kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

‘সক্ষমতার ব্যয়’ মেটাতে মাসে যায় ২০০০ কোটি টাকা

সজীব হোম রায়   

৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সক্ষমতার ব্যয়’ মেটাতে মাসে যায় ২০০০ কোটি টাকা

সরকার বিদ্যুৎ, গ্যাস, কৃষি খাত, খাদ্য, রপ্তানি, প্রবাস আয়সহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দেয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে কেন্দ্রগুলোকে শুধু সক্ষমতার জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে বছরে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। করোনার অভিঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের পর অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এর ফলে প্রবাস আয়ের মতো খাতগুলোতেও ভর্তুকি কমানোর সুযোগ এসেছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার চাইলেই তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয় ভর্তুকিগুলো কমিয়ে আনতে পারে। এতে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ কমে আসবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভর্তুকির টাকা সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা হচ্ছে বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারে। এই তিন খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুতেই গত ৯ মাসে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা গেছে। দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেশি। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে টাকা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি ৯০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গত বছরের জুলাই থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে সরকার ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কম্পানিগুলোকে ৯ মাসে দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। আর ১২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে।

ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। বিদ্যুতে ভর্তুকির চাপ সামলাতে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও অর্থ মন্ত্রণালয় দুই হাজার ৯০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার ওপর আমেরিকা ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। আগে যে পরিমাণ ফার্নেস অয়েলের মূল্য ছিল মাত্র ৭০৮ টাকা, সেটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর হয়ে গেছে এক হাজার ৮০ টাকা। ১০ ডলারে যে পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) মিলত, এখন তা হয়েছে ৩৮ ডলার। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি কিনতে সরকারের ব্যয় হয় ৫৯.৬০ টাকা, কিন্তু গ্রাহকদের কাছে সেটা এখন ১১ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবং অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সরকারের বসা উচিত। অযথা এই খাতে সরকারের পয়সা খরচ হচ্ছে। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৪০ থেকে ৪৮ শতাংশ অব্যবহৃত থাকে। এখন বিলাসিতা করার সুযোগ নেই। তাই প্রয়োজন না থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। অথবা বিদ্যুৎ না নিলে কোনো টাকা দেওয়া হবে না, এমন চুক্তি করতে হবে। এটি করলে সরকারের ভর্তুকি অনেক কমে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়েক অর্থবছর আগেও ভর্তুকিতে বরাদ্দ ৫০ হাজার কোটি টাকার নিচে ছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। সরকার কৃষি খাতে কৃষি উপকরণ, কৃষকদের উন্নতমানের বীজ কেনা এবং সারে ভর্তুকি দেয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মধ্যে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি দেওয়া হয়। জ্বালানি খাতে বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানিতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে না। তবে অচিরেই এ খাতেও ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যোগাযোগ করা হলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এখন স্বাভাবিক অবস্থা নেই। আমরা কভিডের সময় জনগণের জন্য সব কিছু করেছি। কেউ না খেয়ে ছিল না। আশা করি, আবার সব স্বাভাবিক হবে। তখন আমরা ভর্তুকির বিষয়ে চিন্তা করব। তবে এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব আসতে হবে। এখন পর্যন্ত আমরা ভর্তুকির খাত পুনর্বিন্যাস করার মতো কোনো চিন্তা করছি না। ’

অর্থমন্ত্রী আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে ভর্তুকি শেষ পর্যন্ত আরো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। আর তা হলে ভর্তুকি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে।

সরকারি হিসাবে, চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি তেল, এলএনজি, গম, রাসায়নিক সার, পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, কয়লা, ভুট্টা ও চাল আমদানিতে গত বছরের তুলনায় ৭৬ হাজার ৭৯৪ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে। বলা বাহুল্য যে এর বেশির ভাগ যাবে ভতুর্কি খাত থেকে।

সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দেয়। উদাহরণ হিসেবে দরিদ্রদের স্বল্প মূল্যে চাল বিক্রি কিংবা নগদ সহায়তার কথা বলা যায়। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের (এনএসএসএস) মধ্যবর্তী উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৬ শতাংশ ভাতাভোগী যোগ্য না হয়েও ভাতা নিচ্ছে। সঠিক লোকের কাছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তা পৌঁছাতে পারলে বাড়তি ব্যয় ছাড়াই ২৬ লাখ পরিবারের এক কোটি সাত লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে তুলে আনা সম্ভব। এসব দুর্নীতির কারণে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের অর্থ গচ্চা যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আরো বেশি মানুষকে সহায়তা দেওয়া উচিত। তবে সঠিক মানুষ যেন সহায়তা পায়, তা খেয়াল রাখতে হবে। তা না হলে এ খাতের ভর্তুকির আসল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার ছাড়াও প্রবাস আয়ে সরকার ভর্তুকি দেয়। বৈধ পথে প্রবাস আয়ের প্রবাহ বাড়াতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী এ খাতে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেন। এর পর থেকেই বাড়তে থাকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ। গত বছরের শেষ দিকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমতে শুরু করলে অর্থমন্ত্রী এ প্রণোদনার পরিমাণ বাড়িয়ে ২.৫ শতাংশ করেন। বর্তমানে আবারও রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে। গত মাসে প্রবাস আয় এসেছে ২০৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার, এটি গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রণোদনা কমালেও রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমবে না। ফলে এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। এতে বাঁচবে সরকারের টাকা। এ ব্যাপারেও মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এ খাতে এখন প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কারণ হুন্ডির মাধ্যমে পাঠালে প্রণোদনার চেয়ে বেশি অর্থ পাওয়া যায়। তাই যারা ভালো তারা বৈধ পথে এমনিতেই পাঠাবে। ’

 



সাতদিনের সেরা