kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

বড় কথা বলছি না সত্যি কথা বলছি

খেলোয়াড়ি জীবনের নানা কীর্তির পেপার কাটিং দিয়ে সাজানো একটি বিশাল স্ক্র্যাপ বুক নিয়েই সাক্ষাৎকার দিতে বসলেন তিনি। পাতায় পাতায় ছড়ানো সাফল্যের খতিয়ানে চোখ বুলাতে গিয়ে কখনো খুব স্মৃতিকাতরও হয়ে পড়লেন আতহার আলী খান। আবার কখনো অনুভব করলেন পুরনো বঞ্চনার উত্তাপও। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্ট শেষ হওয়ার পর দিন দুপুরে মহাখালী ডিওএইচএসের বাসায় বসে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বাংলাদেশ দলের সাবেক এ ওপেনার গাঁথলেন পুষে রাখা দুঃখের মালাও। আরো অনেক কিছুর সঙ্গে সে দুঃখের বৃত্তান্তও তুলে ধরলেন মাসুদ পারভেজ   

৭ নভেম্বর, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



বড় কথা বলছি না সত্যি কথা বলছি

ছবি : মীর ফরিদ

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ধারাভাষ্যে আপনি 'ভয়েস অব বাংলাদেশ'ই হয়ে উঠেছেন। তো, আপনার ধারাভাষ্যকার হওয়ার গল্পটা শুনেই শুরু করতে চাই।

আতহার আলী খান : গল্পটা আমার নিজের কাছেই আজও অবিশ্বাস্য ঠেকে। এত দিন পর পেছন ফিরে তাকিয়ে নিজেকে অবশ্য খুব সৌভাগ্যবানও মনে হয়। আমার একটি জানালা বন্ধ হয়ে গেছে তো আল্লাহপাক আরেকটি জানালা খুলে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার বছরখানেকের মধ্যেই ধারাভাষ্য দেওয়ার সুযোগ এসে যায়। তা-ও আবার শুরুটা বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট দিয়েই!

প্রশ্ন : অর্থাৎ টেস্ট ক্রিকেটের বাংলাদেশ আর ধারাভাষ্যকার আতহারের বয়স সমান।

আতহার : তা বলতেই পারেন। গল্পটা আরেকটু পেছন থেকে শুরু করতে হবে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ গিয়েছিল ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড সফরে। পরের বছরের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ভালো কিছু করতে পারে ভেবেই হয়তো যুক্তরাজ্যের একটি প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল ওই সফরে আমাদের অনুসরণ করছিল। প্রতিটি ম্যাচের শেষেই আমাদের একজন ক্রিকেটারের ইন্টারভিউ করত ওরা। ইংরেজি বলায় স্বচ্ছন্দ্য ছিলাম বলেই কি না ম্যানেজার লিপু (গাজী আশরাফ) বেশির ভাগ সময় আমাকেই ক্যামেরার সামনে পাঠাত। চ্যানেলের ক্যামেরা পারসন মার্ক ও'ডয়্যারের সঙ্গে পরিচয়টা তখনই। ওই সফরের পর এ অস্ট্রেলিয়ানের সঙ্গে প্রথম দেখাই আমার ধারাভাষ্য জীবনের জানালা খুলে দিয়েছিল।

প্রশ্ন : শুনেই মনে হচ্ছে গল্পের শেষাংশ আরো চমকপ্রদ।

আতহার : আসলেই তাই। ২০০০ সালে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের আগের দিন (৯ নভেম্বর) আমি হোটেল শেরাটনে গেছি আমাদের ক্রিকেটারদের শুভ কামনা জানাতে। হোটেলে ঢুকতেই দেখা ও'ডয়্যারের সঙ্গে। ও জিজ্ঞেস করল, কেন গেছি। আমি কী মনে করে ওকে বলেই বসলাম, 'কমেন্ট্রি করতে তো ইচ্ছে করে। কিন্তু কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, তা তো জানি না।' ও বলল, 'আরে, আমিই তো প্রোডিউসার। কালকে চলে এসো।' কমেন্ট্রি বক্সে গিয়ে দেখি ইয়ান চ্যাপেল, সুনীল গাভাস্কার, মাইকেল হোল্ডিং ও টনি গ্রেগরা। পা ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করল।

প্রশ্ন : ধারাভাষ্যের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তাহলে শুধুই কাঁপুনির?

আতহার : সে কথা আর বলতে! ওরা আমাকে দুই দফায় আধঘণ্টা করে মোট এক ঘণ্টা কমেন্ট্রি করার সুযোগ দিয়েছিল। তো প্রথমবার মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই দেখলাম আমার সঙ্গী কমেন্টেটর ইয়ান চ্যাপেল! পার্থের বাউন্সি উইকেটে কোনো দিন খেলা হয়নি। সেখানকার উইকেটে দুর্ধর্ষ কোনো ফাস্ট বোলারের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলে যেমন লাগত বলে অনুমান করি, ইয়ানের পাশে বসে ঠিক তেমন অনুভূতিই হচ্ছিল আমার। প্রথম কয়েক মিনিট তো মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরোচ্ছিল না!

প্রশ্ন : এবার ক্রিকেটার আতহারের বিশাল ও বিস্তৃত জীবনের শুরু থেকেও একটু শুনতে চাই।

আতহার : জন্ম থেকেই শুরু করি। আমার বাবা মরহুম সালামত আলী খান ও মা সেলিমা সালামত খানের বাড়ি ভারতের উত্তর প্রদেশে। দেশ ভাগের পর ১৯৫২ সালে তাঁরা চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। সেখানকার ৩৪ এসকে ব্যানার্জি রোডের বাসায়ই আমাদের পাঁচ ভাইয়ের জন্ম। আমার জন্ম ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বাড়ির উঠানেই ক্রিকেট খেলার শুরু। মনে আছে, জীবনের প্রথম ক্রিকেট ব্যাটটা আমাকে এনে দিয়েছিলেন চাচা মঞ্জুর আলী খান। ওই ব্যাট নিয়ে কত পাগলামিই না করেছি! কেউ যাতে ধরতে না পারে, সে জন্য ব্যাটটা সঙ্গে নিয়েই ঘুমাতে যেতাম!

প্রশ্ন : চাচা খুব ক্রিকেট উৎসাহী ছিলেন বোঝা যাচ্ছে। আর বাবা?

আতহার : আরেক ক্রিকেট অন্তপ্রাণ। মনে আছে, বাবার হাত ধরে তখনকার ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের টেস্ট ম্যাচও দেখতে গেছি। খেলা দেখার সূত্রে বাবার সঙ্গে পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন টেস্ট ক্রিকেটারের পরিচয় একসময় বন্ধুত্বেও রূপ নিয়েছিল। সাঈদ আহমেদ ও ফজল মাহমুদরা দাওয়াত খেতে আমাদের নারায়ণগঞ্জের বাসায়ও যেতেন।

প্রশ্ন : বাবার কারণেই একসময় আপনাদের পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে হয় বলে শুনেছি।

আতহার : তিনি আমাদের কথা ভেবেই পরিবার পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাবা পাটের ব্যবসা করতেন। দেশের অস্থির পরিস্থিতিতে পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি ১৯৭০ সালে আমাদের করাচি পাঠিয়ে দেন। নারায়ণগঞ্জের প্রিপারেটরি স্কুল থেকে গিয়ে আমি ভর্তি হই করাচির ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে।

প্রশ্ন : ক্রিকেটে বিকশিত হওয়ার শুরুটা কি ওখান থেকেই?

আতহার : হ্যাঁ। স্কুলের পাঁচটি বিশাল মাঠ। ফুটবল আর হকিও চেষ্টা করেছি, কিন্তু হয়নি। তবে ক্রিকেটের পাশাপাশি টেবিল টেনিসও খুব ভালো খেলতাম। ক্রিকেটে ব্যাটিং আর অফস্পিন করতাম। স্কুলের পর আমি কলেজ দলেও নিয়মিতই থাকতাম। তবে খেলার সুযোগ দেওয়া হতো না আমাকে। এখনো কেন জানি মনে হয়, আমি বাংলাদেশি ছিলাম বলেই ওরা আমাকে খেলতে দিত না।

প্রশ্ন : মিডিয়াম পেসার হওয়াটা কি করাচীতে থাকতেই?

আতহার : হ্যাঁ। এক পর্যায়ে আমি হঠাৎ করে লম্বা হয়ে যাই। এক বছরের মধ্যে চার ইঞ্চি বেড়ে যাই। মহল্লার দলের অধিনায়ক তা দেখে বলল, 'তুমি এখন থেকে মিডিয়াম পেস কর।' ব্যস, সেই শুরু।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে ফিরে আবাহনীতে সুযোগও নাকি পেয়েছিলেন পেসার হিসেবেই?

আতহার : (হাসি...) নাদির শাহ বোধহয় ক্লাব কর্তৃপক্ষকে এ রকম কিছু একটাই বলেছিল। কিন্তু আমি তো অলরাউন্ডার। মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করি, পাশাপাশি মিডিয়াম পেসও। করাচিতে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর বাবা বললেন, 'অনেক হয়েছে, এবার চলে এসো।' ১৯৭৬-৭৭ সালে ঢাকায় ফিরে এলাম। আরো আগেই চলে আসা ভাই আনোয়ার আলী খানের সঙ্গে নাদিরের পরিচয় ছিল। সেই সূত্রে নাদিরের সঙ্গে আবাহনীতে ট্রায়াল দিতে গিয়ে শুনতে পাই, 'ছেলেটা তো সোজা খেলে, রেখে দাও।'

প্রশ্ন : কিন্তু সফল না হওয়াতেই কি পরের বছর আবাহনী ছাড়তে হয়েছিল?

আতহার : আমি ম্যাটে খেলে অভ্যস্ত ছিলাম না। সে জন্য খুব একটা সুবিধাও করতে পারিনি। এটা একটা কারণ বটে। তবে মূল কারণ অন্য। বাদশা ভাইকে (জাহাঙ্গীর শাহ) আমি গুরু মানি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'আবাহনীতে খেলছিস কেন? তুই ছোট দলে খেল। বড় দলের বিপক্ষে রান করলে ও উইকেট নিলে তুই চোখে পড়বি।' বাদশা ভাইয়ের কথাটা মাথায় ঢুকে যায়। পরের বছরই নাম লেখাই সূর্যতরুণে।

প্রশ্ন : খেলার পাশাপাশি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ছেন?

আতহার : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্পটাও খুব ইন্টারেস্টিং। তখন ক্রিকেটারদের কদর বেশি। এরই সুযোগ নিয়ে আমি, নেহাল হাসনাইন, পেসার মাহমুদুর রহমান ও লেগস্পিনার শহীদ বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের রুমে চা খেয়ে বেড়াচ্ছিলাম (হাসি...)। প্রতিটি বিভাগ থেকেই আমাদের ভর্তি হতে অনুরোধ করা হচ্ছিল। আমরা চা-টা খেয়ে ভাব নিয়ে সব জায়গায়ই বলে আসছিলাম, 'দেখা যাক, কী করা যায়!' কিন্তু পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টটা খুব শক্তিশালী হওয়ায় আমরা শেষপর্যন্ত ওখানেই ভর্তি হই।

প্রশ্ন : ওই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলও তো বেশ শক্তিশালী ছিল।

আতহার : শুধু শক্তিশালী বললে ভুল বলা হবে। আমি বলব, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই বাংলাদেশের সেরা দল ছিল। আমাদের আশপাশে কেউ দাঁড়াতে পারত না। আমাদের লড়াই হতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। নান্নু (মিনহাজুল আবেদীন), নোবেল (নুরুল আবেদীন) ও মাসুমরা (জাহিদ রাজ্জাক) খেলত। ১৯৮৫ সালের উইলস কাপ ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালটার কথা এখানে না বললেই নয়। তিন দিনের ম্যাচ ছিল সেটি। ওই ম্যাচেই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছিল তারিকুজ্জামান মুনির। আমি করেছিলাম ১৫৫। পঞ্চম উইকেটে আমাদের ৪১৭ রানের পার্টনারশিপ এখনো বাংলাদেশের যেকোনো পর্যায়ের ক্রিকেটের রেকর্ড। ফাইনালেও সেঞ্চুরি করেছিল মুনির। ও করেছিল ১২৫ রান আর আমি ৭০। ওই আসরের পরপরই বাংলাদেশ সফরে আসে পুরোশক্তির শ্রীলঙ্কা দল। ওদের বিপক্ষে বিসিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড) একাদশ দলে সুযোগ পাওয়াটা আমার জন্য আনন্দের পাশাপাশি বেদনাদায়কও ছিল।

প্রশ্ন : কেন?

আতহার : প্রসঙ্গ যখন উঠেছেই, তখন আপনাকে ক্রিকেট জীবনের দুটো দুঃখের কথাই বলি। প্রথমবারের মতো আমার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা বাবা দেখে যেতে পারেননি। বিসিসিবি একাদশ দলে সুযোগ পাওয়ার আগের বছর অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে তিনি মারা যান। দ্বিতীয় দুঃখ হলো, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের জন্য বাংলাদেশের ৩০ জনের প্রাথমিক দলেই জায়গা না পাওয়া। এ দুটো দুঃখ আমি আজও বয়ে বেড়াই। এর বাইরে পারফরম করেও নানা সময়ে বাংলাদেশ দলে সুযোগ না পাওয়ার বঞ্চনা তো আরো আছে।

প্রশ্ন : যেমন?

আতহার : ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে পারফরম করে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু ১৯৮৬ সালের এশিয়া কাপ দলে আমি নেই। এমনকি শুরুতে ছিলাম না আইসিসি ট্রফির দলেও। এই দেখুন না (স্ক্র্যাপ বুক খুলে সে সময়কার পত্রিকার কাটিং দেখিয়ে), পত্রিকায় লেখা হয়েছে, বিমানের আতহার আলী খান মৌসুমে ৭৪৪ রান করেও দলে সুযোগ পায়নি। দল ইংল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কয়েক দিন আগে অবশ্য আমিসহ দুজনকে অন্তর্ভুক্ত করে স্কোয়াড বড় করা হয়। তাতে স্কোয়াড হয়ে যায় ১৭ জনের। কিন্তু ট্রফির জন্য ওখানে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হয় ১৫ জনের। তাতে নোবেল ও এখন মাইলস ব্যান্ডের ভোকাল হামিন আহমেদ বাদ পড়ে যায়। অথচ ওয়ার্ম আপ ম্যাচে সবচেয়ে বেশি রান তারা দুজনই করেছিল।

প্রশ্ন : ওই আইসিসি ট্রফিতে আপনার পারফরম্যান্সের কথাও একটু বলুন।

আতহার : খুব ভালো করতে পারিনি। কারণ মিডল অর্ডার থেকে আমাকে ওপেনার বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডে গিয়ে কেউ আর ওপেন করতে চায় না! ওখানকার কন্ডিশনে জীবনে প্রথম ওপেন করে সফল হইনি। যে জন্য আর কোনো দিন ওপেন করব না বলে ঠিক করি।

প্রশ্ন : কিন্তু নিজের এ সিদ্ধান্তে তো শেষপর্যন্ত অটল থাকতে পারেননি।

আতহার : মহিন্দার অমরনাথের কারণেই পারিনি। তাঁকে কত্ত বলেছি যে ১৯৮৬ সালে ওপেন করে খুব বাজে অভিজ্ঞতা! কিন্তু তাঁর কথা, আমার টেকনিক ভালো। ওপেনার হলে ভালো করব। বুঝিয়ে-শুনিয়ে ১৯৯৪ সালের আইসিসি ট্রফির আগে আমাকে সেই যে ওপেনার বানিয়ে দিলেন, ক্যারিয়ারের শেষপর্যন্ত তাই ছিলাম। মহিন্দার বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরও বদলে দিতে পেরেছিলেন।

প্রশ্ন : কিভাবে?

আতহার : আমাদের চিন্তাধারাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি। তখন আমরা বড়জোর তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা প্র্যাকটিস করি। কোনো একদিন আমরা তিন ঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পর ব্যাগ গোছাচ্ছি আর মহিন্দার এসে বললেন, 'এখন থেকে ততক্ষণই প্র্যাকটিস হবে, যতক্ষণ তোমরা একটা ম্যাচ খেলার জন্য মাঠে থাকো।' সেই থেকে চরম খাটুনির শুরু আমাদের। এর মধ্যে একদিন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতেই আমরা খুশি এই ভেবে যে আজ প্র্যাকটিস হবে না। জমিয়ে চা খাব। হুট করেই মহিন্দার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পাশের বহুতল ভবনটা দেখিয়ে বললেন, 'লেটস গো'। ভবনের একতলা থেকে শেষতলা পর্যন্ত আমাদের দশবার ওঠা-নামা করালেন! গর্ডন গ্রিনিজ আসার পরে আরো কঠিন ট্রেনিং আমরা করেছি। কিন্তু গায়ে লাগেনি, কারণ মহিন্দারের কারণে তত দিনে আমরা এসবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : মহিন্দার ওপেনার বানিয়ে দেওয়ার আগে মিডল অর্ডারে খেলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সফলতম ব্যাটসম্যান ছিলেন আপনি।

আতহার : হ্যাঁ, দেশের মাটিতে ১৯৮৮ সালের এশিয়া কাপে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেছিলাম। তখন টুর্নামেন্ট শেষে চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে আমন্ত্রণমূলক একাদশ নামের দলের একটি প্রদর্শনী ম্যাচ হতো। টুর্নামেন্টের অন্য দলগুলোর ক্রিকেটারদের নিয়ে ওই একাদশটা গঠন করা হতো। বাংলাদেশ থেকে সে বার ওই দলে একমাত্র আমিই সুযোগ পেয়েছিলাম। ১৯৯০ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের পরের আসরেও আমিই বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ৭৮ রানের ইনিংসের জন্য তো ইতিহাসেই নাম লেখা হয়ে গেল। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হলাম। মনে আছে, ওই ম্যাচে অরবিন্দ ডি সিলভা আমার চেয়ে বেশি রান করেছিল। তাই মনেই হয়নি যে আমি ম্যাচ সেরা হতে পারি। এ জন্য আমার নাম ঘোষণা হওয়ার পর দলের কেউ একজন ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে পুরস্কার নিতে পাঠিয়েছিল! নিজের নাম আমি শুনতেই পাইনি (হাসি...)!

প্রশ্ন : ওপেনার হিসেবে ১৯৯৭ সালের এশিয়া কাপেও তো দারুণ সফল ছিলেন আপনি।

আতহার : ওই এশিয়া কাপে শচীন টেন্ডুলকারের চেয়েও বেশি রান করেছিলাম আমি (পাকিস্তান ৮২, শ্রীলঙ্কা ৪২, ভারত ৩৩)। এত কিছুর পরও ১৯৯৯ বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলেই আমার জায়গা হয়নি!

প্রশ্ন : এই নিয়ে দুঃখ বয়ে বেড়ানোর কথা বলছিলেন। কেন ও রকম হয়েছিল বলে মনে করেন?

আতহার : আমি জানি না কেন! তবে শুধু দুঃখ নয়, অনেক দুঃখ হয় আমার। দুঃখ আছে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও। নান্নু শুরুতে বিশ্বকাপ দলে জায়গা পায়নি বলে মিডিয়া কত লেখালেখি করেছে। অথচ আমাকে নিয়ে একটি লাইনও কোথাও ছাপা হতে দেখিনি!

প্রশ্ন : ১৯৯৯ সালে আপনার বয়স ৩৭। তত দিনে বেশি বয়সী ক্রিকেটারদের বয়স ও ফিটনেস নিয়ে ক্রিকেট প্রশাসনে বিরাগ তৈরি হয়ে গেছে। বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলে জায়গা না পাওয়ার ক্ষেত্রে এসবের কোনো ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন?

আতহার : একটা উদাহরণ দিই। গর্ডন গ্রিনিজের সময় একবার কক্সবাজারে কন্ডিশনিং ক্যাম্প হলো। একদিন বলে দেওয়া হলো, সারা দিন শুধুই বিচ রানিং হবে। মনে আছে, অনেককে গাড়িতে করে তুলে আনতে হয়েছিল! কিন্তু যে বা যারা শেষপর্যন্ত দৌড়েছিল, তাদের মধ্যে এই আতহারও ছিল। বড় কথা বলছি না, সত্যি কথা বলছি!

প্রশ্ন : দ্রুত রান তোলার দাবি মেটানোয় ওপেনার আতহারের অক্ষমতা নিয়েও আলোচনা হয় খুব। ১৯৯৪ সালের আইসিসি ট্রফির কেনিয়া ম্যাচে আপনাকে নামানো হয়েছিল ৯ নম্বরে। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ফাইনালে আপনাকে নামতেই হয়নি।

আতহার : আরো কিছু সত্য বলি। ১৯৮৮ সালের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের লেগ স্পিনার আব্দুল কাদিরকে ছক্কা মারার পর তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'তোমরা ছক্কাও মারতে জানো!' ১৯৯৪ সালের কেনিয়া ম্যাচেও ৯ নম্বরে নেমে ছক্কা হাঁকিয়েছিলাম। কাজেই আতহার বলের চেয়ে রান বেশি করতে পারত না, এই দাবিটা ভুল। কেনিয়াতে তবু আমাকে বলা হয়েছিল যে তুমি নামছো না। কিন্তু ১৯৯৭ সালের আইসিসি ফাইনালে প্যাড পরে বসে আছি অথচ কেউ আমাকে কিছু বলছে না। দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় অবশ্য ওই দুঃখটা ভুলে যেতে পেরেছি। তবে একটা কথা বলতেই হয়। ওই ম্যাচের ওপেনার দুর্জয় (নাঈমুর রহমান) কিন্তু প্রথম বলেই আউট হয়েছিল। আমি নামলে এর চেয়ে খারাপ কী হতো!

প্রশ্ন : যাই হোক, দুঃখ নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করলেও ধারাভাষ্যের জানালাটা খুলে গিয়েছিল আপনার। এই জানালা দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন কোন ভোরটা আপনি দেখতে চান?

আতহার : টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে এক, দুই কিংবা তিন নম্বরে থাকা কোনো এক দলকে বাংলাদেশ হারাচ্ছে আর আমি ধারাভাষ্য দিচ্ছি। ধারাভাষ্য দিচ্ছি যখন বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলছে। জানি না, জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব কি না। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই।

প্রশ্ন : এবার আপনার ব্যক্তিজীবন নিয়ে একটু ধারণা দিন।

আতহার : ভক্ত হিসেবে আমার অটোগ্রাফ নিতে আসা ফারিয়ার সঙ্গে প্রেমটা একসময় বিয়েতে পরিণতি পায়। সম্পর্কে ও টিভি তারকা তৌকীর আহমেদের ছোট বোন ও বিপাশা হায়াতের ননদ। ফারিয়া এখন সানবীমস স্কুলে শিক্ষকতা করছে। আমার এক মেয়ে ও দুই ছেলেও একই স্কুলে পড়াশোনা করছে। বড় ছেলে ওমর আলী খান বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ও লেগস্পিনার। আমি চাই, ও আমার সবচেয়ে প্রিয় দুই ক্রিকেটার ব্রায়ান লারা ও শেন ওয়ার্নের মতো হোক। জানি না, হতে পারবে কি না।

প্রশ্ন : পেশাগত জীবন?

আতহার : ধারাভাষ্যের পাশাপাশি গার্সিয়া ফার্নিচার সলিউশনস নামের একটি প্রতিষ্ঠান আছে আমাদের। যেটাতে ফারুক (প্রধান নির্বাচক) আমার অন্যতম অংশীদার। এ ছাড়া আমি প্যারামাউন্ট ইনস্যুরেন্সের কর্পোরেট মার্কেটিং ডিরেক্টর।

প্রশ্ন : সবশেষে জানতে চাই, এই ইন্টারভিউটা ছাপা হওয়ার পর সেটি আপনাকে কে পড়ে শোনাবেন?

আতহার : কে আবার, আমার স্ত্রী!

প্রশ্ন : আপনার বাংলা নিয়ে তো ক্রীড়া সাংবাদিকদের মধ্যে 'রিয়েল লাইফ জোকস'ও চালু আছে। একবার ব্রাদার্সের অধিনায়ক থাকাকালীন টেলিফোনে বলেছিলেন, 'পাকিস্তানের মঈন খানকে আসানোর চেষ্টা চলছে!'

আতহার : হা হা হা। এখন বললে অবশ্যই বলতাম, 'মঈনকে আনানোর চেষ্টা চলছে।' কারণ এখন বাংলাটা আগের চেয়ে অনেক ভালো বলতে পারি। কেবল লিখতে ও পড়তে গেলেই সমস্যা। স্ত্রীর পর ছেলেমেয়েরাও এখন আমাকে বাংলা শেখানোর চেষ্টা করছে। অ আ ই ঈ- এগুলো এখন চিনি। কিন্তু যুক্তাক্ষর এলেই ঝামেলায় পড়ে যাই। এখনো পর্যন্ত বাংলা লিখতে-পড়তে পারি না বলে আমি লজ্জিত। তবে সময় আছে। ঠিক একদিন শিখে নেব!

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা