১৯৬৪ সালে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সর্বাধুনিক হোটেল সায়মন তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন দাদা সাঈদুর রহমান (এস রহমান)। যে হোটেলে সে সময় থাকা মানে আভিজাত্যের প্রমাণ। কক্সবাজারে গেলে সেখানেই থাকতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সেই এস রহমানের নাতি মাহবুব উর রহমান দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখে সেই অভিযাত্রাকে আরো নান্দনিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে তিন পুরুষের আতিথেয়তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে কম্পিউটার সায়েন্স থেকে স্নাতক এবং ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে এমবিএ করা মাহবুব এরই মধ্যে পারিবারিক ব্র্যান্ড সায়মনকে আরো এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন সায়মন হোল্ডিং লিমিটেড। তিনি বর্তমানে কক্সবাজারের অত্যাধুনিক সায়মন বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি একই সঙ্গে চট্টগ্রামের চারতারা হোটেল দি পেনিনসুলা চিটাগাংয়ের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন চার বছর আগে। এর আগে পেনিনসুলার চেয়ারম্যান ছিলেন বাবা গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। মন্ত্রী হওয়ার পর আইনি বাধ্যবাধকতায় চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে দিলে মূলত তিন পুরুষের হোটেল ব্যবসার ভার এখন মাহবুব উর রহমানের ওপর। পেনিনসুলা এবং সায়মন হোল্ডিংয়ের দায়িত্ব নিয়ে এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে যুগপৎ এগিয়ে নিতে হাতে নিয়েছেন একের পর এক নতুন পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপরই অংশ হিসেবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত দি পেনিনসুলা লিমিটেডের নতুন প্রকল্প ‘পেনিনসুলা এয়ারপোর্ট গার্ডেন হোটেল’। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই ২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ কক্ষ বিশিষ্ট পাঁচতারা হোটেলটির নির্মাণকাজ প্রায় ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২০২০ সাল নাগাদ বিমানবন্দরের পাশে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আকর্ষণীয় লোকেশনে সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘ মেয়াদে লিজ নিয়ে ২ দশমিক ১৯ একর জমির ওপর নির্মিত ১১ তলা উচ্চতার ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের দেশের সবচেয়ে বড় ইনফিনিটি সুইমিং পুলের হোটেলটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। ‘পেনিনসুলা এয়ারপোর্ট গার্ডেন হোটেল’ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘হোটেলের সম্ভাবনা অনেক ভালো। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসাকের মূলত প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দূরত্ব এবং সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় বিশেষ করে বিমানের ক্রু, ট্রানজিট যাত্রীদের প্রথম এবং একমাত্র পছন্দই হবে আমাদের হোটেল। এ ছাড়া ফ্লাইট ক্যাটারিংয়ের সুবিধা রাখা হবে।’ চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বর্তমানে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে। হোটেলের পাশেই কর্ণফুলী টার্মিনাল, নদীর ওপারে চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান ইপিজেড, এপারে দেশের সর্ববৃহৎ মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল ও গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বন্দরের বে টার্মিনালের কাজ শুরু হয়েছে। এই কাজে প্রচুর বিদেশি চট্টগ্রামে অবস্থান করবে। তাই অবস্থানগত কারণেও পেনিনসুলা এয়ারপোর্ট গার্ডেন হোটেলের চাহিদা শীর্ষে থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। হোটেল করার জন্য খুলনায়ও এরই মধ্যে জমি কিনে রেখেছে পেনিনসুলা কর্তৃপক্ষ। পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলেই খুলনায় তিন থেকে চার তারা মানের হোটেলের নির্মাণকাজে হাত দেবে তাঁরা। এ ছাড়া ঢাকায়ও একটু ভিন্ন ধাঁচের পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য উত্তরা কিংবা পূর্বাচলকে বেছে নেওয়া হবে জানিয়ে মাহবুব উর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলও ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যস্থল হবে। তাই সেখানেও আমাদের হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। তবে সরকার সেখানে বাণিজ্যিক প্লট চিহ্নিত করে দিলেও হোটেল-মোটেল জোনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেয়নি।’ এ ছাড়া টেকনাফে বেজা ট্যুরিজম জোনে পেনিনসুলা ও সায়মন হোল্ডিংয়ের নামে জায়গা বরাদ্দ নিয়ে সেখানে ইকো ট্যুরিজমের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। দেশে পেনিনসুলা ব্র্র্যান্ডের অন্তত ১০টি হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে নিজেদের দেশের বৃহৎ হোটেল গ্রুপ হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে নিজেদের প্রমাণ করেছি। হসপিটালিটি বিজনেসে আমাদের ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতা। তিন পুরুষ ধরে সাফল্যের সঙ্গে আমরা হোটেল ব্যবসায় অন্যরা যা কল্পনা করেনি আমরা সেটাই করে দেখিয়েছি। চেইন হোটেল ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে পেনিনসুলা ব্র্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়া।’ শ্রীলঙ্কা, ভারত, মালয়েশিয়ায় হোটেল নির্মাণ ও পরিচালনা পেনিনসুলার স্বপ্ন। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমর্থনের প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি কলকাতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘বছর দশেক আগে কলকাতায় দুটির বেশি পাঁচতারা হোটেল ছিল না। সেখানে এখন ২০টির বেশি বিশ্বমানের হোটেল। অথচ এটি ভারতের একটি রাজ্য মাত্র।’ দেশের প্রথম মাল্টিপ্লেক্স বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সের কর্ণধার মাহবুব উর রহমান পেনিনসুলার পাশাপাশি সায়মন হোল্ডিংকে নিয়েও স্বপ্নের জাল বুনে চলেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে পাঁচতারা ইকো রিসোর্ট গড়ে তোলার জন্য এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণ শুরু করেছেন। এর পরেই নজর দেবেন বান্দরবানে। সেন্ট মার্টিনসেও সায়মনের নামে দুই একর জমি কেনা আছে। সরকারি অনুমোদন পেলে সেখানেও ভবিষ্যতে ইকো রিসোর্ট টাইপের কিছু করার পরিকল্পনা আছে। এ প্রসঙ্গে মাহবুব উর রহমান বলেন, সায়মনের সঙ্গে আমাদের আত্মার সম্পর্ক। এটাকে কখনই আমরা ব্যাবসায়িক হোটেল করব না। সায়মন হবে পর্যটকবান্ধব হোটেল।’