kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

কালের কণ্ঠ-বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লি. গোলটেবিল— থ্যালাসেমিয়া রোগ : সচেতনতাই প্রতিরোধ

থ্যালাসেমিয়া : সম্মিলিত সচেতনতার বিকল্প নেই

থ্যালাসেমিয়া শতভাগ প্রতিরোধ সম্ভব

৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে



থ্যালাসেমিয়া : সম্মিলিত সচেতনতার বিকল্প নেই

সারা বিশ্বে প্রায় ১০ কোটির বেশি লোক বিভিন্ন ধরনের বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে। প্রতিবছর প্রায় এক লাখ শিশুর জন্ম হচ্ছে জটিল থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে। বাংলাদেশে ৫০ লাখের বেশি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ১৪ জনে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক রয়েছে এবং ৭০ হাজারেরও বেশি শিশু এই থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। এ ছাড়া প্রতিবছর ছয় হাজার শিশু বিভিন্ন রকমের থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। ৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। গত ৩ মে কালের কণ্ঠ ও বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ‘থ্যালাসেমিয়া রোগ : সচেতনতাই প্রতিরোধ’ শীর্ষক ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে ওয়েবিনারে আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে আজ প্রকাশিত হলো বিশেষ ক্রোড়পত্র। গ্রন্থনা করেছেন ফাতিমা তুজ জোহরা ও মোবারক আজাদ।

 

যাঁরা অংশ নিয়েছেন

স্বাগত বক্তব্য

ইমদাদুল হক মিলন

সম্পাদক, কালের কণ্ঠ ও পরিচালক, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ

সেশন সভাপতি

মোহাম্মদ এবাদুল করিম

সংসদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড

সম্মানিত অতিথি

অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ

 উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম

মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

কাজী হাবিবুল বাশার

সাবেক অধিনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ও নির্বাচক বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল

আলোচক

অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন

 পরিচালক, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অধ্যাপক ডা. আবু জাফর মো. সালেহ

 সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর, হেমাটোলজি বিভাগ, ঢাকার এভারকেয়ার হসপিটাল

 

অধ্যাপক ডা. মাসুমা রহমান

ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন

 

প্রফেসর ডা. মাসুদা বেগম

ডিন মেডিসিন অনুষদ ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান (হেমাটোলজি বিভাগ), বিএসএমএমইউ

 

ডা. মোহাম্মদ শরীফ

পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

 

 ড. ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার

ডিরেক্টর, হেলথ প্রগ্রাম, কেয়ার বাংলাদেশ

 

অভিজ্ঞতা বর্ণনা

ফারহিন ইসলাম

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

কাজী আশরাফ হোসেন

চেয়ারম্যান, ঘটক পাখি ভাই প্রা. লি.

 

প্রবন্ধ উপস্থাপক

খালেদা আক্তার সিনথিয়া

সহকারী ব্যবস্থাপক, অনকোলজি বিভাগ, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড

 

সঞ্চালনা

তৌফিক মারুফ

ডেপুটি চিফ রিপোর্টার, কালের কণ্ঠ

 

থ্যালাসেমিয়া ভয়ংকর হুমকি, তবে সতর্কতায় সুরক্ষা

মোহাম্মদ এবাদুল করিম এমপি

থ্যালাসেমিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী আলোচনার বিষয়। আজকে সময়ের দাবি সারা বিশ্বের জন্য থ্যালাসেমিয়া একটি ভয়ংকর হুমকি হিসেবে আসছে। এই হুমকি আসার আগেই আমরা আমাদের দেশকে কিভাবে রক্ষা করতে পারি এ বিষয়ে বিজ্ঞদের মতামত জরুরি।  এ ছাড়া আমরা বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল সব সময় কিভাবে বাংলাদেশের মানুষকে থ্যালাসেমিয়া থেকে রক্ষা করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি। বিজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আমাদের এ আন্দোলন জোরদারে চেষ্টা করব। এখন সোশ্যাল মিডিয়াও  ভালো ভূমিকা রাখছে। এতেও কথাগুলো শেয়ার করতে পারি। কারণ আমরা জানি হেপাটাইটিসের বিষয়ে সবাই মোটামুটি সচেতন। মিডিয়া এবং বিশেষজ্ঞদের প্রচেষ্টার ফলেই এই সচেতনতা এসেছে। আমার মনে হয় কিছুদিন যদি থ্যালাসেমিয়ার ওপরে কাজ করা যায়, তাহলে বিয়ের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষসহ ঘটকও থ্যালাসেমিয়ার বিষয়ে জানতে চাইবেন। ফলে বিয়েশাদির বিষয়ে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা ও সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চলে আসবে বলে আমার ধারণা।

থ্যালাসেমিয়া যে এত বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, এটা আগে আমার ভাবনায় আসেনি। এই আলোচনার মাধ্যমে যে বিষয়গুলো এসেছে এগুলো কিভাবে প্রাইভেট সেক্টর থেকে সরকারি লেভেলে কাজ করাতে সাহায্য করবে, এটা আশা করি ডিজি মহোদয়সহ সংশ্লিষ্টরা অবহিত করবেন।

 

অনেকের থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ নেই কিন্তু রোগের বাহক

অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩-৪ শতাংশ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। ১০ হাজার নবজাতকের মধ্যে ৩৩ শিশু থ্যালাসেমিয়ার রোগী। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করতে হলে দুটি পদ্ধতিতে এগোতে হবে। একটি পদ্ধতি হলো ডায়াগনস্টিক করে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা। অন্যটি হলো প্রতিরোধ করা। ডায়াগনস্টিক চিকিৎসার আওতায় আছে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রফোরেসিস পরীক্ষা। এটা খুবই ব্যয়বহুল। আর প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের কোথায় কোন রোগী আছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিটি কর্নার করা হয়েছে। এটার উদ্দেশ্য হলো সেখানে যেসব রোগী যায় তাদের ভেতরে এ ধরনের সমস্যা থাকলে খুঁজে বের করা। অর্থাৎ একজন রোগী খুঁজে পেলে তার মা-বাবা কিংবা পরিবারের অন্যদের টেস্টের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অনেকে আছে লক্ষণ নেই, কিন্তু রোগের বাহক। পাশাপাশি প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

বিয়ের রেজিস্ট্রিতে ব্লাড রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে

প্রফেসর ডা. মাসুদা বেগম

আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার ফলে থ্যালাসেমিয়া রোগটা ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিবছর থ্যালাসেমিয়া দিবসে এটি গুরুত্ব পায়। পরে সবাই বিষয়টি নিয়ে একটু পিছিয়ে পড়ে। লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে ‘মীনা’ কার্টুন সমাজে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এই রোগ নিয়ে যদি মিডিয়া কথা বলে তবে সেটি সমাজে অনেক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি বিয়ের রেজিস্ট্রিতে থ্যালাসেমিয়া রক্তের রিপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক করা গেলে কাজে আসবে। পাশাপাশি সরকারি পরিচয়পত্রে ব্লাড গ্রুপের মতো হিমোগ্লোবিন ‘এ/বি’ নাকি থ্যালাসেমিয়া উল্লেখ থাকলে প্রতিরোধও অনেক সহজ হয়ে যাবে। বাহকের সঙ্গে বাহকের বিবাহ বন্ধ করা, আর বিয়ে হয়ে গেলেও অনাগত বাচ্চাটা যেন আক্রান্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 

হাজার হাজার বিয়ে দিয়েছি, কেউ কথা শোনেনি আশা করি এবার শুনবে

কাজী আশরাফ হোসেন

আমি অনেক মানুষকে বুঝিয়েছি—বিয়ের আগে আপনারা থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করে নিন, নইলে বিপদে পড়তে পারেন। কিন্তু আমার এ কথা তাঁরা শোনে না। আজকে এই আয়োজনের মাধ্যমে কালের কণ্ঠ এবং বিজ্ঞজনদের অসংখ্য ধন্যবাদ এই আয়োজনের মাধ্যমে বিষয়টির গুরুত্ব নিয়ে সার্বিকভাবে আলোচনা করায়। আশা করি, এবার মানুষজন শুনবে। কারণ এত বড় একটা বিষয় (থ্যালাসেমিয়া) নিয়ে সচেতনতা না থাকলে ভয়ংকর বিপদ হতে পারে। আমি হাজার হাজার বিয়ে দিয়েছি ঘটক হিসেবে, কিন্তু এটা (থ্যালাসেমিয়া) কেউ মানেনি। তারা বলে, আগে বিয়ে হোক, তারপর দেখা যাবে। আশা করি, এবার সবাই এটা শুনবে এবং মানবে। এটার মাধ্যমে অনেকের উপকার হবে, এটা আশা করি। যাঁরা থ্যালাসেমিয়া নিয়ে এই আয়োজনটা করছেন তাঁদের আমার অফুরন্ত দোয়া রইল।

 

থ্যালাসেমিয়ায় সচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের মিডিয়াকে যুক্ত করতে হবে

ইমদাদুল হক মিলন

থ্যালাসেমিয়া রক্তের এবং বংশগত একটি রোগ। আমাদের সবার সচেতনতাই পারে থ্যালাসেমিয়া থেকে রক্ষা করতে। এ ছাড়া যেকোনো রোগ বা দুর্যোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় সচেতনতা। এখন আমরা যে বিশ্ব করোনা মহামারিতে আছি, এর প্রায় দেড় বছর পার করছি। এটার বেলায়ও লক্ষ করছি, মানুষের সচেতনতাই প্রধান প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছে। সচেতনতাই মানুষকে রক্ষা করতে পেরেছে বা করছে। থ্যালাসেমিয়ার বিষয়েও সচেতনতা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উপায় নেই। আর এই সচেতনতা কিভাবে তৈরি করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের মিডিয়াকে নানাভাবে আরো বেশি যুক্ত করতে হবে। বর্তমানে আমাদের অনেক মিডিয়া রয়েছে। এ জায়গাগুলোতে যদি আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে বোঝাতে পারি এটা কিভাবে আপনাকে রক্ষা করবে, তাহলে যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ সম্ভব। কারণ আমি মনে করি কোনো রোগ হওয়ার আগে যদি সচেতন হওয়া যায় এর চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না। তাই বলব, সচেতনতা অতি জরুরি। আর আমরা মিডিয়ার পক্ষ থেকে সচেতনতা তৈরির কাজটি নিয়মিত সব সময় করে থাকি। বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসকে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই তারা এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের বরাবরই যুক্ত করেন।

 

রোগীর চিকিৎসা সহজ করতে হবে

কাজী হাবিবুল বাশার

এমন অসুখ খুব কম আছে, যেটা শতভাগ প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এখন যাঁরা আক্রান্ত আছেন তাঁদের চিকিৎসাব্যবস্থা কিভাবে আরো সহজ করা যায় সেটা চেষ্টা করতে হবে। তবে সব পর্যায়ে সর্বত্র সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের সবার প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে আমাদের সবারই সামাজিক দায়িত্ব আছে। আমরা প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে যদি সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে সেটা দ্রুত প্রতিরোধ করা সম্ভব। খেলোয়াড় যাঁরা আছেন তাঁরাও যদি কথা বলেন, তাহলে বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

 

বিভাগীয় মেডিক্যাল কলেজে থ্যালাসেমিয়া ইউনিট করা হলে এ রোগ কমে যাবে

ডা. মোহাম্মদ শরীফ

২০০৮ সালের পর থেকে বর্তমান সরকার মা ও শিশু মৃত্যুর হারের দিকে ব্যাপক নজর দিয়েছে। ফলে এখন মা ও শিশু মৃত্যুর হার অনেকে কমে এসেছে। স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন এনজিও গুরুত্বসহ কাজ করছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে আমাদের কাজে নতুনত্ব নিয়ে আসতে হবে। আমরা স্বাস্থ্যের সঙ্গে পুষ্টি নিয়ে কাজ করছি। এ ছাড়া অটিজম একটি বড় সেক্টর ছিল যে সেক্টরটি নিয়ে কেউ কাজ করেনি। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সে সেক্টরটি নিয়ে চমৎকারভাবে গর্বের সঙ্গে কাজ করছেন। আমি দীর্ঘ সময় ধরে পাবলিক হেলথ সেক্টরে কাজ করছি। আমার মনে হয় সততার সঙ্গে গুরুত্ব সহকারে কাজ করলে সব কিছুই করা সম্ভব। সরকারের এই সেক্টরে এমন একটি অবস্থা এসেছে, এ সেক্টরে বরাদ্দে যে টাকা দেওয়া হয় সেগুলো কিন্তু আমরা খরচ করতে পারি না। আমাদের বিভাগীয় পুরনো মেডিক্যাল কলেজগুলো আছে এগুলোতে যদি থ্যালাসেমিয়ার জন্য আলাদা ইউনিট খোলা যায় তাহলে এ রোগগুলো অনেক কমে যাবে বলে মনে করি। তাই আমার পক্ষ থেকে বলার হলো বিয়ের আগে দুজনেরই ব্লাড টেস্টসহ থ্যালাসেমিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা।

 

রোগীর প্রতি সমাজের সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে

ফারহিন ইসলাম

আমার মা-বাবা দুজনই ডাক্তার। এর পরও আমার যেদিন থেকে থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়েছে সেদিন থেকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের পারিবারিক সহযোগিতার পাশাপাশি একটু সামাজিক সাপোর্ট প্রয়োজন। এর মানে আর্থিক কোনো সাপোর্ট নয়। একজন রোগী হিসেবে আমি মনে করি আক্রান্ত রোগীদের একটি কার্ড থাকা প্রয়োজন। তাহলে হাসপাতালে গেলে রক্ত ও ওষুধ পাওয়ার মতো সুবিধা পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া ডাক্তার কিংবা মা-বাবার ধারণা থাকে আক্রান্ত রোগী বেশিদিন বাঁচবে না। অনেক সময় আত্মীয়-স্বজন জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি এখনো বেঁচে আছ?’ এমনকি স্কুলে ভর্তির সময় এই রোগের কথা আমাকে লুকাতে হয়েছে। আমি চাই এগুলো পরিবর্তন হোক। এ জন্য প্রতিরোধে যেমন সচেতনতা প্রয়োজন, তেমনি সমাজের আচরণ ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। থ্যালাসেমিয়া রোগের একমাত্র কারণ বাহকের সঙ্গে বাহকের বিয়ে। এ জন্য বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি। আর যদি বাহকের সঙ্গে বাহকের বিয়ে হয়েও যায়, আগত সন্তান যেন থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত না হয় এ জন্য ভ্রূণ পরীক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী আছে।

 

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা জরুরি

অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ

থ্যালাসেমিয়া এমন একটি রোগ, যা রক্তশূন্যতা তৈরি করে। দুই ধরনের থ্যালাসেমিয়ার মধ্যে মেজর যেটা সেটা বেশি জটিল, মাইনরটা তেমন জটিল নয়। থ্যালাসেমিয়া হলে ব্যক্তি বেশি দুর্বল থাকে, সেটা অনেকে প্রথম দিকে বুঝতে পারে না। প্রস্রাবও ডার্ক হয়, শরীরের গ্রোথও দেরিতে হয়। এ ছাড়া মুখের হাড়গুলো একটু ব্যতিক্রম হয়। এ লক্ষণগুলো যদি দেখা যায়, তাহলে কিন্তু  চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এ সময় রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে থ্যালাসেমিয়ার থ্রেডটা আছে কি না। যদি মা-বাবার থ্যালাসেমিয়া থাকে, তাহলে কিন্তু জন্মের পরই সন্তানের হয়। থ্যালাসেমিয়া হলে ট্রিটমেন্টের চেয়ে জরুরি হলো বেশি আয়রন যাতে না হয়। ব্লাড ট্রান্সমিশন একমাত্র চিকিৎসা। রোগীর রক্তের সরবরাহ কমে যায়, তাই রক্ত তাকে দিতে হয়। আর এসব সচেতনতার জন্য মিডিয়ার একটি ব্যাপক ভূমিকা আছে। আর ‘বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে নিন’—এ কথা আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি, এখনো কিন্তু এটা হয়নি। আমাদের হিমোগ্লোবিন থ্রেড, থ্যালাসেমিয়া, এইডস, হেপাটাইটিস-বি আছে কি না এগুলো বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে জানা জরুরি। অন্যথায় সন্তানের মাধ্যমে ছড়াবে। তাই বিয়ের আগে দুজনেরই রক্ত পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি। সম্প্রতি একটি ট্রিটমেন্ট শুরু হয়েছে স্টেমসেল ট্রান্সপ্লান্ট। এটা করলে থ্যালাসেমিয়া থেকে মুক্ত হওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বড় কথা আমরা সচেতন হব। রক্তশূন্যতা আছে কি না এবং কী কারণে হলো পরীক্ষা করব। এ ছাড়া থ্যালাসেমিয়া রোগীর যদি রক্ত লাগে তার জন্য রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে আমাদের মেডিক্যালের ব্লাড ব্যাংকের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।

 

থ্যালাসেমিয়া শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য

প্রফেসর ডা. আবু জাফর মো. সালেহ

থ্যালাসেমিয়া রোগ জায়গাভেদে ভিন্ন রকম হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এক রকম, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আবার অন্য রকম। আমাদের দেশে ৭ থেকে ১০ শতাংশ মানুষের বিভিন্ন ধরনের হিমোগ্লোবিন অ্যাবনরমালিটিস আছে। এই চিকিৎসার জন্য দুটি জিনিস প্রয়োজন। একটি হলো প্রতিরোধ। আরেকটি হলো চিকিৎসাসেবা দেওয়া। থ্যালাসেমিয়া শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে আমরা তেমন কোনো সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে পারিনি। প্রতিরোধের জন্য ধাপে ধাপে চারটি পর্যায় আছে। ব্যক্তিসচেতনতা ও শিক্ষা, রোগের বাহককে চিহ্নিত করা, রোগীকে কাউন্সেলিং করা এবং বাহক যারা আছে তাদের আগত সন্তানদের কিভাবে রোগ থেকে মুক্ত করা যায়। এর চিকিৎসা দুই ধরনের হয়। একটি হলো রোগ থেকে সুস্থতা নিশ্চিত করা (বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট), অন্যটি হলো সাপোর্টিভ। পাশাপাশি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল ও ওষুধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ওষুধের অনুমোদন না থাকায় চোরাই পথে আসে। অনেক সময় আসতে দেওয়া হয় না। এতে রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

 

সচেতনতা-জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ সম্ভব

ড. ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার

যারা প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করে তাদের এ রোগ সম্পর্কে জানাতে ও বোঝাতে হবে। বংশপরম্পরায় এই রোগ হয় এবং তাদের সচেতনতার জায়গা সৃষ্টি করতে হবে। এই রোগ এমন কোনো বিষয় না যে সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে, বরং তাদের আরো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। থ্যালাসেমিয়া  প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে তাদের জ্ঞান খুব সীমিত। আর ধনী-গরিব বলে নয়, সচেতনতার বিষয়টি নিয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি মিডিয়া যার যার ক্ষেত্র থেকে সর্বাত্মক এগিয়ে আসতে হবে। তবেই জনসম্পৃক্ততা তৈরি হবে। কোথায় গেলে টেস্ট করা যাবে, পরে ট্রান্সমিশনের জায়গা থেকে কোথায় গেলে করতে পারবে, ওভারডোজ হয়ে গেলে ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন—এই তথ্যগুলো তাদের পরিষ্কার করতে হবে। কোথায় গেলে সেবা পাবে ও টেস্ট করার বিষয়টি সহজ করে দিতে হবে। জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ সম্ভব।

 

থ্যালাসেমিয়ার বিরুদ্ধে সম্মিলিত লড়াই করতে হবে

তৌফিক মারুফ

সম্মিলিতভাবে থ্যালাসেমিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এটি একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের লড়াই নয়। সবাইকে একসঙ্গে, একযোগে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে যেতে হবে। তবেই এই রোগ প্রতিরোধ তথা মুক্ত করা সম্ভব। তাই সরকারি, ব্যক্তিগত, সামাজিক গণমাধ্যম—সব দিক থেকে এই সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। তবেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো সর্বস্তরের সচেতনতা। থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় বিয়ের আগে পরীক্ষা করা। পরীক্ষিত মা-বাবা পারেন সুরক্ষিত সন্তান নিশ্চিত করতে।

 

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধযোগ্য

আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম

প্রতিবছর কত সংখ্যক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নিচ্ছে সেই হিসাব অনুযায়ী আমাদের কাজ করতে হবে। কারণ আগে থেকেই যদি চিকিৎসা দেওয়া যায় তাহলে প্রতিরোধ করা সম্ভব। থ্যালাসেমিয়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত বাচ্চাদের গ্রোথ থেমে যায়। কিছুদিন পর পর রক্ত দিতে হয়। পরবর্তী সময়ে সপ্তাহে দুই-তিনবার রক্ত দিতে হয়। একসময় অভিভাবকদের এই সক্ষমতাও থাকে না। আক্রান্ত বাচ্চাদের এবং তাদের বাবা-মায়ের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। থ্যালাসেমিয়ার বাচ্চারা যখন আসে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় তার প্লিহা অনেক বড় হয়ে যায়। সেটার জন্য ঠিকমতো হাঁটতেও পারে না। ওজন কমে যায়। আবার অনেকে প্রেগন্যান্সির সময় বলেন, আমার কিছু হলে বাচ্চাটাকে দেখবেন। কারণ মায়ের থেকেও বাচ্চার এই রোগ হতে পারে। পরে দেখা যায় মা মারা গেছেন। সব মিলিয়ে খুবই কষ্টদায়ক এসব দৃশ্য। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন সেটা আমরা করতে সর্বদা প্রস্তুত আছি।

 

সরকারিভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পরিচয়পত্র থাকা উচিত

অধ্যাপক ডা. মাসুমা রহমান

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন ২০০২ সাল থেকে রোগীদের জন্য কাজ করছে। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, একটা সময় ছিল যখন থ্যালাসেমিয়া হতো তখন মা-বাবা দুজনেই হতাশ হয়ে যেতেন। পরে এই রোগীগুলোকে দেখা যেত দৌড়ে দৌড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো রক্তের জন্য, আবার কখনো ওষুধের জন্য। বেশির ভাগই দেখা যেত ২০ বছর পার করতে পারত না। এখন আমাদের সরকারি পর্যায়ে কিছুটা সচেতনতা এসেছে এবং কিছু কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করছে এটা নিয়ে কাজ করতে। বলা হচ্ছে, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বিনা মূল্যে রক্ত দান করা হবে। এ ছাড়া আমাদের সবচেয়ে অভাব হলো আমরা নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে পারছি না। এই অপ্রতুলতা রয়েই গেছে এখন পর্যন্ত। এ ছাড়া আমাদের ওষুধের সমস্যা আছে। আর বেশির ভাগ হাসপাতাল রাজধানীকেন্দ্রিক। অথচ বিভিন্ন জেলায় আমাদের রোগী রয়েছে, তারা ঢাকায় এসে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি যায়। যদি সরকারি পর্যায়ে কমপক্ষে বিভাগীয় পর্যায়ে থ্যালাসেমিয়া সেন্টার করা যায় তাহলে রোগীগুলোর কষ্ট কম হবে এবং তারা বেঁচে যাবে। অন্যদিকে আমরা বলছি ৭ শতাংশ বা ১০ শতাংশ থ্যালাসেমিয়া ধারক বা বাহক, কিন্তু আমরা সঠিকভাবে জানি না আমাদের দেশে কত শতাংশ থ্যালাসেমিয়া রোগী বা বাহক আছে। সে ক্ষেত্রে আমি মনে করি, সরকারিভাবে একটি পরিচয়পত্র থাকা উচিত। এ রোগীগুলো যদি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে যায় তারা যেন একটু সুযোগ-সুবিধা পায়। আর থ্যালাসেমিয়া একটি ইউনিক রোগ। এ রোগের জন্য মা-বাবা দায়ী। তাই আমরা মা-বাবা যারা আছি তাদের অসচেতনতার জন্যই পরে আমাদের বাচ্চারা থ্যালাসেমিয়া রোগী হয়। তাই বিয়ের আগে একটা ছোট্ট পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা এই বিষয়ে সচেতন হতে পারি।

 

দেশে ৫০ লাখের বেশি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে

খালেদা আক্তার সিনথিয়া

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা, থ্যালাসেমিয়া থেকে সন্তান সুরক্ষা। থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় বিয়ের আগে সহজ একটি রক্ত পরীক্ষা (হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস) করা। ছোট একটা পরীক্ষাই পারে একটি পরিবার ও শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। রক্তস্বল্পতাজনিত মারাত্মক এই বংশগত রোগটি প্রধানত দুই প্রকার—আলফা থ্যালাসেমিয়া, বিটা থ্যালাসেমিয়া। বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলফা থ্যালাসেমিয়া তীব্র হয় না। অনেক ক্ষেত্রে রোগী স্বাভাবিক জীবন যাপন করে।

বিটা থ্যালাসেমিয়া দুই রকমের হতে পারে। একটি বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর। এদের থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বা ক্যারিয়ার বলে (এরা মূলত রোগটির বাহক)। অপরটি থ্যালাসেমিয়া মেজর। থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। বাবা-মা উভয়ে থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট হলে ভূমিষ্ঠ শিশুর শতকরা ২৫ ভাগ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আবার বাবা-মার মধ্যে একজন যদি সুস্থ থাকে সে ক্ষেত্রে ভূমিষ্ঠ শিশুর থ্যালাসেমিয়া হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না, তবে থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

থ্যালাসেমিয়া মাইনরে সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। থ্যালাসেমিয়া মেজরে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনই প্রধান চিকিৎসা। রোগীকে ঘন ঘন রক্ত দিতে হয় বলে শরীরে আয়রনের মাত্রা বাড়তে থাকে। আয়রন চিলেটর (ডেফিরক্স) এর মাধ্যমে তা কমাতে হয়। অতিরিক্ত আয়রন জমা হয় হৃৎপিণ্ডে, যকৃতে, অগ্ন্যাশয়ে, যার কারণে অঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে। এ রকম পরিস্থিতিতে সঠিক চিকিৎসা না পেলে রোগী মারা যেতে পারে।



সাতদিনের সেরা