kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

তিন খাতে সংস্কার চায় বিশ্বব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিন খাতে সংস্কার চায় বিশ্বব্যাংক

বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাংলাদেশকে তিনটি খাতে কার্যকর সংস্কার আনতে হবে। এই তিন চ্যালেঞ্জ উত্তরণ না হলে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে তা ঝুঁকিতে পড়বে। মাথাপিছু আয়ের যে বৃদ্ধি তা-ও কমে যাবে।

বিশ্বব্যাংক গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক  প্রতিবেদনে এমন সতর্কতা জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংস্থাটি বলেছে, খাত তিনটি হলো—দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক খাত, রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখীকরণ এবং স্থিতিশীল নগরায়ণ।  

‘বাংলাদেশ কান্ট্রি ইকোনমিক মেমোরেন্ডাম চেঞ্জিং অব ফেব্রিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এই তিন খাতে সংস্কার না হলে ২০৩৫ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে। আর মোটামুটি ধরনের সংস্কার হলে ৫.৯ শতাংশ এবং কার্যকর সংস্কার হলে ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। এই তিন খাতে সংস্কার করতে পারলে উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হবে এবং ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি আরো টেকসই হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এই প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এবং বর্তমান মুখ্য অর্থনীতিবিদ নোরা ডিহেল। প্যানেল আলোচক ছিলেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এবং এসবিকে টেক ভেঞ্চারের প্রতিষ্ঠাতা সোনিয়া বশির কবির।

সূচনা বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড্যান ড্যান চ্যান বলেন, গত এক দশকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম বাংলাদেশ। তবে এতে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। নতুন এবং উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময় একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে পরিবর্তনশীল মনোযোগের জন্য নতুন নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন প্রয়োজন। তিনি বলেন, ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের রূপকল্প অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে শক্তিশালী এবং রূপান্তরমূলক নীতি পদক্ষেপ নিতে হবে।

দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক খাত সংস্কার : প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক আর্থিক খাত বলতে মূলত দেশের ব্যাংকিং খাতের কথা বলেছে। এ খাতের সংস্কার জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর তাগিদ দিয়েছে তারা।

 ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট দূর করতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ বিনিয়োগের কথাও বলেছে বিশ্বব্যাংক। অসম প্রতিযোগিতা থেকে বের হওয়ার তাগিদ দিয়েছে তারা। পাশাপাশি রাজস্বের আওতা বাড়ানো এবং রাজস্ব আহরণের প্রতি গুরুত্ব দিতে পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা গত মার্চে ছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসেই বেড়েছে ১১ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পুরনো কিছু মিলে এপ্রিল-জুন পর্যন্ত নতুন করে ঋণখেলাপি হয়েছে ১৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।

অনুষ্ঠানে জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের আর্থিক খাত সংকটময় অবস্থায় আছে। পাশাপাশি অর্থনীতির হুমকি হিসেবে আছে জলবায়ু পরিবর্তন। তবে এসবের বিপরীতে আশা দেখাচ্ছে ডিজিটাল বা প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন।

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘কিছু জায়গায় অবশ্যই আমাদের পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনৈতিক অর্থনীতিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় আনতে হবে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাই ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আরো বাড়াতে হবে।

রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখীকরণ : বিশ্বব্যাংক বলেছে দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর তা কমে আসতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তারা তৈরি পোশাকবহির্ভূত পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে। রপ্তানিমুখীকরণের লক্ষ্যে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পের দিকে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জাহিদ হোসেন বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের রপ্তানির হার কমে যাবে ২০ শতাংশ। এগুলো নিয়ে এখনই কাজ শুরু করতে হবে।

স্থিতিশীল নগরায়ণ : বিশ্বব্যাংক বলেছে, জিডিপির এক-পঞ্চমাংশ আসে রাজধানী ঢাকা থেকে। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেকই এ শহরে। ঢাকার মতো এমন অস্থিতিশীল নগরায়ণ যেন আর না হয় সে বিষয়ে বার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি যেকোনো নগরায়ণের ক্ষেত্রে পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট নোরা ডিহেল বলেন, সফল নগরায়ণ হবে ছোট এবং সেখানে ব্যাবসায়িক কার্যক্রমকে আকৃষ্ট করা। এর জন্য শহরগুলোকে তাদের নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করবে। এ জন্য দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ডসহ মৌলিক পরিষেবা আরো উন্নত করতে হবে। সহজ আন্ত নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

সংক্ষিপ্ত আলোচনায় সাউথ ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘প্রতিবেদনে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে সেসব সংস্কারের জন্য সরকারও কিন্তু অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কেন এসব সংস্কার হচ্ছে না এটাই বড় প্রশ্ন। ’

সেলিম রায়হান বলেন, ২০২৬ সালে আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হবে। তারপর আমরা হয়তো অনেক দেশের কাছ থেকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা পাব না। শুধু ব্যাংক খাতই নয়, সংস্কার করার মতো বহু খাত এখনো বাকি আছে। দেশের বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এখনই। চামড়া খাত পোশাকের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারত। এটি শক্তিশালী করার এখনো সুযোগ রয়েছে। আর্থিক খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।

 



সাতদিনের সেরা