শুধু বাংলাদেশ নয়, ব্রিটিশ ভারতেরও প্রথম জেলা যশোর। ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে এর গোড়াপত্তন। মুক্তিযুদ্ধে শত্রুমুক্ত হওয়া প্রথম জেলাও যশোর। তবে ঐতিহ্য থাকলেও ক্রীড়াঙ্গনে অনেক পিছিয়ে তারা। নানা দ্বন্দ্ব আর টানাপড়েনে টানা তিন বছর জেলা ক্রীড়া সংস্থা কোনো লিগই আয়োজন করেনি। তিন-তিনটি বছর খেলা না হলে তো ক্রীড়াঙ্গনে স্থবিরতা নেমে আসবেই। সেটা এসেছেও যশোরে। তবে আশার খবর, মেঘ ফুঁড়ে দেখা গেছে সূর্যের ঝিলিক। তিন বছর পর আবারও মাঠে গড়িয়েছে খেলা। ক্রিকেট, কাবাডি, হ্যান্ডবল, ভলিবল, হকিসহ সব লিগই হয়েছে এ বছর। কেন এত দিন ঘুমিয়ে ছিল এই অঞ্চলের ক্রীড়াঙ্গন? জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব কবির উত্তরটা দিলেন এভাবে, 'মামলার জন্যই এই হাল। আমাদের প্যানেল বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল ২০১২ সালের ১৫ জুন। কিন্তু পেছন থেকে বিপক্ষের একজন কলকাঠি নেড়ে মামলা করিয়েছিলেন রিয়াজুল ইসলাম রিয়াল নামের এক কাউন্সিলরকে দিয়ে। এর সুরাহা হয়েছে জাতীয় স্পোর্টস কাউন্সিলে। তারা আমাদের ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়েছে এ বছরের ২২ এপ্রিল। দায়িত্ব পাওয়ার পরই সব ধরনের খেলা চালু করেছি আমরা।' আট দল নিয়ে প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট মাঠে গড়িয়েছে ১৯ ডিসেম্বর। দীর্ঘদিন পর খেলা বলে ১৮ ডিসেম্বর জমকালো উদ্বোধন হয়েছে টুর্নামেন্টটার। ১০ জানুয়ারি থেকে ৩২ দল নিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় বিভাগ। যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ আফিলউদ্দিন পৃষ্ঠপোষকতা করছেন বলে টুর্নামেন্টটা হবে ঝিকরগাছায়। এর পরই শুরু হবে প্রথম বিভাগ লিগ। খেলা চালু হলেও যশোরের ক্রিকেটে বড় সমস্যা রয়ে গেছে এখনো। জেলা দলের প্রথম একাদশের দশজনেরও বেশি ক্রিকেটার নিষিদ্ধ বিভিন্ন মেয়াদে। জাতীয় দলের ক্রিকেটার সৈয়দ রাসেলও আছেন এ তালিকায়। থাকতে পারতেন জাতীয় দলের হয়ে একসময় খেলা আরেক ক্রিকেটার তুষার ইমরানও। তবে যে কারণে এই নিষেধাজ্ঞা সে সময় ইনজুরিতে থাকায় বেঁচে যান তুষার। ঝামেলাটা কী? তুষার ইমরান জানালেন, 'এ বছরের জুনে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে নড়াইলের সঙ্গে ম্যাচ ছিল আমাদের। খেলোয়াড়রা তাদের প্রাপ্য ম্যাচের আগের ও পরের ডিএ (দৈনিক ভাতা) দাবি করেছিল। টাকাটা দাবি অনুযায়ী না দেওয়াতেই ঝামেলার শুরু। তবে আমাদেরও ভুল ছিল নড়াইলে খেলতে না গিয়ে। আমরা যাব না বুঝতে পেরে রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়দের নিয়ে নড়াইলে খেলতে যায় জেলা দল। এর পরই কারো দুই বছর, কারো তিন বছর তো কারো পাঁচ বছর নিষেধাজ্ঞা দেয় জেলা ক্রীড়া সংস্থা।' যে ম্যাচটা নিয়ে ঝামেলা বৃষ্টির জন্য সেটাই কিন্তু মাঠে গড়ায়নি। যশোর আর নড়াইল তাই ভাগাভাগি করে নেয় ম্যাচের পয়েন্ট। তবে সিনিয়র খেলোয়াড়ররা বিদ্রোহ করে নড়াইল না যাওয়ায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় সৈয়দ রাসেল, তুষার ইমরান, মুরাদ, নয়ন, মাসুদ, তারেকসহ ১৩ জনকে। তাঁদের প্রায় সবাই এখন নিষিদ্ধ বিভিন্ন মেয়াদে। খেলোয়াড়দের শাস্তি দেওয়ার পর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব কবিরের অঙ্গীকার, 'ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটে শৃঙ্খলাটাই আগে। প্রতিটা ম্যাচে ৩২ থেকে ৩৪ হাজার টাকা খেলোয়াড়দের দেই আমরা। তার পরও সমস্যা হলে কথা বলতে পারে আমার কিংবা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে। সেটা না করে মাঠে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত মানা যায় না কোনোভাবে।' ঝামেলা আছে যশোর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসাদুজ্জামান মিঠু আর সাধারণ সম্পাদক এ বি এম আখতারুজ্জামানেরও। তাঁদেরই দ্বন্দ্বে গত বছরের প্রথম বিভাগের ফাইনালের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ছয় মাস! এবারের দ্বিতীয় বিভাগেও দুই কর্তার পছন্দ-অপছন্দে শেষ পর্যন্ত নাম লিখিয়েও সরে আসে ছয়টি দল। তাই ২৪ ক্লাবের টুর্নামেন্ট হয়ে পড়ে ১৮ দলের। আখতারুজ্জামানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি নজরুল ইসলাম রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করেই অভিযোগ তুলেছিলেন, 'নিজের পছন্দের ক্লাবকে সুবিধা দিতে সভাপতি গ্রুপ করে নিজেই সূচি তৈরি করেছেন তিনি।' দ্বন্দ্বের মাঝেও ফুটবলটা একেবারে স্থবির হয়ে যায়নি। ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী এই জেলায় প্রথম আর দ্বিতীয় বিভাগ লিগ একেবারে থেমে থাকেনি। এর পাশাপাশি বলতে হয় শামস-উল হুদা টুর্নামেন্টের কথাও। গত কয়েক বছর নিয়মিতই হচ্ছে এ টুর্নামেন্ট। জনপ্রিয় এই আয়োজনে শামিল ঢাকার আবাহনী, মোহামেডানের মতো ক্লাবগুলোও। নভেম্বরে মাঠে গড়ানো এবারের টুর্নামেন্টেও অংশ নিয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব দুটি। ১-০ গোলে চুয়াডাঙ্গাকে হারিয়ে এবারের শিরোপা জিতেছে চারজন নাইজেরিয়ান নিয়ে খেলা ফরিদপুর। এখানকার লিগেও নিয়ম আছে বিদেশি ফুটবলার খেলানোর। মঈন ক্লাব, শৌখিন ক্লাবের মতো আরো অনেক দল আফ্রিকান কজনকে এনে বাড়িয়েও দেয় লিগের আমেজ। এর পরও আগের মতো জাতীয় দলে যশোরের ফুটবলারদের দাপট নেই। সাফল্য নেই ছেলেদের ফুটবলেও। সেই ১৯৬৯ সালে ইস্ট পাকিস্তান ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্সআপ হয়েছিল যশোর। এরপর ১৯৭৬ সালে হয়েছিল শেরে বাংলা কাপ বা জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। এরপর আর তেমন কিছু করতে পারেনি তারা। তবে গতবার মেয়েদের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে পৌঁছেছিল যশোর জেলা দল। এই জেলার কয়েকজন ফুটবলার খেলছেন জাতীয় দলেও। গত ২৪ অক্টোবরে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার প্রীতি ম্যাচ নতুন করে জাগাতে পারে এই জেলার ফুটবলকে। এবার বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দেখতেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল যশোরের মানুষ। ফুটবলে না হলেও ক্রিকেটে অবশ্য বিদেশি দল এসেছিল এখানে। ২০০১ সালে খেলে গেছে ইংল্যান্ডের এমসিসি। ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা 'এ' দল যশোর স্টেডিয়ামে খেলেছে। ২০০৯ সালে খেলেছে শ্রীলঙ্কা ও মালেশিয়ার অনূর্ধ্ব দল। এ স্টেডিয়ামটি তৈরি হয় ১৯৬১ সালে। তখনকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল কুদ্দুস এটা তৈরি করতে পেরেছিলেন শামস-উল হুদা, সুধীর ঘোষ, চিত্ত বাবু, একরামুল হক, বজলুল রহমান, চিত্ত শাহ, আলমগীর সিদ্দিকদের উদ্যোগে। জলকলের মাঠে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন গভর্নর জাকির হোসেন। স্টেডিয়াম ছাড়া যশোরের মাঠগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুলিশ লাইন মাঠ, উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠ, ব্রামপুর মাঠ, টেকনিক্যাল কলেজ মাঠ, জেলা স্কুল মাঠ। তবে সব মাঠেই এখন খেলতে দেওয়া হয় না আগের মতো। পর্যাপ্ত মাঠ ছাড়া যশোরে খেলার প্রসারে বাধা ভালো মানের হোটেল না থাকা। মোটামুটি মানের হোটেল বলতে হাসান ইন্টারন্যাশনাল, সিটি প্লাজা আর ম্যাগপাই। তাই দর্শক আগ্রহ থাকলেও টেস্ট বা ওয়ানডে ম্যাচ আয়োজন কঠিন এখানে। শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম বেনাপোলেই অবস্থিত যশোর অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেনাপোল স্থলবন্দর। সাগরদাড়ীতে কবি মধুসূদনের বাড়ি, কেশবপুরের হনুমান গ্রাম, ভবদহ বিল, গাজীর দরগাহ অন্যতম দর্শনীয় স্থান যশোরের। তেমনি মনকাড়া এখানকার বক্সিংও। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা টুর্নামেন্টে পদক জিতেছেন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, আখতারুল আলম, ফজলুর রহমান, আতিকুজ্জামান মনি, আবদুর রহিমরা। যশোর বক্সিং ক্লাবে অনুশীলন করেন ২৫ জনের মতো। তাঁদের পাঁচজন গত জাতীয় জুনিয়র বক্সিংয়ে অংশ নেয় আনসারের হয়ে। পাঁচটি ইভেন্টের মধ্যে চারটিতেই তাদের স্বর্ণপদক! সেরা বক্সার হওয়া শামীমা আক্তারের উচ্ছ্বাস, 'সেরা খেলোয়াড় আর সোনা জেতার জন্য ২৭ হাজার টাকা পেয়েছি আনসারের কাছ থেকে। ভবিষ্যতে সিনিয়র বক্সিংয়েও ভালো করতে চাই আমি।' বক্সিংয়ের পাশাপাশি কারাতেতেও সুনাম আছে যশোরের। এ বছর জাতীয় মার্শাল আর্টে প্রথমবারের মতো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। তা ছাড়া নিজেদের বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আন্তবিভাগীয় প্রতিযোগিতায় পেয়েছে ৯টি পদক। সুবাদে কারাতে কোচ আনোয়ার হোসেন জিতেছেন দেশের সেরা প্রশিক্ষকের পুরস্কার। তাঁর মেয়ে জান্নাতুল অলিকা মিম আবার ব্রোঞ্জ পেয়েছিল গত বাংলাদেশ গেমসে। হকিতে ২০০৪-০৫ মৌসুমের পর নানা কারণে লিগ হয়নি যশোরে। আর্থিক অনটনে গত জাতীয় হকিতেও অংশ নেয়নি তারা। অথচ হকিতে যথেষ্ট সাফল্য আছে যশোরের। জাতীয় হকিতে ১৯৭৭ সালে জাদু, কাওসার আলীরা রানার্সআপ করেছিলেন যশোরকে। যুব হকিতেও একবার রানার্সআপ হয়েছিল তারা। স্কুল হকিতে গত মৌসুমে ফাইনালেও পৌঁছেছিল এই জেলার একটি দল। তবে নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ বছর বাদে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হকি লিগ আয়োজনের। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হয়েছে ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস সায়েন্স (পিইএসএস) বিভাগটি। ২০১৩ সালে আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়ায় ১৭ সোনা, ৫ রুপা আর ৩টি ব্রোঞ্জ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল যবিপ্রবিই। গত বছর বুয়েটে অনুষ্ঠিত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় অ্যাথলেটিকসেও চ্যাম্পিয়ন তারা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আশাবাদী পিইএসএস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জাফিরুল ইসলাম, 'একজন খেলোয়াড়ের ক্লাবে খেলার জন্য পরীক্ষার সময় পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছি আমরা। এখানে যে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় তাতে ছাত্ররা জাতীয় পর্যায়ে যথেষ্ট অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস আমার।'