kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বললেন

রাজস্ব আহরণের দুর্বলতায় চলমান অর্থনৈতিক চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজস্ব আহরণের দুর্বলতায় চলমান অর্থনৈতিক চাপ

দেশে চলমান অর্থনৈতিক চাপের জন্য আর্থিক খাতকে ‘খলনায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নয়, এই চাপ তৈরি হয়েছে দেশে দীর্ঘদিনের রাজস্ব আহরণের আওতা না বাড়ানো ও আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট নিয়ে ‘বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় একটি উত্তরণকালীন নীতি সমঝোতা খসড়া’ শীর্ষক আলাপচারিতায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রায় দুই ঘণ্টা সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল আলাপচারিতায় দেশের অর্থনৈতিক চাপ, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আর্থিক খাতের সংকট মোকাবেলায় সরকারকে ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে। অথচ এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গরিব মানুষকে সুরক্ষা দিতে ভর্তুকি দেওয়া বেশি প্রয়োজন ছিল। আমাদের রাজস্ব আহরণ অনেক কম। বড় দুর্বলতা এই জায়গাতেই। ’ তিনি বলেন, জিডিপির তুলনায় কর অনুপাত যদি ১৫ শতাংশ হতো, তাহলে এই সংকটকালে বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সরকার জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারত। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, যা করা হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, ‘যদি আমাদের সক্ষমতা থাকত, অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আয় বেশি থাকত তাহলে ভর্তুকি না কমিয়ে তেলের দাম সমন্বয় করা যেত। ’

নতুন করদাতা খুঁজে বের না করাসহ রাজস্ব খাতের দুর্বলতা তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ রোগের একটি উপসর্গ মাত্র। আসল রোগ হলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের যথাযথ সংস্কার না করা।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য চলমান অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। এগুলো হলো আর্থিক খাতের সংকট মোকাবেলায় দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা প্রণয়ন করা। এই সমঝোতায় নীতি বিষয়কেই প্রাধান্য দিতে হবে। এ ছাড়া তিনি সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা; উৎপাদন ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা এবং গরিব মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দেন। নীতি প্রণয়নে ঐকমত্য থাকার কথাও বলেন তিনি। যাতে আগামী দিনে রাজনৈতিক টানাপড়েন হলেও আর্থিক খাতকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডলারের দাম উঠবে কি না, সরকার ভর্তুকি দিতে পারবে কি না—এটা বহিঃখাতের ব্যাপার না। এটা আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপার। সরকার কী পরিমাণ রাজস্ব আয় করেছে। কোথায় কী ব্যয় করেছে, কোথায় কী পরিমাণ ব্যবস্থাপনা করেছে—সেটিই মুখ্য বিষয়। তিনি বলেন, ‘টাকা কোথায় কিভাবে উঠবে, সেটি না করে আমরা যদি বাংলাদেশ ব্যাংক আর ব্যাংকের ট্রেজারি অপারেশনের ভেতরে থাকি, তাহলে আমরা শুধু রোগের উপসর্গের পেছনে দৌড়াব। রোগের কারণটাকে ধরতে পারব না। ’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাজেটের পর অর্থনীতি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, বৈশ্বিক কারণে এই পরিস্থিতি। আমি তাদের সঙ্গে আংশিক একমত হয়ে বলছি, শুধু বৈশ্বিক কারণ বললে এক ধরনের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। অর্থনীতির মূল ফুসফুস হলো আর্থিক খাত। বর্তমানে যে আর্থিক কাঠামো এবং সরকারের খরচ করার যে সক্ষমতা তা উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে সমর্থন দেওয়ার মতো নয়। সরকার এখন আর্থিক সম্পদ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ভর্তুকি কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ সরকারের আর্থিক সামর্থ্য থাকলে জ্বালানি তেলের এত উচ্চ হারে দর বাড়িয়ে মানুষকে কষ্টে ফেলতে হতো না। ’ তিনি আরো বলেন, ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। সার, বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসে ভর্তুকি দরকার। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জের (সক্ষমতার ব্যয়) নামে যে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, সেটা খারাপ ভর্তুকি।

দেবপ্রিয় বলেন, ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, শুধু তা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে মোকাবেলা করা যাবে না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। বৈশ্বিক পরিস্থিতি সব দেশকে আঘাত করেছে। কিন্তু অনেকেই এই পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে পারছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, বর্তমানে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশে দরিদ্র সরকার দেশ চালাচ্ছে। গত ১০ বছরে নিজের আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত না করার কারণেই অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যার অনিবার্য পরিণতি ভোগ করছে দেশ। ’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক এই দুর্যোগ থাকতে পারে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি, টাকার ওপর চাপ, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন প্রকল্প—এসব বিষয়ে যেসব সমস্যা চলছে তা ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে।

এ সময় সরকার নিজেদের ভেতরেই অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে না বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, সরকার তার নিজের ভেতরেই চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা করে না। স্থায়ী কমিটি কোথায়? তাদের ভেতর আলোচনা কই? সরকার বাইরে আলোচনার আগে তাদের ভেতরে মন্ত্রিসভা, সংসদে আলোচনা করুক। সরকার তার রাজনৈতিক সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করুক। বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করুক। সরকার শুধু নামে থাকলে হবে না। সরকারের প্রতি জনমনে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে। জনগণ সরকারকে আস্থায় নিচ্ছে না, সে জন্যই আলোচনা প্রয়োজন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে এত পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য খারাপ দিক। সঠিক বিবেচনা না করেই মূল্য বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি খাতে যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এতে সরকারের এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কোনো ভূমিকা দেখি না।

আইএমএফের ঋণ পাওয়ার পূর্বশত হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কেউ যদি বলেন, আইএমএফের শর্তে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। কোনো সরকারের জন্য এটি সম্মানজনক নয়। তবে এ ধরনের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু প্রাক-পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই সময়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপের উদাহরণ দেন।

 



সাতদিনের সেরা