বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই একটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় আসে, তা হলো—ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদু। কোনো দল প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে তান্ত্রিকের সাহায্য নিয়েছে, কোনো খেলোয়াড়ের ওপর জাদু করা হয়েছে—এমন নানা খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশিত হয়।
শুধু খেলাধুলা নয়, আমাদের সমাজেও ব্যাবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সমস্যা, উত্তরাধিকার বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে কালো জাদুর আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রশ্ন হলো, কালো জাদু কি সত্যিই আছে? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে? নিম্নে বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
জাদু কী? : আরবি ভাষায় জাদুকে বলা হয় ‘সিহর’। ইসলামী পরিভাষায় ‘সিহর’ মানে হলো শয়তান ও জিনের সহযোগিতায় বা বিশেষ মন্ত্র, কুফরি বাক্য ও অপকর্মের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করা।
জাদুর অস্তিত্ব ও প্রভাব : পবিত্র কোরআনে এর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরি করেনি; বরং শয়তানরা কুফরি করেছে। তারা মানুষকে জাদু শেখাত এবং (তারা অনুসরণ করেছে) যা নাজিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারুত ও মারুতের ওপর। আর তারা কাউকে শেখাত না, যে পর্যন্ত না বলত যে ‘আমরা তো পরীক্ষাস্বরূপ, সুতরাং তোমরা কুফরি কোরো না। এর পরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোনো ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত, যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদের বিক্রয় করেছে, যদি তারা জানত।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০২)
এই আয়াত থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যায়, এক. জাদুর অস্তিত্ব আছে। দুই. এটাও মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ এবং এর মাধ্যমে কখনো কখনো মানুষের ক্ষতি করা সম্ভব; কিন্তু আল্লাহর অনুমতি ছাড়া জাদু কোনো ক্ষতি করতে পারে না, অতএব জাদুকরের শয়তানি শক্তিকে ভয় পাওয়া বা তার অলীক কথা বিশ্বাস করা বা বিশ্বাস করে ইসলামবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া যাবে না। তিন. মানুষের ক্ষতি করার জন্য জাদুটোনার আশ্রয় নেওয়া নিষিদ্ধ।
পৃথিবীর ইতিহাসে জাদুটোনার চর্চা প্রায় সব যুগেই ছিল। যেমন—মুসা (আ.)-এর যুগে জাদুকররা মানুষের চোখে বিভ্রম সৃষ্টি করেছিল; কিন্তু মহান আল্লাহর আসমানি সাহায্য এসে তাদের সব জাদু বিনষ্ট করে দেয়।
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ১১৬-১১৮)
এমনকি আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.)-এর ওপরও জাদু করা হয়েছিল, যদিও তা তাঁর নবুয়তের ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি; বরং সাময়িক শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে মহান আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দেন এবং তা বিনষ্ট করার পদ্ধতি জানিয়ে দিয়ে তা থেকে পরিত্রাণের জন্য সুরা ফালাক, নাস অবতীর্ণ করেন।
(বুখারি, হাদিস : ৫৭৬৫, তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন)
জাদু শেখার বিধান : ইসলামের দৃষ্টিতে জাদু শেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, বিশ্বনবী (সা.) বলেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বিরত থাকবে। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! সেগুলো কী? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, (২) জাদু, (৩) আল্লাহ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরিয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা, (৪) সুদ খাওয়া, (৫) এতিমের সম্পদ গ্রাস করা, (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মুমিনাদের অপবাদ দেওয়া।
(বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬)
অর্থাৎ জাদু এমন ভয়াবহ অপরাধ, যা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
কালো জাদু থেকে বাঁচতে করণীয় : কালো জাদু থেকে বাঁচতে অবশ্যই মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি নিম্নে উল্লিখিত আমলগুলো করা যেতে পারে— যেমন : সর্বদা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির করা (বিশেষ করে সুরা আল-ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার করে সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ)। নিয়মিত আয়াতুল কুরসির আমল করা।
ঘুমানোর আগে এই ‘তিন কুল’ (উল্লিখিত তিনটি সুরা) পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া, সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া, সার্বক্ষণিক পাক-পবিত্র থাকার চেষ্টা করা ইত্যাদি।
মূল কথা হলো ইসলাম জাদুর অস্তিত্ব অস্বীকার করে না; বরং এটিকে একটি বাস্তব ফিতনা হিসেবে স্বীকার করে। কিন্তু একই সঙ্গে ইসলাম ঘোষণা করে যে জাদু শেখা, করা, প্রচার করা, জাদুকরের কথা বিশ্বাস করা বা এর মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করা মহাপাপ। একজন মুমিনের করণীয় হলো তান্ত্রিক বা জাদুকরের দ্বারস্থ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা, কোরআনের নির্ধারিত দোয়া ও রুকইয়াহর আমল করা এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও ভেলকিবাজি থেকে দূরে থাকা। প্রয়োজনে কোরআন-সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারী অভিজ্ঞ আলেম-উলামার পরামর্শ নিয়ে কোরআন-হাদিসের আমল শিখে নেওয়া যেতে পারে।