kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

আইএমএফের ঋণ পেতে তিন খাতে ভর্তুকি কমছে

সজীব হোম রায়   

৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আইএমএফের ঋণ পেতে তিন খাতে ভর্তুকি কমছে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পেতে কাজ শুরু করেছে সরকার। এ জন্য ভর্তুকি কমিয়ে আনতে এরই মধ্যে ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ছয় টাকা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে বাড়ানো হয়েছে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম। আর বিদ্যুতের দামও ‘যৌক্তিক পর্যায়ে’ আনার কাজ চলছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আইএমএফের এশীয় প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের বিভাগীয় প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গত মাসে ঢাকা সফর করেছে। সফরকালে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে প্রতিনিধিদলটি। বৈঠকে তারা যেসব পরামর্শ দিয়েছে, তার মধ্যে বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনা অন্যতম। প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা শেষে গত ২৪ জুলাই ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পেতে অনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে সরকার।

এদিকে ঋণ চেয়ে বাংলাদেশের পাঠানো প্রস্তাবের এক সপ্তাহের মাথায় গত মঙ্গলবার ঋণের ব্যাপারে ইতিবাচক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে যুদ্ধের জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে এরই মধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অনুরোধে সাড়া দিতে আইএমএফ প্রস্তুত। আশা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য রেসিলিয়ান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ট্রাস্ট (আরএসএফটি) ফান্ড সচল হয়ে যাবে। আর এই সময় আইএমএফ কর্মীরা প্রকল্প চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস গত বুধবার এক ব্রিফিংয়ে আইএমএফের কাছে ঋণ নেওয়া প্রসঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, আগে থেকেই বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলে সরবরাহব্যবস্থায় (পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সম্পদ, কর্মকাণ্ড প্রযুক্তি) বিঘ্ন ঘটছে। তাই আগে থেকেই বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। ’

ভর্তুকি কমাচ্ছে সরকার

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ ইতিবাচক সাড়া দেবে ধরে নিয়ে এর আগেই কাজ শুরু করে দিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছর সরকার ভর্তুকি বাবদ ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা রেখেছে। ঢাকা সফরকারী আইএমএফের প্রতিনিধিদল এত বেশি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে পরামর্শ দিয়েছিল।

চলতি অর্থবছরের মোট ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকির মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকাই যাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের বাড়তি দাম মেটাতে। আইএমএফের পক্ষ থেকে সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছিল। সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় না করলেও গত সোমবার ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ছয় টাকা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম ৮১ টাকা। ছয় টাকা বাড়ানোর ফলে দেশের বাজারে এখন এই সারের দাম ১৬ থেকে ২২ টাকা হয়েছে। তার পরও সরকারকে ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে চাহিদার বিপরীতে সব রকম সারের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। আমন মৌসুম (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা আছে ছয় লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন। বিপরীতে মজুদ আছে সাত লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি তেলের দাম ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে কমে গত সোমবার অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলের দাম ৯৩ ডলারে নেমে এসেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশ (বিপিসি) ডিজেল ও অকটেনে প্রতিদিন ৯০ কোটি টাকা করে লোকসান দিচ্ছে। আইএমএফের পরামর্শ মেনে গতকাল ডিজেল, পেট্রল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। এর আগে গত বছরের ৩ নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা করে বাড়ায় সরকার।

বিশ্ববাজারে স্পট মার্কেটে (খোলাবাজার) তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দাম এখন আকাশচুম্বী। ১০ ডলারের এলএনজি এখন ৩৮ ডলার। প্রতি মিটার এলএনজি ক্রয়ে সরকারের ব্যয় ৫৯.৬০ টাকা। কিন্তু গ্রাহকদের কাছে সেটা এখন ১১ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এসব কারণে আপাতত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ রেখেছে সরকার। বাড়তি দামে এলএনজি আমদানির কারণে গত অর্থবছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সরকারের।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাড়তি দামের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। সরকারি-বেসরকারি ৯০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গত বছরের জুলাই থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে সরকার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্রভাড়া দিয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

আইএমএফ এ খাতের বাড়তি ভর্তুকিকে সমর্থন করে না। তাই রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে আসা প্রতিনিধিদলটি বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিল। সরকার সে পরামর্শ মেনে বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে কাজ শুরু করেছে।

আইএমএফের পরামর্শ মেনে তিনটি পণ্যের দাম বাড়লে জনজীবনে প্রভাব পড়লেও ভর্তুকির পরিমাণ কমে আসবে অনেক।

তবে বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলছেন, এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। ভোক্তার খরচ বাড়বে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, এসব উদ্যোগে ভর্তুকি অনেকটাই কমে আসবে নিঃসন্দেহে। তবে ভর্তুকি কমানোর এ ব্যবস্থাপনায় ভোক্তার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে, যা ঠিক নয়। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বিদ্যুতে যে ভর্তুকি বাড়ছে তার মূল কারণ ক্যাপাসিটি চার্জ (সক্ষমতা ব্যয়)। কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নো কস্ট, নো পেমেন্ট চুক্তিতে যেতে পারে। সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ নিয়ে নিচ্ছে। এটি না নিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই সামাল দিতে পারত। এখন সবই ভোক্তার ওপর চাপবে।



সাতদিনের সেরা