kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

আমন চাষ নিয়েও দুশ্চিন্তায় কৃষক

কালের কণ্ঠ ডেস্ক    

১৩ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমন চাষ নিয়েও দুশ্চিন্তায় কৃষক

বন্যার ধকল কাটিয়ে নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেরিতে হলেও আমনের আবাদ শুরু হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এরই মধ্যে ডিজেল, ইউরিয়া সারসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বিঘাপ্রতি খরচ দু-তিন হাজার টাকা বেড়ে গেছে। বৃষ্টি না হওয়ায় বাড়তি সেচ দিতে হচ্ছে। বাড়তি খরচের চাপে তাঁরা বিপাকে।

বিজ্ঞাপন

শেষ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছেন তাঁরা।

নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এক লাখ ৩২ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৫ শতাংশ জমিতে আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড, উফশী (উচ্চ ফলনশীল) ও স্থানীয় জাতের ধান রয়েছে। সবচেয়ে বেশি উফশী জাতের।

কৃষি বিভাগ জানায়, চাহিদার বিপরীতে চলতি মৌসুমে আমন আবাদের জন্য ৯ হাজার ৮৮৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের অনুমোদন পাওয়া গেছে। ১৬ টাকা কেজির ইউরিয়া সার এখন ছয় টাকা বেড়ে হয়েছে ২২ টাকা কেজি। এ হিসাবে এবার কৃষককে শুধু সার

কিনতেই বাড়তি গুনতে হবে পাঁচ কোটি ৯৩ লাখ চার হাজার টাকা। এ ছাড়া আরো সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের জন্য আবেদন করা হয়েছে।  

গতকাল শুক্রবার নেত্রকোনা সদর উপজেলার মদনপুর, বিচিপাড়া, লক্ষ্মীগঞ্জ, আসামপুর, আমতলা, ফরিদপুর ও আটপাড়া উপজেলার অভয়পাশা, রামেশ্বরপুর, তেলিগাতিসহ বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা জমি চাষ, বীজতলা থেকে ধানের চারা সংগ্রহ এবং জমিতে চারা রোপণে ব্যস্ত। কথা বললে কৃষকরা জানান, গরুর বদলে এখন ডিজেলচালিত পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ দেওয়া হয়। গত মৌসুমে পাওয়ার টিলারে এক কাঠা (১০ শতাংশ) জমি চাষে খরচ হয়েছে ১৬০ টাকা। এখন খরচ খরচ হচ্ছে ২০০ টাকা। এ হিসাবে এক লাখ ৩২ হজার ৫৮০ হেক্টর জমি চাষে কৃষকের খরচ বেড়েছে ১৩ কোটি ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৪০ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য কৃষি উপকরণের বাড়তি দাম তো আছেই।

সদর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের কৃষক সন্তোষ সরকার বলেন, ‘ধান চাষে এবার খরচ অনেক বেশি। খরচ উঠবে কি না তা জানি না। ধান চাষ না করেও উপায় নাই। ’

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার সিংগা গ্রামের ধান চাষি মাইনুল ইসলাম জানান, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে আমন আবাদে খরচ হবে আট হাজার টাকার বেশি। আর এক বিঘা জমি থেকে ধান পাওয়া যাবে আট মাণ। এতে লোকসান হতে পারে। কারণ বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে চিকন ধান স্বর্ণা এক হাজার ৫০ টাকা, আটাশ এক হাজার ২৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ জানায়, দুর্গাপুর উপজেলায় চার হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বর্তমানে এক হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা জানান, এ বছরে তেমন বৃষ্টিপাত নেই। ডিজেল ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। এতে কৃষকদের বাড়তি খরচ হচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের প্রণোদনার মাধ্যমে সার ও বীজ দেওয়া হচ্ছে।

যশোরে আমনের আবাদ অনেকটাই সেচনির্ভর। কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ প্রায় ৬২ হাজার। গভীর নলকূপ রয়েছে ১১৭টি। পাওয়ার টিলার প্রায় ৯ হাজার। চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৯৪৭ হেক্টর জমিতে। তবে বৃষ্টি না থাকায় লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশে এখনো আবাদ শুরু হয়নি।

যশোরের কায়েমখোলা গ্রামের কৃষক মতিয়ার রহমান বললেন, ‘বৃষ্টির অভাবে এবার আমনেও প্রায় ইরি ধান চাষের মতো অবস্থা। শ্রাবণ মাস প্রায় শেষ। বর্ষাকাল যাওয়ার পথে। অথচ যা বৃষ্টি হচ্ছে তাতে এ অঞ্চলের কোনো মানুষ এক কাঠা জমিও সেচ ছাড়া চাষ করতে পারেনি। মনে হচ্ছে, সেচ দিয়েই এবার আমন চাষ করতে হবে। সঙ্গে অন্যান্য বাড়তি খরচ তো আছেই। ’

নীলফামারী সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক এনামুল হক বলেন, ‘আকাশের পানিত হামেরা আমন আবাদ করি। এইবার পানি নাই, কারেন (বিদ্যুৎ) পাছি না পুরা সময়। মোটর (বিদ্যুত্চালিত পাম্প) চালেবার পারেছি না। লাস্ট টাইমোত (শেষাবধি) শ্যালো মেশিন লাগাইনু আবাদোত। সেইটেও এলা তেলের দাম বাড়াইল সরকার। যে হারে খরচ বাড়েছে, এইবার ধান আবাদ করি খাটুনি ফাও যাইবে। ’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, এ বছর জেলায় এক লাখ ১৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আমন চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত চারা রোপণ হয়েছে এক লাখ সাত হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে। বৃষ্টির পানি ও সম্পূরক সেচের মাধ্যমে আমন চারা রোপণ করছেন কৃষক। জেলায় ১২৪টি গভীর নলকূপ, ছয় হাজার ১০৭টি অগভীর নলকূপ চালু আছে। অগভীর নলকূপের মধ্যে বিদ্যুত্চালিত দুই হাজার ৬০০ এবং ডিজেলচালিত তিন হাজার ৫০৭টি। তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় ২৭২টি আউটলেটের মাধ্যমে পাঁচ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। আগস্ট মাসজুড়ে আমন চারা রোপণ করা যাবে।

নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়াতে কিছুটা খরচ বাড়বে কৃষিতে। এর প্রভাব তো কিছুটা পড়বে। সে ক্ষেত্রে ফসলের মূল্য যদি কৃষক বেশি পায়, তারা হয়তো পুষিয়ে নিতে পারবে। সে ক্ষেত্রে নির্ভর করবে ফসলের মূল্য কী ধরনের পাচ্ছে। ’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। ]

 



সাতদিনের সেরা