ঋত্বিক ঘটককে দিয়ে উপন্যাসটি অবলম্বনে ছবি করতে চাই, তখন সত্যজিত্দা বলেছেন, ‘ঋত্বিকবাবু যদি করেন, তাহলে এটি দেওয়া যেতে পারে। ’ আমরা ছবির রাইট পেলাম।

 

কত টাকায় নিলেন?

টাকা তো খুব বড় ব্যাপার না। ৫ বা ১০ হাজার—একজাক্টলি মনে নেই। ১৯৭২ সালের এপ্রিল কী মে মাসের ঘটনা। তারপর তাঁকে লোকেশন দেখানোর জন্য ঢাকায় নিয়ে এলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আরিচা, নারায়ণগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে লোকেশন দেখলেন। আমি বা বন্ধুবান্ধব যারা আমার সঙ্গে ছিল, আমরা যুদ্ধ করে একটি দেশ স্বাধীন করতে পারলে একটি সিনেমা করতে পারব না—এই স্পিরিটে ছবি করতে নেমেছিলাম। আমরা তো ক্যামেরাও দেখিনি কখনো, ৩৫ মিলিমিটার ক্যামেরা কী জানি না, অথচ সিনেমা করতে নেমেছি। আরো সমস্যা হলো, তিনি তখন একটু অগোছালো ছিলেন। আমরা যেখানে সিনেমার ‘স’-ও জানি না, এই অগোছালো লোককে দিয়ে সিনেমা করা খুব কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল, আমরা এটি করব।

 

বাজেট কী রকম ছিল?

কোনো বাজেট নিয়ে নামিনি। সিনেমা করব—এই হলো কথা। টাকা যা লাগে, তাই দেব—এই স্পিরিটে ছবিটি করতে গেলাম। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছি। ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই শুটিং শুরু হয়েছে, ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই রিলিজ হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিটি দিন ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে এক খাটে ঘুমিয়েছি, যতবার ইন্ডিয়ায় গেছেন, সঙ্গে গেছি। ওখানেও সঙ্গে থাকি, এক কাজে মুম্বাই গেলেন, তাঁর সঙ্গে আমিও গেলাম। তাঁর তো ঠিক নেই, খেয়ালি মানুষ তো...সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকতাম।

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন দেশে শুটিংয়ের জোগাড়-যন্ত্র করা তো খুব কঠিন ছিল! 

১৯৭২ সালে দেশে কিন্তু কিচ্ছু নেই। শুটিং করতে যাব, আমাদের একটি জেনারেটর দরকার। এলিফেন্ট রোডে তখন একটি পাওয়ার স্টেশন ছিল। সেখানে একটি জেনারেটর ছিল। সেটি আবার বঙ্গভবনের জন্য রাখা। জেনারেটরের দায়িত্বে যে অফিসার, তাঁর নাম জামান, তাঁকে চিনতাম। তাঁর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘এটি বঙ্গভবনের স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর। এটি আপনাকে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। ’ তাঁকে শুধু একটি কথা বললাম, জামান ভাই, আপনার ক্ষমতা নেই, কিন্তু আমার আছে। আমি জেনারেটর নিয়ে যাব। চার্জে ছিলেন একজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। তাঁকে বললাম, আমার তো এটা লাগবে। নিয়ে যাব। এখন দুটি শর্তে হতে পারে। এক, আপনার পায়ে গুলি করব অথবা চেয়ারে বেঁধে জেনারেটর নিয়ে যাব। কোনটি চান? তিনি কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। পরে বললেন, ‘তাহলে বেঁধেই রাখেন। ’ তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, একটি অ্যাপ্লিকেশন লিখে আমার ড্রয়ারে ফেলে যান। ধরা না পড়লে রেগুলারাইজ করে দেব। ধরা পড়লে জানি না। কারণ আমি তো আপনাকে পারমিশন দিইনি। যখন ফেরত দিয়ে যাবেন, পারমিশন দিয়ে দেব। ’ আসলে তাঁরও তো চাকরি। আর আমি তো একা নই। সঙ্গে সিনেমার ফোর্স আছে। মিস্ত্রি, জেনারেটর অপারেটর সবাইকে ডেকে আনা হলো। ওরা তো খুব খুশি, শুটিং করতে যাবে। ৫০০ মণের নৌকায় জেনারেটর তুললাম। একটি দোতলা লঞ্চে ইউনিট থাকত। লঞ্চের সঙ্গে জেনারেটর বেঁধে ডেমরা ঘাট দিয়ে আমরা চলে গেলাম।

শুটিংয়ের কোনো স্মৃতি?

বৃষ্টির দৃশ্য ধারণ করার জন্য আমাদের মেকানিক্যাল বৃষ্টি লাগবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিসে গিয়ে বললাম, আপনার দমকলের ইঞ্জিনগুলো আমার লাগবে। অফিসার বললেন, ‘আমার দুটি ইঞ্জিন আছে, আপনি নিয়ে গেলে আগুন লাগলে কী উপায় হবে?’ বললাম, এখানে আগুন লাগলে শহরের কিছু অংশ হয়তো পুড়ে যাবে; কিন্তু এই সিনেমাটি না হলে তো বিরাট সমস্যা [হাসি]। আমার সঙ্গে সরকারের একটি চিঠি ছিল। তথ্যমন্ত্রী মিজান ভাই [মিজানুর রহমান চৌধুরী] সই করে দিয়েছিলেন। তাতে লেখা—‘এই ছবিটিকে যেকোনো রকমের সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করা গেল। ’ ইঞ্জিন দুটি নিয়ে গেলাম। ফায়ারম্যানরাও খুব খুশি, শুটিং দেখতে যাবে। ওগুলো নিয়ে ওখানে বৃষ্টির সিন করলাম। মজার ব্যাপার হলো, এত সুন্দর ন্যাচারাল বৃষ্টি পেলাম, সেটির সঙ্গে সেই ইঞ্জিন দুটি থেকে অল্প বৃষ্টি পাঞ্চ করা হলো। তিতাসের বৃষ্টি সম্পর্কে অনেক প্রবন্ধ লেখা হয়েছে—এত ভালো বৃষ্টি কোথাও দেখা যায়নি। সিনেমায় এত ভালো বৃষ্টি হয় না। এমনকি শামসুর রাহমান তিতাসের বৃষ্টির রূপ নিয়ে একটি সাব-এডিটোরিয়ালও লিখেছিলেন। ছবিটি করার জন্য কোনো বাধা, কোনো কিছুই মানিনি। না হলে এই ছবি হতো না।

 

ঋত্বিক ঘটক বোধ হয় তাঁর জীবনে এত ফ্রি-হ্যান্ডে কোনো ছবি...

যাওয়ার আগে প্রেস কনফারেন্সে সেটি বলে গেছেন তিনি। ইত্তেফাক সেই স্টেটমেন্ট ছাপিয়েছিল, আমি জীবনে যে কয়টি সিনেমা করেছি, এ রকম প্রডিউসার আর পাইনি। তাঁর সঙ্গে আমার লাভ অ্যান্ড হেইট সম্পর্ক ছিল। যেহেতু তিনি একটু অগোছালো আর আমার তখন তরুণ বয়স, এই ২৫-২৬, কাহাতক এগুলো সহ্য করা যায়? চিল্লাচিল্লি করতাম। কিন্তু রেসপেক্টের জায়গাটি এ রকম ছিল যে প্রডিউসার হয়েও নিজে তাঁর খাবার বহন করতাম। যেখানে তিনি ক্যাম্পে থাকতেন, নিয়ে যেতাম। আউটডোরে শুটিং হতো, আমি ছাড়া অন্য কেউ এক বেলার খাবারও তাঁকে দিতে পারত না। দিস ইজ রেসপেক্ট অ্যান্ড লাভ। রিয়েল সেন্সে এখানে আমি প্রডিউসার, ফাইন্যান্সার নই। ভারতীয় দূতাবাসে একটি আলোচনা সভায় বলেছিলাম, লুক হিয়ার, ঋত্বিক না হলে যেমন তিতাস হতো না, ঠিক তেমনি আমি না হলে তিতাস হতো না। আমরা একে অপরের সম্পূরক। সত্যি তাই। আমি ছাড়া তিতাস হতো না।

 

তাঁর তো ওই সময়েই অ্যালকোহলে আসক্তি ছিল।

আসলে নেশা নয়, তিনি একটি অসুখে ভুগতেন, যার ফলে হি ওয়াজ অ্যালকোহলিক। দ্যাট ওয়াজ অ্যা ডিজিজ। অ্যালকোহল ছাড়া বেশিক্ষণ থাকতে পারতেন না। একটু লিমিট করে, কোটা করে, তাঁকে দিয়ে কাজটি করিয়েছি।

 

ঋত্বিকের এ অবস্থায় তাঁর সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে আপনাকে কেউ নিরুৎসাহিত করেনি?

আমাকে নিরুৎসাহিত করবেটা কে? আমি কেন ছবিটি তাঁর জন্য করলাম? কারণ তিনিই সিনেমার একমাত্র মানুষ, যিনি কোনো দিনও বাংলা ভাগ ও দেশ ভাগ মানতে পারেননি। আমিও তো ওই স্কুলেরই ছাত্র। আমারও মনে হয়েছে, আমার দেশটি ভাগ হলো কেন? সকালে যার সঙ্গে খেলতাম, তিন দিন পরে দেখি সে নেই, চলে গেছে। কেন গেল? এটি তো তার বাবারও দেশ। আমি যে রয়ে গেছি, আছি কী কারণে? বাবার দেশ, খান্দানি ভিটা। তারও তো তাই। ও কেন যাবে? পূজা-ঈদ সব তো একসঙ্গে করতাম। মহল্লায় কোনো ভাগ ছিল না, পূজার সময় মা-বাবাকে নতুন জামা-কাপড় দিতে বাধ্য করতাম। এমন একটি পরিবেশে থেকে...আমার দারুণ কষ্ট হয়। কেন গেল? কেন? অন্য ধর্ম হওয়ার কারণে সে দেশছাড়া হয়ে গেল? এটি মেনে নিতে পারিনি, এখনো পারি না।  

  

তাঁর কাজের পদ্ধতি?

কলাকুশলী, অভিনেতা—সব তিনি দেখে দেখে নিয়েছেন। আমরা তাঁকে সাহায্য করেছি। যে আর্টিস্ট পার্ট করবেন, তাঁকে তাঁর কাছে নিয়েছি। দেখিয়েছি, এই যে আর্টিস্ট। বেবি [ইসলাম] ভাইকে ক্যামেরাম্যান হিসেবে আমরাই নিয়ে গেছি। স্ক্রিপ্ট ফলো করে তিনি কাজ করতেন। আবার অন দ্য স্পট স্ক্রিপ্টে অনেক চেঞ্জও করতেন। কাজের সময় তিনি অ্যালকোহলিক থাকতেন না। ক্যামেরা ধরার পরে...এমনি যদি একটুখানি কাঁপতেন...যেই ক্যামেরাটি ধরতেন, যখনই ‘ক্যামেরা’ বলতেন...একদম স্বাভাবিক। আর আমরাও তো তাঁকে অ্যালকোহলিক হতে দিইনি। না খেলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে বলে দুপুরে একটু হুইস্কি দিতাম, রাতের শুটিং শেষে আবার একটু হুইস্কি দিতাম। তিনি এমন একজন ডিরেক্টর, যিনি আমাকে বলেছেন, ‘সিনেমা বানাতে কোনো আর্টিস্ট দরকার হয় না। ’ বললাম, এ আপনি কী বললেন? তিনি বললেন, ‘ইংরেজি বোঝ? ফিল্মের ডিরেক্টর হিসেবে আই নিড সাম প্রপস...যেমন এই টেবিলটি দরকার, তেমনি আই নিড সাম লাইভ মুভিং প্রপার্টি। ’ আর্টিস্টকে তিনি ‘লাইভ মুভিং প্রপার্টি’ বলতেন। একদিন তর্ক করেছিলাম, আপনি এ কী বলেন—আর্টিস্ট লাইভ মুভিং প্রপার্টি? সেদিন উত্তর দেননি। পর দিন শুটিং ছিল। ফরিদ আলী আর রোজী [আফসারী]...সব সময় তো শুটিংয়ে থাকতাম, দেখলাম, তিনি জাস্ট ক্লোজআপ শট নিলেন, জাস্ট ক্যামেরা নিয়ে ‘এই রোজী তুই তাকা তো এদিকে, একটু টিল্টআপ কর, মানে ওপরের দিকে তাকা। আচ্ছা টিল্টডাউন, আচ্ছা রাইটে লুক দে তো, আচ্ছা লেফটে একটা লুক দে। ওকে। ’ এরপর আমাকে বললেন, ‘ওই, এখানে আর্টিস্ট কী করল? আমি যা বলেছি, তার বাইরে এক ফোঁটা কিছু করতে পেরেছে?’ [হাসি] বললাম, দাদা এটা ঠিক নয়। তারপর বললেন, ‘না, দেয়ার আর ফিউ আর্টিস্ট ইন দ্য হোল ওয়ার্ল্ড, যাঁরা ফিল্মের আর্টিস্ট। ’ অনেক গভীরভাবে তিনি এটি বলেছেন। মঞ্চ তো আলাদা। সেখানে আর্টিস্ট ডায়ালগ বা অভিনয় ডেলিভারি দিয়ে দিলেন, শেষ। নতুন করে কিছু আর করা যায় না। কিন্তু সিনেমায় তো ‘কাট’ মানে আবার কর, অভিনয়ের অনেক সুযোগ থাকে। সে জন্য তিনি এমন একটি ধারণা করতেন। হতোও তাই, তার বাইরে তো কিছু হতো না।

আউটডোর কোথায় হয়েছে? ইনডোর? 

অনেক জায়গায় আউটডোর হয়েছে। তিতাসের পারে প্রায় ২৫ শতাংশ শুটিং হয়েছে। সেখানে আমরা সেট করে শুটিং করেছি। একটি সুবিধা ছিল, আমাদের কাছে তো একটি বড় জেনারেটর ছিল, সেটি লঞ্চের সঙ্গে বাঁধা থাকত। তখন বর্ষাকাল তো, পানি অনেক। কোনো অসুবিধা ছিল না। যেখানে খুশি জেনারেটর লাগিয়ে নিতাম। লঞ্চে অবশ্য অনেক কষ্ট করে শুটিং ইউনিট থাকত। এফডিসিতে তিন-চার দিন ইনডোর শুটিং হয়েছে। জেলেপাড়ার শুটিং দুই জায়গায় হয়েছে। কিছু আরিচায়, কিছু তিতাসের ঘাটে।

 

টেকনিক্যাল যন্ত্রপাতি সব এফডিসি থেকে নেওয়া?

সব কিছু। এই ছবিতে একমাত্র ঋত্বিক ঘটক ছাড়া বাইরের কেউ কাজ করেননি। আর ওই [ওস্তাদ] বাহাদুর হোসেন খান ছাড়া সব কিন্তু বাংলাদেশের। তিনিও তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার। আমি তো তাঁকে আনব না, তিনি বললেন, ‘কেন তুই আমাকে নিবি না? তোদের বাড়িও তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিল। ’ তিনি তো ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ভাস্তে, তিনি মিউজিক করেছেন। ক্যামেরা, এডিটিং, সাউন্ড—যাই বলেন, সবই তো এখানকার। তিতাস একটি কমপ্লিট বাংলাদেশি ফিল্ম। খালি ডিরেক্টর কলকাতা থেকে এসেছিলেন। এটি কোনোভাবেই যৌথ প্রযোজনার ছবি নয়। বাইরের নানা ওয়েবসাইটে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশ-ভারতের ছবি। ওরা দেয়, আমরা তো কিছু করতে পারি না। ডিএফআইয়ের সাইটেও আছে, ওরা রিস্টোর করেছে। সেখানেও তো আমার নেগেটিভ নিয়েই করেছে।

 

লোকে যে বলে ঋত্বিক ছবি শেষ করেননি? এডিট করেননি?

এগুলো মিথ, যার যা খুশি বানিয়ে বলে। তিনি শুটিং, ডাবিং—সব কিছুতে ছিলেন। এডিটিংয়ের শেষ পর‌্যায়ে অসুস্থ হয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বশির [হোসেন] ভাইকে বললেন, ‘এই বাকিটুকু কেটেকুটে ছবিটিকে রিলিজ করে দেবেন। ’ বললাম, আর কেউ আপনার ছবিতে হাত দেবে না। লিখে দেন। তিনি এডিটরকে লিখিত পারমিশন দিয়ে গিয়েছেন। সুস্থ হয়ে ফিরে এসে দু-তিনটি শট অ্যাডজাস্ট করা ছাড়া আর কিছুই করেননি। অনেকে মনে করেন, তিনি ছিলেন না, এডিট করেননি। সব বাজে কথা, বোগাস। এখন আমরা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ যেভাবে দেখি, সেটি তাঁরই পরিকল্পনায়, ঋত্বিকেরই হাতে তৈরি। রিলিজেও কোনো জটিলতা হয়নি। ছবিটি অল্প কয়টি হলে রিলিজ হয়েছে। কারণ কেউ দেখতে চায়নি। কী করব? নাচ নেই, গান নেই।

 

তাঁর সঙ্গে আর কোনো ছবি করার পরিকল্পনা ছিল?

ছিল কিন্তু তিনি তো বেশি দিন বাঁচলেন না। তিনি আমার সঙ্গে অনেক কিছু শেয়ার করতেন। আমাকে গালি দিতেন, আদরও করতেন। একদিন বললেন, ‘দেখ, তোর অনেক টাকার ক্ষতি করে ফেললাম। আচ্ছা, আমি তোকে একটি কমার্শিয়াল ছবির স্ক্রিপ্ট লিখে দেব। ’ বললাম, আপনি সেই ধরনের ছবির স্ক্রিপ্ট লিখতে পারবেন? বললেন, ‘কমার্শিয়াল ছবির স্ক্রিপ্ট তো বাঁ পা দিয়ে লেখা যায় [হাসি]। ডান পা লাগে না, হাতও লাগে না। ’ এরপর বললেন, “মধুমতির স্ক্রিপ্ট তো আমার করা রে, ওই যে বিমল রায়ের ‘মধুমতি’। ” ঋষিকেশ মুখার্জির মুসাফিরের স্ক্রিপ্টও তাঁর করা। তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। তিতাস তখন রিলিজ হয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘ও, তুই আইছোস?’ বললাম, একটু মাল দিমু নাকি? বললেন, ‘খুব ভালো হয়, দে। ’

 

তিতাস করতে কত খরচ হয়েছিল?

আট লাখ ২৪ হাজার টাকা। তখন এক লাখ টাকায় একটি সিনেমা বানাত। আমার আট গুণ খরচ হয়েছিল। ফেরত এসেছিল এক লাখ ২৩ হাজার টাকা।

 

তিতাসের জন্য ঋত্বিক কত টাকা পেয়েছিলেন?

ঋত্বিকের কাছে টাকা কোনো ব্যাপার ছিল না। তিনি সিনেমাটি তৈরি করার জন্য কাজ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে নামমাত্র সম্মানী দিতে হয়েছে। ১৫ থেকে ২০ হাজার, কোনো টাকা?

 

তিতাসের পরে তো ছবি থেকে সরে গেলেন?

না, মাঝখানে কিছুদিন অফ ছিলাম। তার পর আবার ছবি করা শুরু করলাম। ২০ বছর পরে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ করলাম। মাঝে অনেক ছবি করেছি। সব মিলিয়ে ২৮-২৯টি। তিতাসের পরে ‘সেয়ানা’ করেছি। পরিচালক ছিলেন ফখরুল হাসান বৈরাগী, প্রবীর মিত্র হিরো। তিতাসেও তিনি হিরো ছিলেন। তিতাস তাঁর দ্বিতীয় ছবি। ‘সেয়ানা’ ব্যবসা সফল হয়নি, টাকা উঠে এসেছে মাত্র। আমার সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবি ‘মিন্টু আমার নাম’। পরিচালক ছিল এ জে মিন্টু। তবে ‘মিন্টু আমার নাম’ একটা হিন্দি ছবি কপি করা [হাসি]। এই ছবির মাধ্যমেই এ জে মিন্টু পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তিতাসে সে ছিল সহকারী পরিচালক। সে আমার ‘প্রতিজ্ঞা’ও করেছে। জহিরুল হক করেছে ‘প্রাণ সজনী’। ‘তিতাস’ ওয়াজ মাই কমিটমেন্ট। এ কমিটমেন্ট পূরণ হওয়ার পরে ছবিতে রয়ে গেলাম। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘মনের মানুষ’, ‘শঙ্খচিল’ করলাম।

 

পদ্মা নদীর মাঝি কিভাবে হলো?

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের টাকায় গৌতম ঘোষ ছবিটি করবে শুনেছিলাম। কলকাতা গেলাম। তার সঙ্গে দেখা হলো। বললাম, দেখো, পদ্মা নদীর মাঝি করতে গেলে পদ্মা নদীটি লাগবে। গঙ্গায় এই ছবি হবে না। যদি ছবিটি করতে চাও, তাহলে ঢাকায় আমাকে খুঁজো। এই বলে চলে এলাম। ছবিটি করার জন্য সরকার যখন পারমিশন দিল, সে আমাকে ঢাকায় খুঁজে বের করল। এটি যৌথ প্রযোজনার ছবি। সে দেশের সরকার তো পুরো টাকা দেয়নি, ৫০ শতাংশ টাকা আমি দিয়েছি। এখানকার আর্টিস্ট, টেকনিশিয়ানরাও ছিল। ছবির বেশির ভাগ শুটিংও এখানে হয়েছে। যেখানে তিতাসের শুটিং হয়েছে, সেই আরিচায়, চাঁদপুরে, আমাদের বিক্রমপুরে শুটিং হয়েছে। শুটিং হয়েছে ১৯৯১ সালে, রিলিজ হয়েছে ১৯৯২ সালে। এটির মাধ্যমে ২০ বছর পরে আমি বাংলা সাহিত্যের আরেকটি ক্লাসিক উপন্যাসের চিত্রায়ণে জড়িত হলাম।

 

আর হঠাৎ বৃষ্টি?

বাসু চ্যাটার্জি আজীবন হিন্দি ছবি করেছেন। জীবনের প্রথম তিনি একটি বাংলা ছবি করবেন। কলকাতায় সারেগামা নামের যে কম্পানি ছিল, সেখানে আমার এক ফ্রেন্ড ছিল, সে বলল, এটি কো-প্রোডাকশন করা যায়? ওরা বলল, তাহলে পয়সা কম লাগবে। সে জন্য তারা বাসুদাকে ঢাকায় নিয়ে এলো। আমার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। বাসুদাকে বললাম, বাসুদা, গল্পটি একটু বলেন। তিনি বললেন, ‘আমি না, সিনেমার গল্প বলতে পারি না। ’ বললাম, দুই লাইনে বলতে পারেন? ‘পারি—একটি ছেলে আর একটি মেয়ে, কেউ কাউকে দেখে না; কিন্তু তাদের প্রেম হয়। লাস্ট মুহূর্তে তাদের মিল হয়। ’ বললাম, [টেবিল থাপড়ে] এটি করব। ব্যাপারটি হলো—তাঁর মিষ্টি হাত। কমার্শিয়াল ছবি বানানোর জন্য বাসু চ্যাটার্জি ইজ অ্যা ভেরি গুড ফিল্ম মেকার। তাঁর আইডিয়া তো বুঝতে পারলাম। পুরো ছবির পরতে পরতে প্রেম। প্রেমের ছবি কখনো ফেল করবে না। আমি কিন্তু হিসাব করে ছবিটি টিভিতে রিলিজ করেছিলাম। ফেরদৌস নতুন ছেলে, কলকাতার মেয়ে প্রিয়াংকাকেও কেউ চেনে না। আমার এই ছবি ট্রেলর হিসেবে টিভিতে যেতে হবে। ছবিটি টিভিতে চললে পরে হলে চলবে, যা হিসাব করেছিলাম, সত্যি সত্যি তাই হয়েছে। ঈদের দিন ছবিটি চালিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতে এই প্রথম কোনো ছবি সিনেমা হলে না দেখিয়ে টিভিতে দেখিয়েছে। স্যাটেলাইট চ্যানেলে নয়, এটি বিটিভিতে রিলিজ হয়েছিল। আমার হিসাব ছিল, টিভিতে বিশেষ করে মহিলা দর্শকরা ছবিটি যখন দেখতে বসবেন, অ্যাড তো চলবে। অ্যাডের বিরক্তি ছাড়াও হয়তো কোনো মেহমান এলে তাঁকে সময় দিতে হবে। ফলে তাঁরা ছবিটি মিস করবেন। পরে তিনি ছবিটি হলে গিয়ে দেখবেন। সত্যিই তাই হয়েছে। হলে যাঁরা ছবি দেখছিলেন, তাঁদের জিজ্ঞেস করেছি, মেয়েদের জিজ্ঞেস করেছি, কেন ছবিটি দেখতে এসেছ? মেহমান এসেছিল? তারা বলেছে, হ্যাঁ, চা দিতে গিয়ে বাকিটা দেখতে পারিনি। আসলে দর্শকদের শেষটুকু দেখতে হবে, বাকিটুকু দেখতে হবে—এই ট্র্যাপে ফেলেছি। এর গল্প তো খুব সুন্দর, খুব মসৃণ। আমাদের সবার জীবনেই প্রেম আছে, সবারই ভালো লাগা আছে।

 

তখন তো এটি একেবারেই অন্য রকমের ছবি ছিল। বিরাট রিস্ক নিয়েছিলেন?

সিনেমায় বহু এক্সপেরিমেন্ট করেছি। যৌথ প্রযোজনার একটি ছবি করেছিলাম ‘চুড়িওয়ালা’। স্ক্রিপ্ট রাইটারের সঙ্গে একটু কথা বলে সত্যদাকে [সত্য সাহা] বললাম, কতগুলো সিচুয়েশন দিচ্ছি, সেগুলোর ওপরে গান রেডি করেন। আমাকে গান শোনাবেন, গান পছন্দ হলে সিনেমা হবে, না হলে নয়। গাজী মাজহারুল আনোয়ার গান লিখলেন। সত্যদা আমাকে একসময় বলেও বসলেন, ‘ডিরেক্টর নেই, গান করতে হচ্ছে। এটি কোনো কথা?’ বললাম, সত্যদা আপনি যদি সিনেমা বন্ধ করে দিতে চান, দেন। গান ফাইনাল না হওয়া পর্যন্ত ডিরেক্টর অ্যাপয়েন্ট করব না। আমার হিসাব ছিল, বাংলা ছবিকে মিউজিক ৮০ শতাংশ টেনে নিয়ে যায়। তার সঙ্গে একটু প্রেম থাকলে গল্প তো চলবেই। সে হিসাবেই এক্সপেরিমেন্টটি করলাম। গান হলো, খুব ভালো লাগল। মনে হলো, এবার ছবিটি চলবেই। দুদিন পরে কিরণকে [শাহ আলম কিরণ] বললাম, কিরণ যাও, গান হচ্ছে, সত্যদার সঙ্গে বসো। সে বলল, ‘কিসের গান?’ সিনেমার গান। যাও করো। ছবিটি হিট। পয়সা ফেরত পেয়েছি, লাভ হয়েছে। ‘প্রাণ সজনী’ও আমার এক্সপেরিমেন্ট। জহিরুল হক গল্প শোনাতে এলো। দুজনে বসলাম। সে বলল, এই গল্পটি শোনেন—একটা মেয়ে গ্রামে একা একা থাকে। দা নিয়ে রাতে ঘুমায়। মেম্বার, মাতব্বররা তার মাকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিল। না পেরে তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ওর বাবা ‘চোর’ অপবাদ নিয়ে গ্রাম থেকে চলে এসে শহরে থাকে। মাঝে মাঝে যখন গ্রামে যায়, নৌকাওয়ালারা তাকে পার করে না। বলে, চোর রে নিমু না। সে নদী সাঁতরে ওই পারে গিয়ে মেয়েকে দেখতে যায়। এটুকু শুনেই বললাম, সিনেমা শুরু করো। আর কিছু লাগবে না। আর গল্প শুনিনি। ‘কি জাদু করিলা পিরিতি শিখাইলা’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’সহ এই ছবির সব গান সুপারহিট।

 

শঙ্খচিল?

পদ্মা নদীর পর তো গৌতমের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। মাঝে আমরা ‘মনের মানুষ’ করলাম। পাঁচ বছর পর ‘শঙ্খচিল’। ইচ্ছা ছিল, জীবনে অন্তত একটি হলেও দেশ ভাগের কাহিনী নিয়ে ছবি করব। ছবিটি দেশ ভাগ নিয়ে হয়নি, কিন্তু এতে প্রেক্ষাপটটি এসেছে। তবে এটি শুধু ফ্লপ করেনি, সুপার ফ্লপ করেছে। দুই লাখ, তিন লাখ টাকাও ব্যবসা করেনি। অথচ টিভি, প্রিন্ট সব মিডিয়া একে সাপোর্ট দিয়েছে, সব মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে। এত ক্যাম্পেইন আমার অন্য কোনো সিনেমার জন্য হয়নি, যেটি শঙ্খচিলের জন্য হয়েছে। তার পরও গৌতমের সব ছবিতেই আমি হ্যাপি। ও সিনেমা নিবেদিতপ্রাণ। হি ইজ অ্যা জিনিয়াস। ওর একেকটি ছবির একেক ব্যাখ্যা। শঙ্খচিলের ক্যানভাস অনেক বড়, এই ছবি তো প্রেজেন্ট বর্ডার সিচুয়েশন নিয়ে করা। ওখানে [পশ্চিম বাংলা] মোটামুটি চলেছে, কিন্তু এখানে একেবারে ফ্লপ, একেবারে নেগেটিভ রেজাল্ট। তবে এখানে যাঁরা শিক্ষিত ভদ্রলোক, যাঁদের সিনেমায় বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট আছে, অন্তত তাঁদের তো এই সিনেমা না দেখার কোনো কারণ নেই। এখানে অবশ্য কোনো সিনেমাই চলে না।                  

শ্রুতলিখন : ওমর শাহেদ

[ ২৬ মে ২০১৬, গুলশান-২, ঢাকা]



সাতদিনের সেরা