kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

ইস্পাতশিল্পের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালা চায় উদ্যোক্তারা

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩৮ মিনিটে



ইস্পাতশিল্পের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালা চায় উদ্যোক্তারা

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

নির্মাণসামগ্রী ও উপকরণ তৈরিতে বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস বিদ্যুৎ এবং বাড়তি শুল্ক-করের বোঝা না চাপানো হলে এই শিল্পকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। কালের কণ্ঠ ও শাহরিয়ার স্টিল লিমিটেড আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় উদ্যোক্তাদের এসব দাবির প্রেক্ষাপটে বৈঠকেই সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা ইস্পাতশিল্পের প্রসার শুল্ক ও কর ছাড়ের আশ্বাস দেন। গ্রন্থনা : এম সায়েম টিপু, সজিব হোম রায়, রফিকুল ইসলাম।

একটা দেশের উন্নয়ন বিবেচনা করা হয় সে দেশের স্টিল ব্যবহারের ওপর

টিপু মুনশী

প্রতিবছর আমরা বড় বড় বাজেট করছি। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু লক্ষ রাখতে হবে সীমিতসংখ্যক মানুষের ওপর করের চাপ না দিয়ে করজাল আরো বাড়াতে হবে। আমাদের ধারণা, ২০ শতাংশ মানুষের কর দেওয়ার সক্ষমতা বেড়েছে। এই করজাল বাড়ানো গেলে অন্যদের ওপর চাপ পড়বে না। উন্নয়নের কর্মকাণ্ডে যারা উপকৃত হয়েছে তাদের ওপর কর বাড়বে।

দেশে মাথাপিছু স্টিল ৪৫ কেজি কিন্তু আশপাশের অনেক দেশের চেয়েও আমাদের বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশের চেয়ে কম কিন্তু অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি। পাকিস্তানের চেয়েও আমরা বেশি। এটা আরো বাড়বে। স্টিলশিল্পে যতটা প্রয়োজন তারচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়। তবে বিশ্ব বাণিজ্যযুদ্ধে আমেরিকা-চীনের লড়াইয়ে আমরা কতটা সুযোগ নিতে পারব? সেই বিশ্বমানের পণ্য তৈরি আমরা করতে পারছি কি না, সেটাও ভেবে দেখতে হবে।

আজকে গার্মেন্টশিল্প অনেক এগিয়েছে। কিন্তু ৩৫ বছর আগে এটি এ রকম ছিল না। ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে গার্মেন্ট কারখানা করা হয়েছে। বিশ্বের ১০টি গ্রিন ফ্যাক্টরির মধ্যে সাতটিই আমাদের। ১০০টির বেশি গ্রিন ফ্যাক্টরি এখন বাংলাদেশে। পৃথিবীর এক নম্বর ওয়াশিং প্ল্যান্ট দেশে।

একটা দেশের উন্নয়ন বিবেচনা করা হয় সে দেশের স্টিল ব্যবহারের ওপর। কতটুকু তারা স্টিল ব্যবহার করে, সে বিষয়ে। সেদিক থেকে আমরা অনেক এগিয়েছি। এই শিল্প খাতের বর্জ্য শতভাগ রিসাইক্লিং। কোথাও ফেলে দেওয়ার কিছু নেই। বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার কিছু নেই। ৩০ শতাংশ কাঁচামাল আসে বর্জ্য থেকে। গ্রামে-গঞ্জে ঝুড়ি নিয়ে খুঁজে খুঁজে এটি নিয়ে আসা হয়।

তবে সব খাতেই কিছু না কিছু সমস্যা থাকে, স্টিলশিল্পেও রয়েছে। তবে করসংক্রান্ত বিষয়ে রাজস্ব বোর্ড ভেবে দেখবে। দেশকে এগিয়ে নিতে ছোট ছোট সমস্যা উতরে এগিয়ে যেতে হবে। একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

আর সবাই এগিয়ে এলে আমরা সুন্দর দেশ গড়তে পারব।

স্টিল শিল্পের উন্নয়নে সব ধরণের সহায়তা করা হবে

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়নের হাইওয়েতে আমরা। কিন্তু আমাদের দেশে আরো অনেক উন্নয়নের দরকার। ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য সরকারের পলিসি আছে, দেশের শিল্পপতিদের জন্যও পলিসি আছে। শিল্পের উন্নয়ন হলে দেশেরও উন্নয়ন হবে। স্বাধীনতার পর সরকার শিল্প খাতের উন্নয়নে যেভাবে এগিয়ে এসেছে, দেশের মানুষ পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে, সেটাকে এখন আর সমস্যা হিসেবে দেখছি না।

পাকিস্তান সময়ে সরকারি আনুকূল্যে যে স্টিল মিল তৈরি করা হয়েছিল, সেটি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। চিটাগাং স্টিল লোকসানে পড়ায় সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন ১০০ স্টিল মিল তৈরি হয়েছে। ৪০-৪৫টি মানসম্মত। বলতে গেলে দেশে স্টিলের ক্ষেত্রে অলিগোপলি আছে। কিছু ভালো ভালো স্টিল মিলও তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর যত দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে গিয়েছে, স্টিল সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়েছে। আর তখনই দেশ এগিয়ে যায়। এখন দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বেশি স্টিল ব্যবহার করে। মাথাপিছু স্টিল ব্যবহার প্রায় এক হাজার ৪৭ কেজি। বাংলাদেশে আমরা ব্যবহার করি মাথাপিছু ৪৫ কেজি। কিন্তু দেশে প্রতিবছর স্টিলের ব্যবহার বাড়ছে। সেটার কারণ আমাদের দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। আমাদের যে স্টিল মিল আছে, তারা আট মিলিয়ন উৎপাদন করতে পারে কিন্তু ২০১৯ সাল পার হলে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন উৎপাদন করতে পারবে। আমাদের দেশে চাহিদাও অবশ্য ১০-১২ মিলিয়ন।

দেশীয় শিল্পের বিশেষ করে স্টিলশিল্পের জন্য যথেষ্ট সহায়তা দিয়ে থাকি। তারপরও আলোচনায় যেসব বিষয় এসেছে, এই শিল্পে কস্ট অব প্রডাকশন বেশি। উৎপাদনে খরচ বেশি কিন্তু বিক্রির পর মুনাফা কম। যার কারণে বিক্রির ওপর কর আদায় করতে পারি না। ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায়ের সময় টার্নওভারের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু এই খাত থেকে আমরা সেটা করতে পারি না। স্টিলশিল্পে ভ্যাটের বিশেষ হার নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়করের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রেও আমরা ভ্যাট কমিয়েছি। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। যেমন—জাহাজ ভাঙা ও স্থানীয় স্ক্র্যাব। গত বছর যেকোনো জোগানের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ৭.৫ শতাংশ কর ছিল। এ বছর অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে একই আছে। রডের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ করা হয়েছে।

রড ও সিমেন্টের ক্ষেত্রে ইনকাম ট্যাক্স আগের বছরের চেয়ে কমিয়ে ফাইনাল করে দিয়েছি। এই শিল্পে আয় কম হওয়ায় আমরা যে ৫ শতাংশ অ্যাডভান্সড ইনকাম ট্যাক্স নিই, সেটা ৪ শতাংশ ফিরিয়ে দিতে হয়।

কাজেই রিফান্ডের যে সিস্টেম, অনেকে লোকসান দেখিয়ে আয়কর দিতেই চায় না। এ ক্ষেত্রে সবটুকুই রিফান্ড হয়।

সমস্যার ভালো সমাধান করতে পারলে এই শিল্পটি দেশের জন্য খুব বড় সুফল বয়ে আনবে

ইমদাদুল হক মিলন

গত ১৫ বছরে আমরা লক্ষ করেছি দেশের স্টিলশিল্প অনেক দূর এগিয়েছে। আমরা একটা সময় পর্যন্ত এই শিল্পের কথা টের পাইনি। তবে সেই শিল্পটি গত ১৫ বছরে অনেক এগিয়েছে, যা ক্রমেই অনেক বড় জায়গায় পৌঁছেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় জানতে পেরেছি, এই শিল্পকে ঘিরে অনেক সমস্যা রয়েছে। আমার বিশ্বাস এই সমস্যার ভালো সমাধান করতে পারলে এই শিল্পটি দেশের জন্য খুব বড় সুফল বয়ে আনবে।

আমরা বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। এই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা এ দেশকে পেয়েছি। স্বাধীনের পর থেকে প্রতিদিন চেষ্টা করেছি দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বাংলাদেশ এখন একটি উন্নয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। আমরা উন্নয়নের শীর্ষ চূড়া স্পর্শ করার দিকে এগোচ্ছি। এই অবস্থায় আমাদের প্রত্যেকের উচিত দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশের জন্য কাজ করা। যে শিল্পের যতখানি প্রয়োজন, সরকার ততটুকুই করে দেবে এমন বিশ্বাস করি আমরা। দেশের কল্যাণ কামনা করে এমন প্রত্যেক মানুষই কাজগুলো করতে এগিয়ে আসবে।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার চিন্তাকে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তাঁর উন্নয়নের সঙ্গে শরিক হতে চাই। আমরা কালের কণ্ঠ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। যাতে এই খাতের অন্ধকার কেটে যায়। আমাদের এই ধরনের আয়োজনের বক্তব্য থেকে শিল্প খাতে অনেক ধরনের অগ্রগতিও এসেছে। আমরা কালের কণ্ঠ পরিবার, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ তার আপন গতিতে এগিয়ে যাবে। আমাদের বসুন্ধরা গ্রুপের মূল স্লোগান হচ্ছে ‘দেশ ও মানুষের কল্যাণে’। আমরা সবাই মিলে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলব।

স্টিল এমন একটি শিল্প, যেটা মানুষের মেরুদণ্ডের মতো

মোস্তফা কামাল

স্টিল এমন একটি শিল্প, যেটা মানুষের মেরুদণ্ডের মতো। যেকোনো ইমারত নির্মাণ করতে হলে স্টিল ছাড়া সম্ভব নয়। একটি ইমারতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায় স্টিল। কাজেই দেশের এই শিল্পকে অবহেলা করলে চলবে না। এই শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। আমরা দৈনিক কালের কণ্ঠ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার আয়োজন করি।

উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশে বর্তমানে স্টিলশিল্প আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এই স্টিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এই শিল্পকে মানুষের কাছে তুলে ধরা, মানুষকে জানানো ও সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার আয়োজন। মূলত এই শিল্প সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, স্টিলশিল্পের সমস্যা সম্পর্কে সরকারের নজরে বা দৃষ্টিগোচরে আনা। যাতে সরকার সমস্যাগুলো বুঝতে পারে ও সেগুলো সমাধানে এগিয়ে আসে।

দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, দেশও এগিয়ে চলছে। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলের মতো বড় বড় মেগা প্রকল্প চলমান। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নও চলছে। দেশের অবকাঠামো বা মেগা প্রকল্পে দেশীয় ইস্পাতশিল্পের আরো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দেশের এই শিল্পকে উৎসাহিত করতে সরকারের নীতি সহায়তা প্রয়োজন। দেশি শিল্পকে উৎসাহিত করতে বিদ্যমান নানা সমস্যার সমাধান করতে হবে। একটি শিল্পে নানা সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু সেটিকে এগিয়ে নিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। নীতি-সহায়তা দিয়েও দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে ও এগিয়ে নিতে হবে সরকারকে।

ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হবে

অরিজিৎ চৌধুরী

দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্টিল ইন্ডাস্ট্রির মতো বড় বড় শিল্পগুলোকে কিভাবে সাহায্য করা যায় তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ জন্য সরকার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে এ ধরনের শিল্পগুলো কিভাবে নতুন উদ্যোক্তা পেতে পারে তা নিয়ে আমাকে আহ্বায়ক করে পৃথক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আমরা সুপারিশ দিয়েছি। সরকার তা বিবেচনা করছে। এসবের মাধ্যমেই সরকার আপনাদের নানাভাবে সহযোগিতা করছে।

দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রকল্পের মাধ্যমে এরই মধ্যে একটি কম্পানি ৪৪ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আমরা সব সময় পরিবেশগত ইস্যুগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কারণ আন্তর্জাতিক মান যদি এখন থেকেই আমরা অনুসরণ না করি তাহলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে যাব। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে বড় বড় শিল্পকে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের বীমার আওতায় আনা যেতে পারে। তাহলে দুর্ঘটনায় শিল্প এবং শ্রমিক দুটিই আর্থিক সহায়তা পাবে। ফলে ঝুঁকি অনেকটাই নিরসন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি অর্থনীতিতে বড় বড় সেক্টরের অবদান আরো বাড়বে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বন্ড মার্কেট নিয়েও কাজ করছি। বড় সেক্টরগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে সাপোর্ট দেওয়া যায় কি না, আর্থিক সহায়তা করা যায় কি না সেটার উদ্যোগও আমরা নিচ্ছি। এসব উদ্যোগ যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে আশা করি অর্থায়নের দিক থেকে স্টিল ইন্ডাস্ট্রির মতো বড় বড় ইন্ডাস্ট্রির আর কোনো সমস্যা হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, স্টিল ইন্ডাস্ট্রির জন্য আমরা ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থায়ন করতে পেরেছি। সুতরাং অর্থায়নের কোনো অসুবিধা হবে না।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ অতিরিক্ত সচিব বলেন, ঋণখেলাপি এখন একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে সরকার ঋণ পুনঃ তফসিলের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধা নিলে স্টিল ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসায়ীরা ঋণ পুনর্গঠন ও পুন ঃ তফসিল করতে পারবে।

পরিবেশ ক্ষতি করে শিল্প নয়

নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথ

“আমাদের সামনে এখন এসডিজি আছে। এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১৯৩টি দেশের মধ্যে আমাদের অবদান উল্লেখযোগ্য। এসডিজিতে ‘পরিবেশ’ একটি বড় ব্যাপার। এসডিজিকে কোনোভাবেই লঙ্ঘন করা যাবে না। এসডিজির একটি বড় জায়গা জুড়ে প্রকৃতি রয়েছে। তাই প্রকৃতিকে কোনো অবস্থাতেই ডিস্টার্ব করা যাবে না।

আমাদের মানবসম্পদের কোনো ঘাটতি নেই। এটিকে কিভাবে ব্যবহার করবেন তা ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে। আর তার ওপর নির্ভর করে শিল্প খাত কতটুকু এগোবে।”

তিনি বলেন, ‘আমাদের সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলতে হবে। আইএসও এর মান অনুযায়ী আমাদের সব কিছু করতে হবে। এর ব্যত্যয় করা যাবে না কোনোভাবেই। জাহাজ ভাঙা শিল্প বা রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে মেয়াদটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন তা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রিসাইক্লিং করা যায়। আমাদের দেশ ছোট, প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, গ্যাসও কম। তাই সব কিছুই বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে। তবে যা-ই করা হোক না কেন পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হতে হবে। এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন ২০৪১ এর আগে আমরা উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে পারি।’

স্ক্র্যাব শিল্পের উন্নয়নে এআইটি মওকুফ করা হোক

শেখ আজহার হোসেন

রডের কাঁচামাল স্ক্র্যাব ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ উৎস কর (এআইটি) আরোপ করা হয়েছে। এমএসরড প্রস্তুতের কাঁচামাল স্ক্র্যাব। এই স্ক্র্যাবের প্রায় ৩০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস  থেকে। ২০১৯-২০ বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর সেকশন ৫২(১) proviso (b) বিলুপ্ত করা হয়। এই সেকশন ৫২(১) proviso (b) বিলুপ্ত করার ফলে স্টিলের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের ওপর ৩ শতাংশ উৎস কর প্রদান করতে হবে। ফলে প্রতি মেট্রিক টন স্ক্র্যাপ ক্রয়ের জন্য কর (অওঞ) প্রদান করতে হবে প্রায় এক হাজার ৫০ টাকা, যা আগে করমুক্ত ছিল। এই স্ক্র্যাপ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মুনাফার পরিমাণ খুবই সামান্য (টনপ্রতি ২০০ টাকার কাছাকাছি)।

সে ক্ষেত্রে টনপ্রতি এক হাজার ৫০ টাকা উৎস কর আয়ের বা মুনাফার প্রায় পাঁচ গুণ। ফলে স্টিল উৎপাদনকারীরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করা দুঃসাধ্য হবে। তাই রডের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎস কর (AIT) প্রত্যাহার জরুরি।

পিক টাইমে বিদ্যুতের যে মূল্য অফ পিকে সেটা কমে যায়

সাঈদ আহমেদ

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) সাঈদ আহমেদ বলেন, গত গ্রীষ্মে আমাদের পিক টাইমে ডিমান্ড ছিল ১৩ হাজার মেগাওয়াট। আর অফ পিকে সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট। শীতে পিকে প্রায় ৯ হাজার আর অফ পিকে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। এই অফ পিক টাইমটা স্টিল মালিকরা ব্যবহার করতে পারেন। পিক টাইমে বিদ্যুতের যে মূল্য অফ পিকে সেটা কমে যায়। সুতরাং এই সুযোগটা তাঁরা নিতে পারেন। অফ পিকে বিদ্যুতের বিলও অনেক কম। ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ সংযোগে কোনো সমস্যা হয় না। এ ছাড়া ৩৩ কেভি নিয়ে যে সমস্যা আছে তা আমরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।

বিদ্যুতের কারণে স্টিলশিল্প আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে

ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ হোসেন

বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের কোনো সমস্যা নেই। ব্যবসায়ীদের কম দামেও বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। একটা সময় বিদ্যুতের অবস্থা কোথায় ছিল, আর এখন কোথায় গেছে। অনেক উন্নতি হয়েছে বিদ্যুতে। একসময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট বলতে ১০ ঘণ্টার বেশি ছিল। কিন্তু এখন সেটা নেই। কোনো কিছু মেরামত বা সংযোগের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয় স্বল্প সময়ে। কিছু কিছু সময় বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সি ওঠানামা করে। গ্রিডের ওপর ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ীদের বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করা হচ্ছে। আমরা বলতে পারি বিদ্যুতের কারণে স্টিলশিল্প আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তবে পাঁচ বছরে বিদ্যুতের দাম সেভাবে বাড়ানো হয়নি। যদিও ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন বাড়ানো হয়েছে। আমরা রূপকল্পের মধ্যে আছি, বড় বড় মেগা প্রকল্প করছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট তৈরি হলে স্থিতিশীলতা আরো আসবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। আপনারা সবাই এই সুযোগ নেন। আপনারা বিদ্যুৎ চান ও গ্যাস চান। সরকার এরই মধ্যে জোনিং করে দিয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আর আমরা অগোছালোভাবে থাকতে চাই না। আমাদের সম্পদের অভাব নেই। সবাই মিলে কাজ করলে এই খাতটিও আর পড়ে থাকবে না। আর কোনো সমস্যাও থাকবে না।

শিপ ব্রেকিং খাতের উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে

মাস্টার আবুল কাসেম

শিপ ব্রেকিং খাতের কাজ শুধু বাংলাদেশেই নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও হয়। প্রথম চালু হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে। বাংলাদেশে ১৯৬০ সাল থেকে শিপ ব্রেকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে চালু আছে ভারত, পাকিস্তান, চায়না, তুরস্ক, থাইল্যান্ডসহ আট থেকে ১০টি দেশে। এই শিল্প দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। আজকের বিশেষ অতিথি এনবিআর চেয়ারম্যান একসময় আমাদের মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন।

 তিনি সরেজমিনে এই শিল্প এলাকা সফর করেছেন। এই শিল্প নিয়ে সব কিছু তাঁর নখদর্পণে। কিন্তু এখন শিপ ব্রেকিং খাত সংকটে পড়তে যাচ্ছে। অনেকটা আমাদের পাটশিল্পের মতো। দেশের পাট কারখানাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আমার বাড়িও জুটমিল এলাকায়। এসব এলাকায় ৭৪টি জুটমিল ছিল। নানা অজুহাতে আজ ৭৪টি কারখানাই ধ্বংস হয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আমাদের আদমজী জুটমিলও আমরা বিক্রি করে দিয়েছি। ঠিক তেমনি শিপ ব্রেকিং যখন বিশ্বে এক নম্বরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এই সময় আমাদের পাটকলগুলোর মতো অপপ্রচার শুরু করেছে।

আমি আজকের গোলটেবিল বৈঠকে সবার কাছে আহ্বান জানাই, এই শিল্পের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার শুরু হয়েছে তা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে। যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে এই শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। যেন এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আজ দুষ্টু মানুষরা ফলবতী বৃক্ষ নষ্ট করার পাঁয়তারায় নেমেছে। কারণ এই শিল্পের উত্থান কারো কারো সহ্য হচ্ছে না। আজ যেমন শতচেষ্টা করেও পাটশিল্পকে এগিয়ে নিতে পারছি না।

আমরা এই শিল্পের অংশীদার হলেও বিএসটিআই আমাদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা না করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ফেলে। দেশে ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন লোহার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টন শিপ ব্রেকিং থেকে আসে। এটা শিল্প, শুধু শিপ ব্রেকিং নয়। এটা একটি মাদার প্রতিষ্ঠান। এর ওপর নির্ভরশীল স্টিল মিল, রি-রোলিং মিল, এমনকি বাংলাদেশের যতগুলো বড় বড় শিল্প খাত আছে এর প্রতিটি খাত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। সেটাকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখবে সেদিকে নজর না দিয়ে কীভাবে গলা টিপে হত্যা করা যায় সেদিকে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। অথচ প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালে এর সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে এই খাতকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এর জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে নীতিমালা ও বিধিমালা হয়েছে। আমার অনুরোধ, বিএসটিআই যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সেটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসে প্রত্যাহার করে নেবে।

স্টিল শিল্পের দিন খুব ভালো যাচ্ছে না, সামনে বিশ্বমন্দা আসছে, সেই বিশ্বমন্দায় বাংলাদেশেও চাপ পড়বে

মনোয়ার হোসেন

স্টিল শিল্পের ব্যবসা বিশ্বব্যাপী মন্দা যাচ্ছে। মন্দার কথা বলতে গেলে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। আমি ১৯৯৪ সাল থেকে ব্যবসা করছি। এ সময়ে কখনো আমাকে একটি দিনের জন্যও আমাদের স্টিল মিল লে অফ করতে হয়নি। চলতি বাজেটের পর গত জুন মাস থেকে ১৯ দিনের জন্য আমাদের কারখানায় লে অফ করতে হয়েছে। বাজারে এ খাতের চাহিদা কমেছে। এটাই শেষ নয়, সামনে আরো কঠিন দিন আসছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা মাত্র শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপে একটা কঠিন মন্দার সময় আসছে। এর ভালো রকমের একটা ধাক্কা আমরাও পাব। সামনের দিনগুলো আরো কঠিন হবে। এ জন্য আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী, আপনি শুধু দেশের পৃষ্ঠপোষকই নন, আমাদের মুখপাত্রও। আমাদের ভয়েস আপনার ভয়েসে রূপান্তরিত হয়। এ ছাড়া এনবিআর চেয়ারম্যান গত দুই বছর আমাদের অনেক সুরক্ষা দিয়েছেন। যতটুকু পেয়েছি, তাঁর আন্তরিক সহযোগিতার কারণে পেয়েছি। স্টিল শিল্পে অতিরিক্ত সাড়ে ৬ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছিল।

এটা কিছুটা কমানো হয়েছে; যদিও এখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। যতটুকুই হয়েছে এনবিআর চেয়ারম্যান নিজ উদ্যোগেই করেছেন। এ জন্য তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

আমাদের শিল্পে আয়করের সম্পর্ক আয়ের সঙ্গে হয় না

জহির এইচ চৌধুরী

ইনকাম ট্যাক্স নামের মধ্যেই এর অর্থ আছে, যেটাকে আমরা আয়কর বলি। এটা আয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক থাকার কথা। আইনেও তা বলে। কিন্তু আমাদের শিল্পে আয়করের সম্পর্ক আয়ের সঙ্গে হয় না। এআইটি বা অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স নামে একটি ন্যূনতম কর যুক্ত থাকার কারণে আমাদের আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ ট্যাক্স হওয়া উচিত। অথচ আয়ের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়। তাই আমাদের অনুরোধ, এ বিষয়গুলো আরো একটু গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আমার যদি কোনো কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা বেতন দিই, সেই হিসাবে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা তাঁর ইনকাম ট্যাক্স হবে।

 তাঁকে কি আমি বলতে পারব, ৫০ হাজার টাকার ওপর আপনি দেড় লাখ টাকা ইনকাম ট্যাক্স দেন? কিন্তু এই শিল্পের ক্ষেত্রে সেটা হয়ে যাচ্ছে।

কারণ বিক্রয়ের একটি অংশকে কর হিসেবে ধরা হচ্ছে। ইনকাম ট্যাক্স একটি ডাইরেক্ট ট্যাক্স। আয়ের সঙ্গে এর একমাত্র সম্পর্ক। এই আয়টা ইনকাম ট্যাক্সের লোকজন অ্যাসেস করে। তাদের অ্যাসেসে করা ইনকামের ওপর ট্যাক্সটা হওয়া উচিত।

মিনিমাম ট্যাক্স, এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। আমেরিকাতে এটার উৎপত্তি। গত বছর থেকে এটাকে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। ভারতে আছে। সেটা হলো অ্যাসেস ট্যাক্স। অ্যাসেস প্রফিট এবং বুক প্রফিট। বুক প্রফিট যদি বেশি হয়ে থাকে, বুক প্রফিটে ১৮ শতাংশ মিনিমাম ট্যাক্স হয়ে থাকে। কিন্তু এটা ফাইনাল ট্যাক্স না। এটা ভবিষ্যৎ দায় হিসেবে সমন্বয় হওয়ার জন্য।

আমাদের দেশের সরকার আগেই ঘোষণা দিয়ে দেয় এত টাকা আমরা ট্যাক্স নিয়ে নেব। এটা ফাইনাল ট্যাক্স। সুতরাং এ বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দৃষ্টি দেওয়া দরকার, স্টিলশিল্পের জন্য এটা কোন জায়গায় প্রযোজ্য। আমাদের বিক্রির ওপর ৩ শতাংশ হারে এআইটি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্ক্র্যাপ আমদানি পর্যায়ে ৮০০ টাকা মিনিমাম ট্যাক্স ছিল। ৩০০ টাকা এআইটি ছিল। সেটা ৫০০ টাকা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সরকার এটাকে মিনিমাম ট্যাক্স হিসেবে অভিহিত করছে। ফলে সরকার এটা নিয়ে নেবে। এটা সমন্বয় করার কোনো উপায় নেই। কারণ আমাদের প্রকৃত ইনকাম প্রতি টন রডের ওপর যে আয় হয় সেটা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকার মতো। এ ছাড়া বর্তমানে স্টিলশিল্প একটু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আয় কম। অন্যদিকে সরকার যেহেতু এআইটি কেটে নিয়েছে, ফলে শিল্পের লোকসান হলেও কর দিতে হবে। এটা ইনকাম ট্যাক্সের কোনো নিয়মের ভেতর পড়ে না।

দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আমরাও পরিবেশ নিয়ে সতর্ক

মো. শহীদুল্লাহ

বাংলাদেশের যেকোনো স্থাপনায় ব্যবহারের জন্য আমরা বিশ্বমানের স্টিল উৎপাদন করছি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল কিভাবে আসে? আমরা সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মেল্টিং স্ক্র্যাব আমদানি করি। এটিকে রিসাইকেল করে ব্যবহার করতে হয়। শিপইয়ার্ড থেকে কাঁচামাল খুব কম কিনতে হয়। বাংলাদেশের রিজেক্ট স্টিল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর সেটিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ব্যবহার উপযোগী করি।

১৯৯৭ সালের আগেও স্টিলশিল্পের বাতাসে ধূলিকণার মাত্রা বিবেচনায় এসপিএম ৫০০ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পরিবেশের কথা চিন্তা করে সেটাকে কমিয়ে ২০০ করা হয়েছে। ভারতে স্টিলশিল্প উৎপাদন এলাকায়ও এসপিএম অনেক বেশি, কিন্তু আমাদের কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমাদের দাবি, এসপিএম কোনো ক্রমে ২০০ পার হলে অনেক সময় লাইসেন্স আটকে দেওয়া হয়। হয়রানি করা হয়। আমাদের দাবি এসপিএম ৫০০ করা হোক। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আমরাও পরিবেশ নিয়ে সতর্ক। স্টিল উৎপাদনের জন্য ভারতও ছাড় দিয়েছে।

আমরাও সেই ক্ষেত্রে ছাড় প্রত্যাশা করছি। দেশের পরিবেশের সুরক্ষার জন্য আমরাও কাজ করছি।

জাহাজ ভাঙাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে

ইঞ্জিনিয়ার সাজ্জাদুল বারি

বিএসটিআই শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান। স্টিল বা ইস্পাত শিল্পের ক্ষেত্রে আমরা তিনটা কাজ করে থাকি। এগুলো হলো, মান প্রণয়ন, টেস্ট করা এবং সার্টিফিকেট দেওয়া। একটি কমিটির মাধ্যমে এই মান প্রণয়ন করা হয়। বিএসটিআইয়ের মান নিয়ে বাজারজাত করা বাধ্যতামূলক। জাহাজ ভাঙাকে যেহেতু একটি শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে তাই তাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

তারা যদি আমাদের বরাবর আবেদন দেন তাহলে আমরা এর মান নির্ণয় করব। কমিটি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। প্রয়োজন মোতাবেক আমরা তাদের ডাকব। এসংক্রান্ত আসলে গবেষণা দরকার।

ইস্পাত শিল্পের উচ্ছিষ্ট ফেলে না দিয়ে কাজে লাগাতে হবে

অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন

বাংলাদেশ একটি অভাগা দেশ। আমরা যখন ইট তৈরির উৎস হিসেবে মাটি পাই, তখন সরকার সহযোগিতা না করলে মাটি দিয়ে ইট তৈরি করা যাবে না। খনি থেকে আমরা পাথর তুলে এটা কাজে লাগাই। কিন্তু এসবের যথেষ্ট উৎস থাকলেও ইস্পাতের তেমন কোনো উৎস নেই। যার ফলে আমরা ইস্পাত উৎপাদনে অবদানও রাখতে পারছি না। আবার অনেক সময় ইস্পাতের উচ্ছিষ্ট অংশটুকু আমরা কাজে না লাগিয়ে ফেলে দিই। তাই আমাদের উচিত এই পরিত্যক্ত অংশটুকু না ফেলে কিভাবে কাজে লাগানো যায় তার ব্যবস্থা করা। যাতে করে দেশের জিনিস ব্যবহারের প্রতি দেশীয়রা আরো অনুপ্রাণিত হয় ।

ফলে দেশীয় মালামাল ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে।

ইস্পাত কারখানায় মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদেরকেও কাজে লাগাতে হবে

অধ্যাপক ফাহমিদা গুলশান

যেকোনো দেশের উন্নয়নের জন্য ইস্পাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু তার জন্য দরকার গুণগত মানের ইস্পাত। দেখা যায়, আমাদের দেশে বিদেশি যাঁরা ইস্পাত খাতে বিনিয়োগ করেন, আমরা শুধু বলে থাকি তাঁদের অন্য খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া। কিন্তু আমরা যাঁরা দেশীয় বিনিয়োগকারী আছি, তাঁরা কেন এটা চিন্তা করেন না। তাহলে তো আমরা আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। আমরা চাইলে আমাদের দেশে যাঁরা ইঞ্জিনিয়ার আছেন তাঁদের কাজে লাগিয়ে ভালো মানের রড উৎপাদনের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করতে পারি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে আমাদের অনেক ইস্পাত কারখানায় মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদেরকেও কাজে লাগানো হয় না। তাঁরা চাইলে অনেক অবদান রাখতে পারেন। তা ছাড়া আমাদের ইস্পাত কারখানাগুলোতে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের দেশে তেমন কোনো ইস্পাত গবেষণাকেন্দ্র নেই। যার ফলে আমরা উন্নতমানের রড উৎপাদনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছি। আমি চাইব, আমাদের দেশে ইস্পাত গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে মানসম্মত রড উৎপাদন হোক।

প্রয়োজনে নীতিমালা পরিবর্তন করা যেতে পারে

মো. রিয়াজুল হক

বিএসটিআইয়ের যে প্রজ্ঞাপন নিয়ে এখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই। মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে প্রায় ৮০টি প্রতিষ্ঠান আমাদের লাইসেন্স নিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার লাইসেন্স নিচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে মোবাইল কোর্ট করেছি। নিয়মিত মামলা দায়ের করেছি। এর পরও লাইসেন্স গ্রহণ করছিল না। এরপর আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। প্রচলিত আইনের ওপর ভিত্তি করেই ওই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এখানে আইন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আমরা শুধু প্রচলিত আইনে কী বলা হয়েছে, তা উল্লেখ করেছি। যারা অনুমোদন নেবে না তাদের ওপর এই শাস্তি বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর যারা বিলেট থেকে রড উৎপাদন করে না, এমন একটি অ্যাসোসিয়েশন আছে, তাদের প্রতিনিধি আমাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। আমরা তাঁদের বলেছি, আপনাদের যদি কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে, সেই যৌক্তিক কারণগুলোসহ দালিলিক প্রমাণাদিসহ আমাদের কাছে আবেদন করেন। এগুলো যদি যৌক্তিক হয়, আমরা মান প্রণয়ন কমিটিতে উপস্থাপন করব।

আর এটা যদি গ্রহণযোগ্য হয়, আমরা সরকারের কাছে ফের উপস্থাপন করব। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে এটা সংশোধন করা হবে। এ সুযোগ আমাদের রয়েছে।

মান নিয়ন্ত্রণের কিছু প্যারামিটার নিয়ে বুয়েটের শিক্ষক যেসব কথা বলেছেন, এ বিষয়ে আমার বক্তব্যে স্ট্রেন্থ বেশি হলে, ডাকটিলিটি থাকতে হবে। আমাদের বর্তমান মানের যে স্ট্যান্ডার্ড আছে, সেটাতে ডাকটিলিটি কনফার্ম করা আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় নিয়ে এই মান নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা শুধু এমএস রড নিয়ন্ত্রণ করছি। ইস্পাতের অনেক শাখা আছে; ওইগুলোতে আমরা মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখনো বাস্তবায়ন করিনি। ভবিষ্যতে এগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় নিয়ে আসব।

বিদ্যুৎ গ্যাস রাজস্ব বাণিজ্য—এই চারটির সমন্বয়ে সরকারের নীতি সহায়তা চাই

শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ

আমরা বিভিন্ন সময় আমাদের সমস্যা নিয়ে কাজ করেছি। এ ক্ষেত্রে সব সময়ই কালের কণ্ঠ’র সহযোগিতা পেয়েছি। তবে এবার বাজেটে আমরা একটু অস্থিরতায় পড়ে গেছি। মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমাদের সহযোগিতা করে গেছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাইনি। আসলে আমদের সমস্যাটা কিন্তু আমাদের না। শেষ পর্যন্ত আমাদের ইউজারদের ওপরই বর্তায়। এবারের বাজেটটা এমনভাবে হলো যে বাজেট ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো কারো কাছে সেভাবে তুলে ধরতে পারিনি। আমাদের সংগঠনের সভাপতি এ বিষয়ে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন।

এর পরও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে যখন কালের কণ্ঠ আমাদের কাছ থেকে কিছু লেখা নিল তখন আমিই তাদের অনুরোধ করলাম এ রকম কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতে, যেখানে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারব। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বাণিজ্য, শিল্প, বিদ্যুৎ এবং এনবিআর—এই চারটি জায়গা আমাদের খুব রিলেটেড। এই চার জায়গা থেকে যদি আমরা সহযোগিতা না পাই, তাহলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি থমকে যাবে। আর আমাদের ইন্ডাস্ট্রি থমকে যাওয়া মানে দেশের সমস্ত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যাওয়া। আজকে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, অবকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে, এর সঙ্গে আমাদের শিল্পের একটা সম্পর্ক রয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরা আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছি। একসময় আমাদের শুধু রোলিং মিলস ছিল, ইস্পাত দিয়ে রড তৈরি করতাম; তখন সেগুলো দিয়েই চলত। দুই তলার বেশি কেউ বাড়ি করত না। কিন্তু এখন সেই অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের সক্ষমতাও অনেকে বেড়েছে।  

ইস্পাত শিল্পে আরো বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে

হুমায়ন রশিদ

সভ্যতা শুরুই হয়েছে ইস্পাত দিয়ে। ইস্পাতের পরিধি এত বড় যে আমরা আজ যেই মাইক্রোফোন দিয়ে কথা বলছি এর মধ্যেও লোহা আছে। দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই এগিয়ে যাওয়া থামবে না। ২০৫০ পর্যন্ত চলবে। এর জন্য ইস্পাতের প্রয়োজন আছে। এই শিল্পের ধরন পরিবর্তন হবে। স্টিল স্ট্রাকচার বিল্ডিং আসছে। এ জন্য প্রচুর স্টিল আমদানি হয়। কিন্তু সেই শিল্প এখনো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এই জায়গাতে আমাদের বিনিয়োগের ফোকাস করার সময় এসে গেছে।

আমি অবকাঠামো প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। স্টিলের একজন ব্যবহারকারী হিসেবে যখন সরকারের সঙ্গে কাজ করছি, তখন দেখা যায় স্টিলের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ছে কিংবা কমছে। কিন্তু বাড়লে সরকার আমাকে ওই পয়সাটা দিচ্ছে না। সরকার আমাকে নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রকল্পের কাজ ১০০ কোটি টাকা।

এর মধ্যেই কাজটি আমাদের করতে হবে। এই জায়গায় একটা প্রতিবন্ধকতা আছে। এটা নিয়ে সরকারকে কাজ করতে হবে।

ইস্পাতশিল্পে একটা বৈষম্যও আছে। স্টিল আমদানি করা হলে ১০ শতাংশ কর ধরা হয়। আবার শিল্পের জন্য ৫ শতাংশ ধরা হয়। এক অদ্ভুত আচরণ চলছে এটা নিয়ে। আজকে আমার চার-সাড়ে চার কোটি টাকার স্টিল চট্টগ্রাম পোর্টে আছে। এটা গত কনসাইন্টমেন্টে ছাড়ানো হয়েছিল। এই কনসাইন্টমেন্ট ১০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই বৈষম্য আমার মনে হয় দূর করা উচিত। দেশকে এই ভুল-বোঝাবুঝির জায়গা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আমাদের ভবিষ্যৎ ভালো হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে ট্যাক্স নিয়ে বৈষম্য কমাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এটা কমানো গেলে শুধু স্টিলশিল্পই নয়, অবকাঠামো খাতও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে এসে কিভাবে এটাকে আরো উন্নতি করা যায় তা চিন্তা করা প্রয়োজন

মো. সুমন চৌধুরী

ইস্পাতশিল্প হলো একটা দেশের উন্নয়নের হাতিয়ার। এই শিল্পকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের কথা চিন্তাই করা যায় না। তাই আমাদের দেশে বিদেশি যাঁরা এ খাতে বিনিয়োগ করেন তাঁদের আমরা সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি আমাদের দেশীয় বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে এসে কিভাবে এটাকে আরো উন্নতি করা যায় তা চিন্তা করা প্রয়োজন। আমরা প্রায় ইস্পাতের নানা পরিত্যক্ত অংশ ফেলে দিই। তাই আমাদের উচিত এটা না ফেলে কিভাবে রিসাইকলের মাধ্যমে আবার ব্যবহার করা যায় তা চিন্তা করা। আমরা বেশির  ভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা চিন্তা করি।  কিন্তু আমাদের উচিত এ খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা।

আবার আমাদের এই ইস্পাতের মালামাল বেশির ভাগ প্রধান সড়কের ওপর দিয়ে আনতে হয়। এর ফলে রাস্তার ওপর চাপ পড়ে এবং রাস্তা ক্ষতি হয়। তাই বিকল্প পথে কিভাবে ইস্পাতের মালামাল আনা যায় তা-ও চিন্তা করা প্রয়োজন।

এ শিল্পের প্রধান সমস্যা অগ্রিম আয়কর

মো. মাহবুবুর রশিদ জুয়েল 

দেশের ইস্পাতশিল্প এমনিতেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর আবারও নতুন করে সংকটের মধ্যে পড়ে এই খাত। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অগ্রিম আয়কর বা অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি)। ইস্পাতশিল্পের ওপর বাজেটে ৩ শতাংশ হারে এআইটি ধার্য করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ অন্য বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বিষয়টি নিয়ে অনেক বৈঠকও হয়েছে, কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান আসেনি।

আমি শিপ কাটিং ব্লেড থেকে রড তৈরি করি। আমরা যখন জাহাজ আমদানি করি,  তখন প্রতি টনে আমাদের ৫০০ টাকা করে এআইটি দিতে হয়। এর ফলে আমাদের ব্যবসায় বেশ জটিলতার সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যতে আরো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আমরা এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে চাই। কিন্তু বাজেটে আবারও একই ব্যক্তি ও একই প্রতিষ্ঠানকে এআইটি জমা করার কথা বলা হয়।

এমনিতেই আগের দেওয়া ৫০০ টাকা ফ্রিজ হয়ে যায়। ফলে ওই টাকা আর সমন্বয় করতে পারে না। এর পরও ৩ শতাংশ হারে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতি টনে এআইটি গিয়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। আগের ৫০০ টাকাসহ এআইটি গিয়ে দাঁড়ায় দুই হাজার টাকা।

একটি প্রতিষ্ঠানের নামে যদি ইন এবং আউটে দুইবারে এত টাকা এআইটি দিতে হয় তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে। স্থাপনা তৈরির ক্ষেত্রে দাম অনেক গুণ বেড়ে যাবে। এতে সরকারের নেওয়া উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। কেননা এই অবকাঠামো খাতে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইস্পাতের ব্যবহার হয়। ফলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের বাজেটও অনেক গুণ বেড়ে যাবে। তাই বাণিজ্যমন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে আমরা সমাধান চাই।

এদিকে বিএসটিআই থেকে সম্প্রতি একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এতে নতুন করে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। আর সেটা হলো জাহাজের প্লেট থেকে সরাসরি রড তৈরি করা যাবে না। কারণ এতে নিম্নমানের রড তৈরি হয়। কোনো রকমের আলোচনা না করে এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ফলে নতুন করে সমস্যার মধ্যে পড়েছে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।

শিপ ব্রেকিং দেশের অর্থনীতিতে ট্যাক্স ও ভ্যাটের বিশাল একটা অংশে অবদান রাখছে। বেকারত্ব দূর করে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে সরকার শিপ ব্রেকিংয়ের জন্য অনুমোদন দেয়। অথচ বিএসটিআইয়ের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে শিপ ব্রেকিং প্লেট থেকে কোনো রড উৎপাদন করা যাবে না। ৪০ বছর ধরে চলে এলেও হঠাৎ করে বিএসটিআই আবিষ্কার করে এটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিএসটিআইয়ের কাছে আমার প্রশ্ন, তাহলে ৪০ বছর ধরে যেসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে ওই সব স্থাপনা কি আজ ঝুঁকিপূর্ণ?

আজকে আমাদের আধুনিক মিলগুলো হওয়ার কারণে ৬০ গ্রেড এবং ৭৫ গ্রেড টিএমটি আধুনিকতায় আসছে। জাহাজের প্লেট দিয়ে তৈরি রড নন-গ্রেড বলা হচ্ছে। এটা একেবারেই ঠিক নয়। আমি এটা বিবেচনায় নিতে পারি না। কারণ এটার গ্রেড অবশ্যই আছে। হতে পারে ৪০ গ্রেড। নন-গ্রেড বলায় আমাদের নতুন করে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে। জাহাজের প্লেট দিয়ে রড তৈরি করে এমন শতাধিক ম্যানুয়াল মিল রয়েছে। এসব মিল আজ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তাহলে কি আজ এসব মিল আমাদের বন্ধ করে দিতে হবে?

ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরো একটি কথা বলা হয়েছে। এটা আমাদের খুব আত্মসম্মানে লেগেছে। তা হলো, এই প্লেট দিয়ে রড তৈরি করলে আমাদের চার বছরের জেল ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। অথবা দুই ধরনের দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। আমি মনে করি, যারা সরকারের কোষাগারে রাজস্ব দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করে তাদের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে এমন প্রজ্ঞাপন জারি করা ঠিক হয়নি। এর ফলে লাখ লাখ লোক বেকার হয়ে যাবে। তাই শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করলেই হবে না। মানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকেও আমলে নিতে হবে। বিএসটিআই সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয় এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা না করে এমন উদ্যোগ নিতে পারে কি না—বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রীকে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।

দেশের বড় বড় অবকাঠামোতে ইস্পাত শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে

লিয়াকত আলী

২০১৮ সালে ছয় কোটি ৩২ লাখ টাকার ইস্পাতজাতীয় জিনিস আমরা রপ্তানি করেছি। পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে সব ধরনের অবকাঠামো গড়তে এ শিল্পের প্রয়োজন। তাই এ শিল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এ শিল্প বাঁচলে দেশ এগিয়ে যাবে। এ শিল্প এগিয়ে গেলে সেভেন সিস্টার্সে আমরা রপ্তানি করতে পারব।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সহসভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, ইস্পাতের পরিধি এত বড় যে বলে শেষ করা যাবে না।

দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত এ এগিয়ে যাওয়া থামবে না। এ জন্য ইস্পাতশিল্পের প্রয়োজন আছে। এ শিল্পের ধরন বদলাবে। কিন্তু শিল্পের পরিধি বাড়বে। আমাদের প্রি-স্ট্রাকচারড বিল্ডিং তৈরি করতে হয়। এ জন্য প্রচুর স্টিল আমদানি করতে হয়। আমরা এখনো এগুলো তৈরি করতে পারছি না। এদিকে নজর দেওয়ার দরকার আছে।

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে কাজ করার ক্ষেত্রে সরকার আমাদের নির্ধারিত বাজেট ধরিয়ে দেয়। কিন্তু এর মধ্যে স্টিলের দাম বাড়ছে বা কমছে। দাম বাড়লেও বাজেট বাড়ছে না। এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থেকেই যাচ্ছে। এটি দেখা উচিত।’

স্টিলের ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন স্টিল আমদানি করি, তখন ১০ শতাংশ ডিউটি ধরা হয়। আবার শিল্পের জন্য ৫ শতাংশ ডিউটি ধরা হয়। এটি নিয়ে এক অদ্ভুত আচরণ চলছে এটি নিয়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে চার থেকে সাড়ে চার কোটি টাকার বেশি স্টিল আটকে আছে। ছাড়ানো যাচ্ছে না। গত কনসালমেন্টে এটি ৫ শতাংশে ছাড়ানো গেছে। এবার এটি ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই বৈষম্য দূর করা উচিত। ট্যাক্স নিয়ে বৈষম্য দূর করতে হবে। এ জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। এগুলো দূর করলেই দেশ এগিয়ে যাবে।’

গ্রাহক ঠিকমতো বিল পরিশোধ করে না

ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল ওহাব তালুকদার 

কোনো প্রাণীকে দাঁড়াতে হলে যেমন মেরুদণ্ডের দরকার, ঠিক তেমনি কোনো দেশকে দাঁড়াতে বা উন্নত করতে হলে ইস্পাতশিল্পের দরকার। আমরা চাই এই ইস্পাতশিল্পের বিস্তার ঘটাতে। গ্যাসের মিটার সম্পর্কে আমাদের বিরুদ্ধে অনেকের অভিযোগ আছে। আমরা নাকি গ্যাসের মিটার গ্রাহককে ঠিকমতো দিই না। কিন্তু কেন দিই না, তার কারণ হলো গ্রাহক ঠিকমতো বিল পরিশোধ করে না। যদি করত, তাহলে আমরা ঠিকই দিতাম। কেননা আমাদের আসল লক্ষ্য হলো সবাইকে সেবা দেওয়া। আবার দেখা যায়, নতুন এলাকায় গ্যাসের লাইন দিলে পুরনো এলাকায় সমস্যা দেখা দেয়।

 কেননা আমাদের মাটির নিচের ব্যবস্থা তেমন ভালো নেই। তাই আমি বলতে চাই, কিছু সমস্যা ছাড়া আমরা চেষ্টা করব সবাইকে যথেষ্ট ভালো মানের সার্ভিস দিতে।

আগাম কর সম্পূর্ণ অযৌক্তিক

মো. ওসমান গণি ভূঁইয়া

আমাদের দেশীয় শিল্পের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। শিল্পের জন্য যে বাজেট আগে বরাদ্দ হতো তার জন্য কোনো কর দিতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে নতুন বাজেটে ৫ শতাংশ আগাম কর আরোপ করা হয়েছে। দেখা যায় প্রকৃত মূসক যেখানে এক হাজার-দুই হাজার টাকা।  সেখানে আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ আগাম কর বাবদ প্রদান করতে হয় দুই হাজার ৫৬ টাকা, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

ব্যাংক থেকে চলতি মূলধন ঋণ নিয়েই অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হয়। ফলে কম্পানির আর্থিক ব্যয় বেড়ে যায় এবং কম্পানির ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য যে বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডকে গত এক মাসে ৪০ কোটি টাকা আগাম কর প্রদান করতে হয়েছে। ঋণ নিয়ে এভাবে আগাম কর পরিশোধের কারণে স্টিল ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। তাই আমি বলতে চাই,  কর প্রত্যাহার করে যথাযথ ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া উচিত।


যাঁরা অংশ নিয়েছেন


টিপু মুনিশ

মন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়


মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড


ইমদাদুল হক মিলন

সম্পাদক, কালের কণ্ঠ ও ডিরেক্টর, ইডাব্লিউএমজিএল


মোস্তফা কামাল

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কালের কণ্ঠ


অরিজিৎ চৌধুরী

অতি: সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়


নারায়ন চন্দ্র দেবনাথ

পরিচালক, (অতি. সচিব), শিল্প মন্ত্রণালয়


সাঈদ আহমেদ

সদস্য (উৎপাদন) বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড


মোহাম্মদ হোসাইন

মহাপরিচালক, পাওয়ার সেল বিদ্যুৎ বিভাগ


প্রকৌ. মো. সাজ্জাদুল বারী

পরিচালক (সিএম) বিএসটিআই


ড. ইজাজ হোসেন

অধ্যাপক, বুয়েট


ফাহমিদা গুলশান

অধ্যাপক ও প্রধান, এমএমই বিভাগ, বুয়েট


মো. রিয়াজুল হক

উপ-পরিচালক (সিএম), বিএসটিআই


মানোয়ার হোসেন

সভাপতি, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন


শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শাহরিয়ার স্টিল লি.


মো. শহীদ উল্লাহ্

মহাসচিব, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন


হুমায়ুন রশিদ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এনার্জিপ্যাক


জহির এইচ চৌধুরী

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ম্যাগনাম স্টিল মিলস লি.


মো. সুমন চৌধুরী

চেয়ারম্যান, রাণী রি-রোলিং মিলস লি.


মো. মাহবুবুর রশিদ জুয়েল

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশন


লিয়াকত আলী ভুইঞা

ভাইস প্রেসিডেন্ট-১, রিহ্যাব


প্রকৌ. মো. আবদুল ওহাব তালুকদার

মহাব্যবস্থাপক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ডিভিশন (তিতাস)


মাস্টার আবুল কাসেম

মেম্বার, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং


শেখ. মো. আজহার

সভাপতি, বাংলাদেশ আয়রন স্ক্র্যাব সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন


মো. ওসমান গনি ভূঁইয়া

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আয়রন স্ক্র্যাপ অ্যাসোসিয়েশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা