kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন দরকার

পঞ্চগড়ে নৌকাডুবিতে ৬৯ জনের মৃত্যুর পর নৌনিরাপত্তার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। এ বিষয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও নৌনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মো. ইমরান উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজিব ঘোষ

২ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন দরকার

কালের কণ্ঠ : সড়কের তুলনায় নৌপথে দুর্ঘটনার সংখ্যা কম। কিন্তু মৃত্যুর হার বেশি। এর কারণ কী? 

ইমরান উদ্দিন : নৌপথ সারা বিশ্বে সবচেয়ে নিরাপদ যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু বৈশ্বিক বিবেচনায় আমাদের দেশের নৌপথ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

আমাদের নৌপথে নিরাপত্তা গ্রহণের সংস্কৃতি নেই বললেই চলে। তাই একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই বহু মানুষের মৃত্যু হয়। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহনের ফলে অতিরিক্ত মৃত্যু হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটলে সেখান থেকে দ্রুত উদ্ধার বা উত্তরণের উপায় না থাকার কারণেও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : দেশে নৌদুর্ঘটনার ধরন ও কারণগুলো কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

ইমরান উদ্দিন : বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অনিবন্ধিত নৌযানে দুর্ঘটনা বেশি হয়। আর আমাদের কোনো নৌশুমারি নেই। এ জন্য অনিবন্ধিত নৌযানের দুর্ঘটনার কারণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্লেষণ করা কঠিন। অনিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা কত, সেটাও আমরা কেউ জানি না। তবে নিবন্ধিত নৌযানের ক্ষেত্রে ২০০৫ সালের আগে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ও যানের স্থিতিশীলতা হারিয়ে ফেলার কারণে দুর্ঘটনা বেশি হতো। এর পর থেকে সংঘর্ষের কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। আর নৌযান ডুবে যাওয়ার ঘটনা তো আছেই, সঙ্গে আগুন লাগার ঘটনাও নতুন করে দেখা যাচ্ছে। নৌযানের ফিটনেস না থাকাও দুর্ঘটনার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।   

কালের কণ্ঠ : নৌযানের ফিটনেস নিয়ে আলোচনা তেমন হয় না। ফিটনেস না থাকার পরও নৌযানগুলো চলাচল করছে। এর দায় কার?

ইমরান উদ্দিন : ফিটনেস নিয়ে একেবারেই আলোচনা হয় না, এটা ঠিক না। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো শতভাগ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে, এটাও বলার সুযোগ নেই। আমাদের আইনে একটি নিবন্ধিত নৌযানকে ৩০ বছরের ফিটনেস দেওয়া হয়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পাঁচ বছর করে আরো দুইবার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে অনিবন্ধিত যানে। অনিবন্ধিত যান সরকারের তালিকায়ই নেই। সে ক্ষেত্রে এসব নৌযানের ফিটনেস আছে কি না সেটা পরীক্ষা করারও সুযোগ নেই। তবে নিবন্ধিত যানের ফিটনেস বাড়ানোর পেছনেও ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় পুরনো নৌযান জোড়াতালি দিয়ে রং করে নতুন হিসেবে আবার ফিটনেস সনদ নিয়ে থাকে।

কালের কণ্ঠ : একটি বড় দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ মারা গেলেই কেবল পেছনের কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। তদন্ত করা হয়। দোষীদের শাস্তি দেওয়ার কথা ওঠে। কিন্তু প্রকৃত সমাধান মেলে না কেন? 

ইমরান উদ্দিন : শাস্তি দিয়ে কী লাভ হবে বলেন? এক চালককে ১০ বছরের জেল দিলে হয়তো আরো ২০ চালক কিছুটা সচেতন হবে, এ ছাড়া আর কিছুই হবে না। পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের মৌলিক জায়গায়, যেন দুর্ঘটনা কমানো যায়। নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট থাকতে হবে। বড় নৌযানগুলোতে লাইফবোট থাকতে হবে। নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া করতে হবে। সব নৌযানকে নিবন্ধিত করে নিয়মের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে একটা সময় পর নৌপথে নিরাপত্তার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।  

কালের কণ্ঠ : আলোচনায় আপনি নৌযানকে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত—এই দুই ভাগে ভাগ করছেন। অনিবন্ধিত নৌযানে দুর্ঘটনা ঘটলে বিআইডাব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ) কি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না?   

ইমরান উদ্দিন : এটা আমি পুরোপুরি নিশ্চিত না। তবে পঞ্চগড়ের এই দুর্ঘটনার পর বিআইডাব্লিউটিএর কথা শুনে এমনটাই মনে হচ্ছে। তারা এই দুর্ঘটনার দায় নিতে চাচ্ছে না। ফলে হয়তো কোনো ব্যবস্থাও নেবে না।

কালের কণ্ঠ : তাহলে এমন পরিস্থিতিতে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে না? 

ইমরান উদ্দিন : চাইলে জেলা প্রশাসক উদ্যোগ নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নৌঘাটের ইজারাদারকে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব। কেননা ঘাট থেকে নৌযান ছাড়ার আগে সব কিছু দেখার দায়িত্ব ইজারাদারের।

কালের কণ্ঠ : নৌদুর্ঘটনা ঠেকাতে করণীয় কী?

ইমরান উদ্দিন : অনিবন্ধিত নৌযানগুলোর শুমারি করা প্রয়োজন। এগুলো নিবন্ধনের আওতায় আনার উপায় বের করতে হবে। লঞ্চঘাটগুলো যাঁরা ইজারা নেন তাঁদের দায়িত্ব বাড়াতে হবে। যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিবন্ধিত যানে যাত্রীদের জন্য লাইফ জ্যাকেট থাকা বাধ্যতামূলক। নৌপথের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আছে। সেটা ঠিক করতে হবে। আবার আমাদের উদ্ধারকারী নৌযান আছে মাত্র দুটি। এগুলোর ধারণক্ষমতাও অনেক কম। কিন্তু এখন যে জাহাজগুলো তৈরি হচ্ছে, এগুলোর ধারণক্ষমতা একেকটি ৫০০ থেকে ৭০০ টন। আমরা আমাদের উদ্ধারকারী যানগুলো উন্নত করতে পারিনি। এগুলো উন্নত করতে হবে।



সাতদিনের সেরা